আমের চাষাবাদ- পর্ব ১

রবিবার, ০৪ মার্চ ২০১৮ | ১০:৪৩ অপরাহ্ণ | 1004 বার

আমের চাষাবাদ- পর্ব ১

রাসেল মাহবুব ও জোবায়ের কায়সারঃ
আম একটি অতি জনপ্রিয় এবং সুস্বাদু ফল। আমকে সাধারণত ফলের রাজা বলা হয়। আমাদের দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমের চাষাবাদ হয়ে থাকে। আমরা আমের চাষ ও পরিচর্যা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করব। তবে সম্পূর্ণ লিখাটি বড়সর হওয়ায় আমরা ৫টি পর্বে ভাগ করেছি। ২য় পর্বে থাকবে- আমের জাত পরিচিতি,৩য় পর্বে- আমের রোগ, লক্ষন ও তার প্রতিকার, ৪র্থ পর্বে আমের পোকা, ক্ষতির লক্ষন ও প্রতিকার এবং ৫ম ও শেষ পর্বে থাকবে আম উৎপাদনে প্রাকৃতিক কিছু প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধানের উপায়। আশা করি আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন।

আজ থাকছে ১ম পর্বে – “আমের পুষ্টি ও চাষাবাদ পদ্ধতি”

আম একটি আঁশযুক্ত বহুগুনে গুনান্যিত পুষ্টি সমৃদ্ধ ফল।

পুষ্টিঃ
পাকা আম ক্যারোটিনে ভরপুর। এছাড়া প্রচুর পরিমানে খনিজ পদার্থ থাকে।

ভেষজ গুণঃ
আমের শুকনো মুকুল পাতলা পায়খানা, প্রস্রাবের জ্বালা উপশমে ব্যবহার করা যায়। আম লিভার ও যকৃতের জন্য উপকারি।

ব্যবহারঃ
চাটনি, আচার, জুস, আমসত্ত্ব ও ক্যান্ডি ইত্যাদি।

আম চাষে জমি ও মাটিঃ
উর্বর দোআঁশ উঁচু ও মাঝারি জমি আম চাষের জন্য উপযোগী । যেখানে পানি জমে না ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে।

চারাঃ
বর্তমান সময়ে আম চাষে কলমের চারাকেই উত্তম ধরা হয়। ক্লেফট গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা তৈরি করা যায়। অথবা চারা নার্সারি হতেও সংগ্রহ করা যায়।উন্নতমান ও সঠিক জাতের রোগমুক্ত চারা পেতে মানসম্মত নার্সারি হতে চারা সংগ্রহ করতে হবে।

জমি তৈরি ও চারা রোপনঃ
বাগান তৈরির প্রথম দিকে জমি উত্তম ভাবে চাষ করে নিতে হবে। জাত ভেদে প্রতি গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৮ থেকে ১০ মিটার রাখতে হয়। ১মিঃ><১মিঃ><১মিঃ আকারের গর্ত তৈরি করতে হবে।প্রতি গর্তে সারের পরিমাণ – কম্পোস্ট বা পঁচা উপযুক্ত গোবর ২০-২২ কেজি, ইউরিয়া ১৫০ গ্রাম, টিএসপি সার ৫৫০ গ্রাম, এমওপি সার ৩০০ গ্রাম, জিপসাম সার ৩০০ গ্রাম, জিংক সালফেট সার ৬০ গ্রাম মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করতে হবে। গর্ত ভর্তির ১০-১৫ দিন পর চারার গোড়ার মাটির বলসহ গর্তের মাঝখানে রোপণ করতে হবে।

ষড়ভুজ পদ্ধতিতে আম চারা রোপণ করলে ১৫ ভাগ চারা বেশি রোপণ করা যায়। জৈষ্ঠ্য থেকে আষাঢ় (মধ্য মে থেকে মধ্য জুলাই) এবং ভাদ্র-আশ্বিন মাস (মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য অক্টোবর) চারা রোপণের উপযুক্ত সময়।

