আমন মওসুমে ধানের আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তি

শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১ | ৯:১৫ অপরাহ্ণ | 230 বার

আমন মওসুমে ধানের আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তি

মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্ন  হচ্ছে প্রধানতম। এখানে অন্নকে খাদ্য অর্থে বুঝানো হলেও আমাদের দেশে প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে- ‘দুই দিনের বৈরাগি ভাতেরে কয় অন্ন’। এটার মানে হলো খাদ্যের কথা আসলেই প্রথমে আসবে ভাত। আমরা ভাতের বিকল্প অন্য কিছু মানতে পারিনা। সেই ভাত ধান থেকে হয়। ধান হচ্ছে আমাদের দেশের প্রধান ফসল। তিন মওসুমে ধান ফসলের চাষাবাদ হয়ে থাকে। আমন মওসুম ধানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মওসুম। আঞ্চলিকভাবে এ মওসুমকে শাইল মওসুমও বলে। আমন শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ আমান থেকে যার অর্থ হচ্ছে আমানত। আবহমানকাল থেকে এ মওসুমে নিশ্চিত ফসল হিসেবে ধানের চাষাবাদ হয়ে থাকে।

আমনের কথা মনে হলে মনে পড়ে যায় বাঙলার ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবের কথা। নবান্ন ছিলো বাঙলার একটি সার্বজনীন উৎসব। সোনালী ফসলের মৌ মৌ ঘ্রাণ মনে করিয়ে দিতো- হেমন্ত এসে গেছে। আর হেমন্তকালই ছিলো সকল কৃষকের জন্য ভরা বসন্ত।

webnewsdesign.com

আমন মওসুমের ধান ফসল চাষাবাদে কৃষক ভাইদের জন্য বীজ থেকে বীজ পর্যন্ত অত্যাবশ্যকীয় আধুনিক প্রযুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

জমি/ স্থান নির্বাচনঃ


বেলে, দো-আঁশ বা এঁটেল মাটির উঁচু, মাঝারি বা নিচু যে কোনও জমিতেই আমন ধান চাষ করা যেতে পারে। আমনের চাষ মূলত বৃষ্টি-নির্ভর। সেচসেবিত এলাকাতেও কেবলমাত্র বৃষ্টির অভাবেই সেচ ব্যবহৃত হয়।

বীজতলা তৈরীঃ


বীজতলার জন্য বাড়ির কাছাকাছি উর্বর এটেল ও দোআঁশ মাটি, পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা আছে এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। সেচ ও নিষ্কাশনের সুবিধা আছে এমন জমিই আমন ধানের বীজতলার জন্য আদর্শ। উর্বর ও মাঝারি উর্বর জমিতে বীজতলা তৈরি করতে  কোন সার প্রয়োগের প্রয়োজন হবে না।

জমি অনুর্বর ও স্বল্প উর্বর হলে পর্যাপ্ত জৈব সার সুষমভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। ২-৩ ইঞ্চি পানি রেখে ২-৩ টি চাষ ও মই দিয়ে ৭-১০ দিন পানি আটকিয়ে রেখে দিতে হবে। আগাছা, খড় ইত্যাদি পঁচে গেলে আবারও চাষ ও মই দিয়ে থকথকে কাদাময় করে জমি তৈরী করতে হবে।

এবার জমির দৈর্ঘ্য বরাবর এক মিটার চওড়া বেড তৈরি করতে হবে। দুই বেডের মাঝে ১২ ইঞ্চি ফাঁকা রাখতে হবে। উক্ত ফাঁকা জায়গার মাটি দু’পাশের বেডে তুলে দিয়ে ৪ ইঞ্চি গভীল নালা তৈরী করতে হবে। এনালা পানি সেচ ও চলাচলের কাজে ব্যবহৃত হবে।

বীজ শোধন, জাগ দেওয়া এবং বীজতলায় বীজ ফেলাঃ


  • বীজ অল্পসময় রোদে শুকিয়ে ছায়ায় ঠান্ডা করতে হবে।
  • প্রতি কেজি ধান বীজের জন্য ৩.০ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম গ্রæপের ছত্রাকনাশক ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ২৪ ঘন্টা ভিজিয়ে শোধন করতে হবে।
  • আমনে ৪০-৪৮ ঘন্টা/২ দিন জাগ দিলে অঙ্কুর বের হবে।
  • অঙ্কুর ধানের সমান লম্বা হলে বীজতলায় বপনের উপযোগি হবে।
  • প্রতি বর্গ মিটার বীজতলায় ৮০ গ্রাম বা শতাংশে ৩ কেজি বীজ বপন করতে হবে।
  • এক শতাংশ বীজতলার চারা দিয়ে ২০-২৫ শতাংশ জমি রোপণ করা যাবে।

