আমন ধানের চাষ পদ্ধতি ও কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা

বুধবার, ১১ জুলাই ২০১৮ | ৮:৩০ অপরাহ্ণ | 2438 বার

আমন ধানের চাষ পদ্ধতি ও কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশে ধান উৎপাদনে আমন মওসুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতি বছর প্রায় ৫.৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ করা হয় এবং প্রায় ১৩.৬ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন হয়। উফশী আমনের এলাকা প্রায় ৪.১ মিলিয়ন হেক্টর। দেখা যায় যে, মাঠ পর্যায়ে উফশী আমন ধানের ফলন ২.৫-৭.০ টন/হেক্টর পর্যন্ত বিস্তৃত। যথাযথ কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ফলন হেক্টর প্রতি ১.৫-২.০ টন বাড়ানো সম্ভব যা জাতীয় উৎপাদনে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমন মওসুম ও এর পরিবেশ উপযোগী ৪১টি (৩৯টি ইনব্রিড ও ২টি হাইব্রিড) উফশী ধানের জাত ও ধান উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নানা রকম কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করেছে। এ জাত গুলোকে আলোক-সংবেদনশীল ও আলোক-অসংবেদনশীল এই দু’ভাগে ভাগ করা করা যায়। আবার জীবনকাল অনুসারে আলোক-অসংবেদনশীল জাতগুলোকে দীর্ঘ মেয়াদি, মধ্যম মেয়াদি ও স্বল্প মেয়াদি জাত হিসেবে ভাগ করা যায়।

১) দীর্ঘ মেয়াদি জাত (জীবনকাল ১৩৫ দিনের বেশী), যেমনঃ বিআর১০, বিআর১১, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৪০,
ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২।

২) মধ্যম মেয়াদি জাত (জীবনকাল ১২০-১৩৫ দিন), যেমনঃ বিআর২৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮,
ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৮০।

৩) স্বল্প মেয়াদি জাত (জীবনকাল ১২০ দিনের কম), যেমনঃ ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭,
ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫।

তাছাড়া, রোপা আমনে বন্যা(ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭৯), খরা (ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১) এবং লবণাক্ততা (ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৭৩) সহিষ্ণু কিছু ধানের জাতও রয়েছে।

ব্রি কৃষিতত্ত্ব বিভাগ উদ্ভাবিত ধান উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থাপনা নিম্নরূপ-

১. রোপন সময়

# রোপা আমনের আলোক-অসংবেদনশীল দীর্ঘ ও মধ্যম মেয়াদি জাতগুলোর উপযুক্ত রোপন সময় হচ্ছে ১৫ জুলাই – ১৫ আগস্ট।

# আলোক-অসংবেদনশীল স্বল্প মেয়াদি জাতগুলোর উপযুক্ত রোপন সময় হচ্ছে ২৫ জুলাই – ২৫ আগস্ট।
# আলোক-সংবেদনশীল জাতগুলোর (বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪৬) সরাসরি বপন সময় হলো ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এবং রোপন সময় হচ্ছে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

২. চারার বয়স

# আলোক-অসংবেদনশীল দীর্ঘ ও মধ্যম মেয়াদি জাতগুলোর চারার বয়স হবে ২৫-৩০ দিন।
# আলোক-অসংবেদনশীল স্বল্পমেয়াদি জাত গুলোর চারার বয়স হবে ১৫-২০ দিন।
# লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাত (যেমনঃ ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৭৩) গুলোর চারার বয়স হবে ৩০-৩৫ দিন।

# আলোক-সংবেদনশীল জাত (যেমনঃ বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪৬, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭) গুলোর নাবীতে রোপনের ক্ষেত্রে চারা বয়স হবে ৩৫-৪০ দিন।

** কৃষকগণ সাধারণতঃ সব জাতের (বিভিন্ন জীবনকালের) ধানের বীজ একই সময়ে বীজতলায় ফেলেন এবং সেখান থেকে চারা তুলে দীর্ঘ সময় ধরে মূল জমিতে রোপন করেন। এতে ধীরে ধীরে বীজতলায় চারার বয়স বেড়ে যায় ফলশ্রুতিতে ধানের ফলন কম হয়। বিশেষ করে স্বল্প মেয়াদি ধানের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনেক বেশী কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিষয়টি কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে বিভিন্ন জীবনকালের ধানের জাত পর্যায়ক্রমে বীজতলায় ফেলা, যাতে রোপনের সময় কৃষকগণ সঠিক বয়সের চারা ব্যবহার করতে পারেন।

** খরা প্রবণ এলাকায় জুলাই এর ১- ১০ মধ্যে বীজ তলায় বীজ বপন ও ২০-২১ দিনের চারা রোপন করলে অক্টোবর এর শেষে বৃষ্টিপাত না থাকলেও ফলনে প্রভাব ফেলবে না।

৩. চারার রোপন দূরত্বঃ

সাধারণত সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সে.মি. (৮ ইঞ্চি) ও গুছি থেকে গুছির দূরত্ব ১৫ সে.মি. (৬ ইঞ্চি) রাখলে ভাল ফলন পাওয়া যাবে। তবে জমি ঊর্বব হলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫ সে.মি. (১০ ইঞ্চি) ও গুছি থেকে গুছির দূরত্ব ১৫ সে.মি. (৬ ইঞ্চি) রাখা যেতে পারে।