সার ব্যবস্থাপনাঃ
একটি পূর্ণ বয়স্ক ফলন্ত আম গাছে বছরে ৫০ কেজি জৈব সার, ২ কেজি ইউরিয়া, ১ কেজি টিএসপি, ৫০০ গ্রাম এমওপি, ৫০০ গ্রাম জিপসাম ও ২৫ গ্রাম জিংক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে। উল্লেখিত সার ২ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথমবার জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় মাসে ফল সংগ্রহের পর এবং দ্বিতীয়বার আশ্বিন মাসে প্রয়োগ করতে হবে।

সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনাঃ বাগানে প্রয়োজনমাফিক নিয়মিত সেচ দিতে হবে। জমিতে কখনই যেন রসের টান না পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফলন্ত আম গাছে দুইবার বেসিন পদ্ধতিতে সেচ দেয়া প্রয়োজন। প্রথমবার প্যানিকল যখন ৬-৮ ইঞ্চি (১৫-২০ সেমি.) লম্বা হয় এবং দ্বিতীয়বার যখন ফল মটর দানার মতো হয়। এতে ফল এর আকার, মান ও ফলন ভালো হয়। প্রচন্ড খরা দেখা দিলে এবং ফল ঝরার পরিমাণ বেশি হলে তখনও সেচ দিতে হবে। ফলন্ত গাছে মুকুল বের হওয়ার ৩-৪ মাস আগ থেকে সেচ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।কারণ এ সময় বাড ডিফারেনশিয়েশন হয়। ফলে গাছ অল্প পানির অভাব পছন্দ করে। কিন্তু যদি সেচ দেয়া হয় অথবা বৃষ্টি হয়ে যায় তাহলে গাছের ফুলের পরিবর্তে নতুন পাতা গজাবে বেশি করে কারণ বিটপে বিদ্যমান কার্বন ও নাইট্রোজেনের অনুপাত বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেড়ে গেলে নতুন পাতা গজাবে।ফলে ফলন উল্লেখ্যযোগ্য হারে কমে যায়। তবে মুকুল ফোটার পর ও ফল মটর দানা হলে একবার বেসিন পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া দরকার। গাছের গোড়া ও গাছের ডালপালা  সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কলমের গাছের বয়স ৪ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মুকুল ভেঙে দিলে পরবর্তীতে ফলন ভাল হয়।

আন্তঃপরিচর্যাঃ
বাগানের গাছগুলোকে অধিক উৎপাদনক্ষম করার জন্যে বাগানে বছরে ২-৩ বার লাঙল, পাওয়ার টিলার অথবা কোদাল দ্বারা কুপিয়ে গভীর চাষ দিতে হবে।এতে বাগানের আগাছা ও ঘাস মাটির সাথে মিশে জৈবসারে পরিণত হবে। মাটির ভেতরকার পোকামাকড়ও মরে জৈব পদার্থ হিসেবে মাটিতে যোগ হবে। তাছাড়া মাটির আর্দ্রতা  ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং পুষ্টি উপাদানগুলো গাছের গ্রহণের উপযোগী হবে।

গাছের বৃদ্ধি ও বেশি ফলনের জন্য সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে ও সঠিক পদ্ধতিতে সার ও সেচ দেয়া আবশ্যক। বিভিন্ন বয়সের আম গাছে সার প্রয়োগের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি নিচে দেখানো হলো।
গাছের বয়স অনুযায়ী সারের পরিমাণ

সারের নাম    –      গাছের বয়স(বছর)
২-৫        ৬-৯        ১০-২০     ২০’র বেশি
জৈবসার(কেজি)২০-৩০  ৩০-৪০   ৪০-৫০     ৪০-৫০
ইউরিয়া (গ্রাম) ২৫০       ৫০০       ১০০০       ২০০০
টিএসপি (গ্রাম)২০০       ২৫০        ৫০০        ১০০০
এমপি (গ্রাম)   ১২৫       ২৫০         ৫০০        ১০০০
জিপসাম (গ্রাম)১০০      ২৫০         ৫০০         ৫০০
জিঙ্কসালফেট(গ্রাম)২৫    ২৫           ২৫          ২৫

