আমের চাষাবাদ – ২য় পর্ব

বুধবার, ০৭ মার্চ ২০১৮ | ৪:৫১ অপরাহ্ণ | 630 বার

আমের চাষাবাদ – ২য় পর্ব

রাসেল মাহবুব ও শাহেন শাহঃ

আমের জাত পরিচিতি-

আম চাষাবাদের গত পর্বে অর্থাৎ ১ম পর্বে আমরা আমের পুষ্টি ও চাষ নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ আমরা আমের জাত ও জাতের ধরন/গুন নিয়ে আলোচনা করব।
আম চাষাবাদের ধারাবাহিকতায় আগামী পর্ব গুলোতে থাকবে- ৩য় পর্বে- আমের রোগ, লক্ষন ও তার প্রতিকার, ৪র্থ পর্বে আমের পোকা, ক্ষতির লক্ষন ও প্রতিকার এবং ৫ম ও শেষ পর্বে থাকবে আম উৎপাদনে প্রাকৃতিক কিছু প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধানের উপায়। আশা করি আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন।

বারি’র জাত সমূহঃ

বারি আম-১ (মহানন্দা):
প্রতি বছর নিয়মিত ফল দেয় কিছুটা আগাম জাম। মধ্য পৌষে মুকুল এবং মধ্য জৈষ্ঠ্য পাকে।ফল আকর্ষণীয় হলুদ, শ্বাস গাঢ় হলুদ, মধ্যম রসালো, আঁশহীন, মিষ্টতা-১৯%। বাংলাদেশের সবখানেই এ জাতটির চাষ করা যায়। পাকা ফলের রং আকর্ষণীয় হলদে। ফলের ওজন গড়ে প্রায় ২০০ গ্রাম।পূর্ণবয়স্ক গাছে গড়ে ৭০০-৮০০ টি ফল ধরে।

বারি আম-২ঃ
ফাল্গুনের ১ম সপ্তাহে মুকুলএবং পাকে আষাঢ়ের ১ম সপ্তাহে।ফল গাঢ় হলুদ, শ্বাস গাঢ় হলুদ, মধ্যম রসালো, আঁশহীন, মিষ্টতা-১৭.৫%।
প্রতি বছর ফল ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন জাত। ফলের ওজন গড়ে ২৫০ গ্রাম। ফলের খোসা মধ্যম পুরু ও মসৃন। বাংলাদেশের সবখানেই এ জাতটির চাষ করা যায়।

বারি আম-৩ (আম্রপালি):
প্রতি বছর নিয়মিত ফল দেয়। ফলের শাঁস গাঢ় কমলা রঙের। আঁশহীন, মধ্যম রসালো,আঁশহীন, মিষ্টতা-২৩.৪%,শাঁস ফলের শতকরা ৭০ ভাগ। গাছের আকৃতি মাঝারি।
একে ডায়াবেটিক বা বাউ আম-৩ নামে বলা হয়। এই আমে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কম বিধায় তা ডায়াবেটিকস রোগীদের জন্য বেশ উপকারী।প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা ১৫৫-১৭০ টি।

বারি আম-৪ (হাইব্রিড আম):
এটি একটি উচ্চ ফলনশীল, মিষ্টি স্বাদের নাবী জাত। ফজলী আম শেষ হওয়ার পর এবং আশ্বিনা আমের সাথে এ জাতের আম পাকে। ফল হালকা হলুদ, শ্বাস হলুদ, মধ্যম রসালো, আঁশহীন, মিষ্টতা-২৪.৫%।এ জাতের আম কাঁচা অবস্থাতেও খেতে মিষ্টি।