৪. সার ব্যবস্থাপনাঃ
সাধারণতঃ আবহাওয়া ও মাটির উর্বরতার মান যাচাই এবং ধানের জাত, জীবনকাল ও ফলন মাত্রার উপর ভিত্তি করে সারের মাত্রা ঠিক করা হয়।
 আলোক-অসংবেদনশীল দীর্ঘ ও মধ্যম মেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইউরিয়া-টিএসপি-এমওপি- জিপসাম যথাক্রমে ২৬-৮-১৪-৯ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির শেষ চাষে সমস্ত টিএসপি-এমওপি-জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সমান ভাগে তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। ১ম কিস্তি চারা রোপনের ৭-১০ দিন পর, ২য় কিস্তি চারা রোপনের ২৫-৩০ দিন পর এবং ৩য় কিস্তি কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে।

 আলোক-অসংবেদনশীল স্বল্প মেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইউরিয়া-টিএসপি-এমওপি- জিপসাম যথাক্রমে ২০-৭-১১-৮ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির শেষ চাষে ১/৩ অংশ ইউরিয়া এবং সমস্ত টিএসপি-এমওপি-জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে। বাকী ইউরিয়া সমানভাগে দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। ১ম কিস্তি চারা রোপনের ১০-১৫ দিন পর এবং ২য় কিস্তি কাইচথোড় আসার ৫- ৭ দিন পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে।

**ব্রি ধান৬২ এবং ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭ এর ক্ষেত্রে যদি ২০ দিনের চারা রোপন করা হয়, তবে রোপনের ২০-২৫ দিনের মধ্যে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ শেষ করতে হবে।

 নাবীতে রোপনকৃত আলোক-সংবেদনশীল জাতের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইউরিয়া-টিএসপি-এমওপি- জিপসাম যথাক্রমে ২৩-৯-১৩-৮ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির শেষ চাষে ২/৩ অংশ ইউরিয়া এবং সমস্ত টিএসপি-এমওপি-জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে। বাকী ইউরিয়া কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে।

 ব্রি ধান৩২ এবং স্বল্প আলোক-সংবেদনশীল সুগন্ধি জাত যেমন: বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭ ও ব্রি ধান৩৮ ধানের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইউরিয়া-টিএসপি-এমওপি-জিপসাম যথাক্রমে ১২-৭-৮-৬ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে।

৫. আগাছা ব্যবস্থাপনাঃ

 হাত দিয়ে, নিড়ানি যন্ত্র দিয়ে এবং আগাছানাশক ব্যবহার করে আগছা দমন করা যায়। রোপা আমন ধানে সর্বোচ্চ দু’বার হাত দিয়ে আগাছা দমন করতে হয়। প্রথম বার ধান রোপনের ১৫ দিন পর এবং পরের বার ৩০-৩৫ দিন পর।

 নিড়ানি যন্ত্র দিয়ে ধানের দু’সারির মাঝের আগাছা দমন হয় কিন্তু দু’গুছির ফাঁকে যে আগাছা থাকে তা হাত দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। যান্ত্রিক দমনে অবশ্যই সারিতে ধান রোপন করতে হবে।

 আগাছানাশক ব্যবহারে কম পরিশ্রমে ও কম খরচে বেশী পরিমাণ জমির আগাছা দমন করা যায়। প্রি- ইমারজেন্স আগাছানাশক ধান রোপনের ৩-৬ দিনের মধ্যে (আগাছা জন্মানোর আগে) এবং পোস্ট ইমারজেন্স আগাছানাশক ধান রোপনের ৭-২০ দিনের মধ্যে (আগাছা জন্মানোর পর) ব্যবহার করতে হবে। আগাছানাশক প্রয়োগের সময় জমিতে ১-৩ সেন্টিমিটার পানি থাকলে ভাল। আমন মৌসুমে আগাছানাশক প্রয়োগের পর সাধারণত হাত নিড়ানির প্রয়োজন হয় না। তবে আগাছার ঘনত্ব যদি বেশী থাকে তবে আগাছানাশক প্রয়োগের ৩০-৪৫ দিন পর হাত নিড়ানি প্রয়োজন হয়।

♦♦ বন্যার ক্ষেত্রে করণীয়ঃ

 বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর আলোক সংবেদনশীল জাত নাবীতে রোপনের ক্ষেত্রে প্রতি গোছায় চারার সংখ্যা হবে ৪-৫ টি এবং রোপন দূরত্ব হবে ২০><১০ সেন্টিমিটার।
 বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ধানের চারায় নতুন পাতা গজানো শুরু হলে বিঘা প্রতি অতিরিক্ত ১০ কেজি ইউরিয়া ও ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
 উঁচু জায়গায় বীজতলা ক্সতরি করতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে ডাপোগ পদ্ধতিতে/ভাসমান বীজতলায় চারা ক্সতরি করা যায়।
 আমন ধানের চারার ঘাটতি থাকলে নিকটবর্তী ক্ষেতের বাড়ন্ত আমন ধানের গাছ (রোপনের ৩০-৪০ দিন পর) থেকে ২-৩ টি কুশি রেখে বাকী কুশি সযত্নে শিকড়সহ তুলে নিয়ে অনতিবিলম্বে অন্য ক্ষেতে রোপন করা যেতে পারে।
 দেশের উত্তরাঞ্চলে আগাম শীত আসার কারণে ১৫ সেপ্টেম্বরের পর আমন ধানের চাষ করা উচিৎ নয়। এক্ষেত্রে আগাম রবি ফসলের আবাদ করা যেতে পারে।

সূত্রঃ- কৃষিতত্ত্ব বিভাগ
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর।
[সংগৃহীত-(সংগ্রহে-রাসেল মাহবুব)]

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com