আগেই বলা হয়েছে বছরে দু’বার সার প্রয়োগ করতে হবে। মাটিতে প্রয়োজনীয় রসের অভাব হলে সার প্রয়োগের পর সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। ফিডার রুটগুলো গাছের গোড়া থেকে দূরে থাকে।উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে গাছের বয়স অনুযায়ী এ দূরত্ব (মাঝামাঝি থেকে বড় গাছ) ১.৫-৩.০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে ছোট চারা গাছের ক্ষেত্রে ১৫-৩০ সেমি. হতে পারে। কাজেই যেখানে ফিডার রুটগুলো থাকে সেখানেই সার দিতে হবে। দুভাবে সার দেয়া যায়। নালা পদ্ধতিতে গাছের গোড়া থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ২-৩.০ মিটার দূরে ৩০ সেমি. প্রশস্ত ও ১৫-২০ সেমি. গভীর করে চক্রাকারে নালা তৈরি করে তাতে সার দিতে হবে। পরে মাটি দ্বারা ঢেকে দিতে হবে। অথবা দুপুর বেলা যে জায়গায় গাছের ছায়া পড়ে সেই জায়গায় সার ছিটিয়ে কোদাল দ্বারা কুপিয়ে ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। কোদাল দ্বারা কুপানোর সময় সোজা না কুপিয়ে পার্শ্বভাবে কোপাতে হবে যাতে করে গাছের শিকড় না কাটে।

ছাঁটাইঃ
সাধারণত আম গাছের ডাল ছাঁটাই প্রয়োজন হয় না। কারণ আমের মুকুল আসে ৪-৫ মাস বয়সের বিটপ এর মাথায়। তবে ছোট এবং বয়স্ক গাছের মৃত, শুকনা রোগাক্রান্ত শাখা ও কেবলমাত্র বয়স্ক গাছের পরজীবী উদ্ভিদ দ্বারা আক্রান্ত শাখা আম পাড়ার পর পরই ছাঁটাই করা দরকার। তাছাড়া গাছের ভেতরের অনেক সুস্থ ডাল থাকে যেগুলোতে ফুল ধরে না সেগুলো ছাঁটাই করা দরকার। ছাঁটাই এমনভাবে করতে হবে যেন গাছের ভেতরে প্রচুর পরিমাণে সূর্যালোক প্রবেশ করতে পারে। কাটা ডালের মাথায় বোর্দোপেস্টের প্রলেপ দিতে হবে যাতে করে রোগের  আক্রমণ হতে না পারে। পেস্ট তৈরি জন্য তুঁত ২৫০ গ্রাম ও চুন ২৫০ গ্রাম নিয়ে এমনভাবে এক লিটার পানিতে মিশাতে হবে যাতে করে পেস্ট তৈরি হয়। এ পেস্ট তৈরির ১২ ঘণ্টার মধ্যে ব্রাশের মাধ্যমে ডালের কাটা অংশে প্রয়োগ করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে,ডাল ছাঁটাই এর আগে গাছ নিয়মিত এবং যথেষ্ট পরিমাণে গুণসম্পন্ন ফল দেয়। এতে প্রতি বছর ফল না আসার সমস্যা কিছুটা কমানো যায়।

যে বছর গাছে প্রচুর ফুল আসে, সে বছর যদি গাছের অধের্ক ফুল ভেঙে দেয়া হয়, তাহলে গাছের সেই অংশ নতুন শাখা উৎপন্ন করবে। আগামী বছর সেই অংশে ফুল ও ফল উৎপন্ন করবে। এভাবে আম গাছ থেকে নিয়মিত ফলন পাওয়া যেতে পারে।

ফসল তোলাঃ
আমের বোটা যখন হলুদাভ রঙ ধারণ করে তখন আম সংগ্রহ শুরু করতে হয়। গাছ ঝাকি না দিয়ে জালিযুক্ত বাঁশের কৌটার সাহায্যে আম সংগ্রহ করা ভালো।

বাজারজাতকরণঃ
আম বাজারজাত করনের পূর্বে বাছাই করে নস্ট, রোগ-পোকায় আক্রান্ত ও আঘাত প্রাপ্ত আম আলাদা করে নিতে হবে। প্যাকিং এর আগে বাছাই করে গ্রেডিং করে নিলে ভাল দাম পাওয়া যায়। প্রতিটি আম আলাদা আলাদা পেপারে মুড়িয়ে প্যাকিং করলে মান ভাল থাকে।

[সংগৃহীত ও সংকলিত]
সংকলন সহযোগীতায় -জোবায়ের কায়সার,উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Development by: webnewsdesign.com