বারি আম-৫ঃ
আমটি লম্বা ও ছোট আকারের, প্রতিটি আমের গড় ওজন ১৯০ গ্রাম, ১০ বছরের একটি গাছে ১৪০-১৬০ কেজি আম উৎপাদিত হয়। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আমটি সংগ্রহ করা হয়, পাকা অবস্থায় দেখতে হালকা হলুদ রঙের ও শাঁসের রং কমলা বর্ণের ও রসালো এবং মোট খাদ্যাংশ ৭০ ভাগ। আমের মিষ্টিমান (টি এস এস) ১৯-২০ % এবং সংগ্রহকাল ৫-৮ দিন। জাতটি রপ্তানীযোগ্য। হেক্টর প্রতি ফলন ১৫-২০টন।

বারি আম-৬ঃ
আমটি লম্বা আকারের, প্রতিটি আমের গড় ওজন ২৮০ গ্রাম, ১২ বছরের একটি গাছে ১৭০ কেজি আম উৎপাদিত হয়। জুন মাসের শেস সপ্তাহ হতে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে আমটি সংগ্রহ করা হয়, পাকা অবস্থায় দেখতে হালকা হলুদ রঙের ও শাঁসের রং হলুদ এবং মোট খাদ্যাংশ ৭২ ভাগ। আমের মিষ্টিমান (টি এস এস) ২১ % এবং সংগ্রহকাল ৫-৯ দিন। এটি সংরক্ষণ গুণ ভালো। হেক্টর প্রতি গড় ফলন ১৬ টন।

বারি আম-৭ঃ
আমটি দেখতে গোলাকার, প্রতিটি আমের গড় ওজন ২৯০ গ্রাম, ৮ বছরের একটি গাছে গড়ে ১৬০ কেজি আম উৎপাদিত হয়, জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমটি সংগ্রহ করা হয়, পাকা অবস্থায় দেখতে সিঁদুর লাল হতে হালকা হলুদ রঙের ও শাঁসের রং হলুদ রঙের এবং মোট খাদ্যাংশ ৭৭ ভাগ। আমের মিষ্টিমান (টি এস এস) ১৯ % এবং সংগ্রহকাল ৯-১৩ দিন। বিদেশে রপ্তানীর জন্য যে বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তার সবগুলোই এই আমে বিদ্যমান।

বারি আম-৮ঃ
এটি একটি সুস্বাদু ও উচ্চফলনশীল জাত। গাছ মধ্যম আকৃতির, উচ্চ ফলনশীল, প্রতিবছর ফল দেয় এবং আমের বাণিজ্যিক জাত ল্যাংড়ার সাথে থাকে। ফল লম্বাটে ডিম্বাকৃতির, আকারে মধ্যম, গড় ওজন ২৭০ গ্রাম, লম্বায় ১১.৩ সেমি ও প্রস্থে ৭.০ সেমি, পুরত্বে ৬.০ সেমি, পাকা ফলের রং হলুদাভ সবুজ, চামড়া পাতলা ও শাষের রং কমলা বর্ণের, স্বাদ মিষ্টি (টিএসএস ২১%), শাস হালকা আঁশমুক্ত, চামড়া সহজেই ছাড়ানো যায়, আঁটির ওজন ২৬ গ্রাম, খোসার ওজন ৫০ গ্রাম, ভক্ষণযোগ্য অংশ শতকরা ৭০ ভাগ এবং সংরক্ষণ ক্ষমতা ভাল (৫-৯ দিন), জাতটি পলিএম্ব্রায়োনিক হওয়ায় বীজ থেকে মাতৃগুণাগুণ সম্পন্ন চারা উৎপাদন করা যায়। দেশের সব এলাকায় এমনকি ঝড় প্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলেও চাষ উপযোগী। হেক্টর প্রতি গড় ফলন ২০-২৫ টন।

বারি আম-৯ (কাঁচা মিঠা):
প্রতি বছর ফলদানকারী একটি উচ্চ ফলনশীল আগাম জাত। কাঁচা ফলের শাঁস সাদা, আঁশহীন, মধ্যম মিষ্টি। রাজশাহী অঞ্চলে চাষ উপযোগী।
সাত বছর বয়স্ক গাছে হেক্টর প্রতি গড় ফলন ১.৩৫ টন।