বীজ বপণের সময়ঃ


আষাঢ় মাসই আমন মৌসুমের বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। তবে জাত ভেদে আষাঢ় থেকে শ্রাবণ বা ১৫ জুন থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বীজ বপন করা যায়।

চারা রোপণঃ


  • আমন মওসুমে জাতভেদে ২০-৩০ দিন বয়সের চারা রোপণ করা উত্তম। প্রতি গোছায় ২-৩ টি চারা দিয়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করতে হবে।
  • জাতভেদে সারি থেকে সারি ২০-২৫ সে. মি. এবং গোছা থেকে গোছা ১৫ সে. মি. দূরত্বে রোপণ করতে হবে।
  • প্রতি দশ লাইন পর পর লোগো পদ্ধতি অনুসরণ করা উত্তম।

সার ব্যবস্থাপণাঃ


এলাকা ও জমির উর্বরতার উপর নির্ভর করে সারের মাত্রা কম বেশী হতে পারে। আমন মওসুমে নি¤œ উর্বর জমির ক্ষেত্রে প্রতি বিঘায় (৩৩ শতাংশ) জমির জন্য বিভিন্ন সারের মাত্রা নিম্নরূপঃ

ইউরিয়াঃ ২৪ কেজি, টিএসপিঃ ১০ কেজি, এমওপিঃ ২৪ কেজি, জিপসামঃ ১০ কেজি, জিংক/ দস্তাঃ ১ কেজি।

ইউরিয়া ব্যতিত অন্যান্য সার সম্পূর্ণ পরিমাণ জমি তৈরীর সময় শেষ চাষের পূর্বে প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

  1. চারা রোপণের ১০, ২৫ ও ৪০-৪৫ দিন পর ইউরিয়া সার সমান তিন ভাগ করে ৩ কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
  2. উপরি প্রয়োগের সময়ে জমিতে ছিপছিপে পানি (১-২ ইঞ্চি) বা প্রচুর রস থাকতে হবে।
  3. জমি শুকনো বা বেশী পানি থাকলে অথবা ধানগাছের পাতায় পানি জমে থাকলে ইউরিয়া প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
  4. সার উপরি প্রয়োগ করে নিড়ানি যন্ত্র বা উইডার দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করলে ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

পানি ব্যবস্থাপণাঃ


ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগের পর ৫-৭ দিন পর্যন্ত জমিতে ১-২ ইঞ্চি পানি থাকা দরকার। তবে কাইচ থোড় আসার পর থেকে দানা গঠন পর্যন্ত জমিতে অবশ্যই পানি রাখা প্রয়োজন।

আগাছা, পোকা ও রোগ ব্যবস্থাপণাঃ


১.      হাত দিয়ে, নিড়ানি, উইডার অথবা আগাছানাশক ব্যবহারের মাধ্যমে আগাছা দমন করা যেতে পারে।

২.      আইপিএম পদ্ধতিতে পোকা মাকড় দমন সবচেয়ে উত্তম। প্রয়োজনে কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। কীটনাশক সবসময় অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

৩.     উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে পোকা ও রোগের আক্রমণ দেখা দিলে তা সনাক্ত করে প্রয়োজনীয় কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক সঠিক মাত্রায় সঠিক সময়ে প্রয়োগ করতে হবে।

ফসল কর্তনঃ


শীষের শতকরা ৮০ ভাগ ধানের চাল শক্ত ও স্বচ্ছ হলে ধান ঠিকমতো পেকেছে বলে বিবেচিত হবে। পরিপক্ক ধান কাটতে দেরি করা মোটেই উচিত নয়।

পরিশেষে, আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে ভালো ফলন পেতে আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তি গ্রহণের বিকল্প নেই। আমনের নিশ্চিত ফসলকে ভালো ফলন সমেত ঘরে তুলতে নিত্যনতুন জাত ও পদ্ধতি অনুসরণ করণে কৃষক ভাইদের এগিয়ে আসতে হবে।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com