বারি আম-১০ –
নিয়মিত ফল দানকারী মাঝমৌসুমী জাত। ফল ডিম্বাকৃতির, আঁশবিহীন ও স্বাদে খুব মিষ্টি। পাকা ফল হলুদ রঙের। শাঁস গাঢ় হলুদ রঙের। মিষ্টতা ১৬%।১০-১২ বছর বয়সী গাছে গড়ে ২৯০ টি ফল ধরে যার ওজন গড়ে ৭২.৫ কেজি।
তেমন রোগ বালাই হয় না।

বাউ এর জাত সমূহঃ

বাউ আম-১(শ্রাবনী-১/নিলাম্বরী)-
একটি নাবী জাত, মাঝারী আকৃতির গাছ। যশোর অঞ্চরের স্থানীয় জাত হতে নির্বাচন করা হয়েছে। ফলের গড় ওজন – ২৭৩.২৩ গ্রাম।টিএসএস- ২২%। প্রতি বছর ফল ধরে।

বাউ আম- ২ -(সিন্দুরী/সিন্ধু/ সিডলেস)-
মাঝ মৌসুমী জাত। ভারতীয় হাইব্রীড জাত সিন্ধু হতে নির্বাচিত জাত। বামন জাত। ফলের গড় ওজন ১৯২.২০ গ্রাম।টিসিএস – ১৮.%।

বাউ আম-৩ (ডায়াবেটিক/মিক্সড – স্পেশাল)-
মাঝ মৌসুমী জাত। বছরে ২-৩ বার গাছে ফুল ও ফল আসে। টিএসএস-১৮%। বামন জাত। প্রতি বছর ফল ধরে।ফলের গড় ওজন প্রায় ২৫৫ গ্রাম।

বাউ আম-৪(র‌্যাড)–
বামন আকৃতির মাঝ মৌসুমী জাত।প্রতিবছর আম ধরে।আম লম্বাটে মাথার দিকে চোখা।মিষ্টতা ২৪%।জাতটি ফিলিপিনো জাতর্ যাড হতে নির্বাচন করা হয়েছে।গড় ওজন ২১৬.৬২ গ্রাম।

বাউ আম-৫ (শ্রাবনী-২/নিলাম্বতী)-
নাবী জাত, যশোর অঞ্চলের স্থানীয় জাত হতে নির্বাচন করা হয়। প্রতিবছর আম ধরে। মাঝারী আকৃতির গাছ। প্রতি বছর ফল ধরে। মিষ্টতা ২০.৫৮%।ফলের গড় ওজন প্রায় ৩৩২.১০ গ্রাম।

বাউ আম-৬ (পলিএ্যাম্বব্রায়নী-১)-
গাছ বামন আকৃতির এবং নাবী জাত। ভক্ষনীয় অংশ ৮৫.৩১%। মিষ্টতা ১৭.৪৬% । একটি বীজ হতে গড়ে ৫-৮ টি চারা পাওয়া যায়, এর মধ্যে একটি চারা জাইগোটিক বাকিগুলো নিউসেলাস (যা মাতৃগুনাগুন সম্পন্ন)।জাইগোটিক চারাটি রুট ষ্টকের জন্য উপযোগী। নিউসেলাস চারা মাতৃগুনাগুন বজায় রাখে । প্রতিটি ফলের ওজন ৩৮৩.১০ গ্রাম।পাঁচ বছরের একটি গাছ হতে গড়ে ১০০-৩০০টি ফল পাওয়া যায়।

বাউ আম-৭ (পলিএ্যাম্বব্রায়নী-২)-
গাছ বামন আকৃতির এবং নাবী জাত। মিষ্টতা ২২.৮০% । একটি বীজ হতে গড়ে ৫-৮টি চারা পাওয়া যায়, এর মধ্যে একটি চারা জাইগোটিক বাকিগুলো নিউসেলাস। জাইগোটিক চারাটি রুটষ্টকের জন্য উপযোগী। নিউসেলাস চারা মাতৃগুনাগুন বজায় রাখে । প্রতিটি ফলের ওজন ৩০০-৪৫০ গ্রাম।পাঁচ বছরের একটি গাছ হতে ২০০-৪০০টি ফল পাওয়া যায়।

বাউ আম-৮ (রাঙ্গুয়াই-৩)–
গাছ বামন আকৃতির এবং নাবী জাত। মিষ্টতা ২২.৪০% । একটি বীজ হতে গড়ে ৫-৮টি চারা পাওয়া যায়, এর মধ্যে একটি চারা জাইগোটিক বাকিগুলো নিউসেলাস। প্রতিটি ফলের ওজন ২৫০-৪০০ গ্রাম।

বাউ আম-৯ (সৌখিন চৌফলা)– বারমাসি,বছরে ৩-৪ বার আম ধরে। বামন জাত। প্রতি বছর ফল ধরে। আম লম্বাটে আকৃতির মিষ্টতা ২০.১২%। পাকা আমে আঁশ আছে।আমের গড় ওজন প্রায় ১০০ গ্রাম।

বাউ আম-১০ (সৌখিন -২) –
এজাতের আমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এটি বারমাসি। বছরে ২-৩ বার আম ধরে। বামন জাত। প্রতি বছর ফল ধরে। বুকের উপর হালকা খাঁজ কাটা আছে।মিষ্টতা ১৭.৮২%।আমের গড় ওজন প্রায় ২০০-২৫০ গ্রাম।

বাউ আম-১১ (কাঁচামিঠা-১)–
এটি একটি নিয়মিত ফলধারনকারী একটি আগাম জাতের আম। গড় মিষ্টতায় (ব্রিক্স) ২৩.৬৬%। খোসা ও আঁটি পাতলা। এটি একটি বামন জাতের গাছ। এ ফলের শাঁস মচমচে এবং কাঁচা মিঠা।ফলের ওজন ২০০-৩৫০ গ্রাম।

বাউ আম-১২ (কাঁচামিঠা-২)–
এটি একটি নিয়মিত ফলধারনকারী একটি মৌসুমী জাতের আম।গড় মিষ্টতায় (ব্রিক্স) ২২.৩৩%। খোসা ও আঁটি পাতলা। এটি একটি বামন জাতের গাছ। এ ফলের শাঁস মচমচে এবং কাঁচা মিঠা।ফলের ওজন ২৫০-৩৫০ গ্রাম।

বাউ আম-১৩ (কাঁচামিঠা-৩)–
এটি একটি নিয়মিত ফলধারনকারী একটি আগাম জাতের আম।গড় মিষ্টতায় (ব্রিক্স) ১৯.৮৮%। খোসা ও আঁটি পাতলা। এটি একটি বামন জাতের গাছ। এ ফলের শাঁস মচমচে এবং কাঁচা।ফলের ওজন ১৫০-৩০০ গ্রাম।

অন্যান্য জাতঃ
গৌড়মতি (Gouromoti) –
আশ্বিনা ও ল্যাংড়া জাতের প্রাকৃতিক পরাগয়নের মাধ্যমে সৃষ্ট জাত।খাবারের উপযোগী অংশ ৯৩%।রসালো, ল্যাড়া অপেক্ষা মিষ্টি। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া যায়। একটি ফলের ওজন ২৫০-৩০০ গ্রাম।একটি আম গাছ থেকে ২৫-৩০ মণ আম পাওয়া যায়।

[সংগৃহীত ও সংকলিত]
সংকলন সহযোগীতায় – জোবায়ের কায়সার ও মাহবুবুর রহমান,
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Development by: webnewsdesign.com