আমের চাষাবাদ – ৩য় পর্ব

শনিবার, ১০ মার্চ ২০১৮ | ১:৫৯ অপরাহ্ণ | 1976 বার

আমের চাষাবাদ – ৩য় পর্ব

রাসেল মাহবুব ও শহীদ উল্লাহঃ

আমের রোগ,লক্ষন ও প্রতিকার

আম চাষাবাদের বিগত পর্বগুলোতে আপনারা আমের পুষ্টি, চাষবাদ ও জাত পরিচিতি জেনেছেন। আজ আপনারা আমের রোগ, লক্ষন ও তার প্রতিকার বিষয়ে জানবেন।

আম চাষাবাদের ধারাবাহিকতায় আগামী পর্ব গুলোতে থাকবে- ৪র্থ পর্বে আমের পোকা, ক্ষতির লক্ষন ও প্রতিকার এবং ৫ম ও শেষ পর্বে থাকবে আম উৎপাদনে প্রাকৃতিক কিছু প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধানের উপায়। আশা করি আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন।

রোগব্যবস্থাপনা

আমের এ্যানথ্রাকনোজঃ এক ধরণের ছত্রাকের আক্রমনের কারণে এ রোগ হয়। এটি আমের মারাত্নক রোগ।

ক্ষতিরনমুনাঃ গাছের পাতা, কান্ড, মুকুল ও পরে ধুসর বাদামি রঙের দাগ পড়ে। এ রোগে আক্রান- মুকুল ঝরে যায়, আমের গায়ে কালচে দাগ পড়ে এবং আম পচে যায়।

প্রতিকারঃ
আমের মৌসুম শেষে গাছের মরা ডালপালা কেটে পুড়ে ফেলতে হয়। কাটা অংশে বোঁর্দো মিশ্রণ লাগাতে হয়। গাছে মুকুল আসার পর কিন’ ফুল ফোটার আগে ডাইথেন এম-৪৫ বা টিল্ট-২৫০ ইসি প্রয়োগ করা দরকার।

#আমের পাউডারী মিলডিউঃ

রোগের কারনঃ ওইডিয়াম ম্যাঙ্গিফেরী (Oidium mangiferae) নামক ছত্রাক।

রোগের লক্ষনঃ ডিসেম্বর-মার্চ মাসে পাউডারী রোগের লক্ষন দেখা যায়। কচি পাতা ও পুস্পমঞ্জরীতে পাউডারের মত গুড়া দেখা যায়। সাধারনত মঞ্জরীর শীর্ষে প্রথম আক্রমন সংঘটিত হয়। কালক্রমে তা নীচের দিকে প্রসারিত হয়ে পুস্প কক্ষ, কচি পাতা ও সরু শাখা বা কান্ডকে আক্রমন করে। রোগের ব্যাপক অবস্থায় গাছের আক্রান্ত অংশ সাদা পাউডারে আবৃত হয়ে যায় এবং কচি পাতা, মুকুল ও অপরিনত ফল ঝরে পড়ে। তাছাড়া আক্রান্ত পরিনত আমের চামড়া খসখসে হয় এবং কুঁচকে যায়।

প্রতিকারঃ
★ আম বাগান পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।
★ যদি গাছে তীব্র বেগে পানি স্প্রে করা যায় তবে ৫০% ক্ষতি কমানো সম্ভব।
★ গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার পূর্বে থিওভিট বা কুমুলাস প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপালা ভালভাবে ভিজিয়ে একবার স্প্রে করতে হবে। আবার আম গুটি বা মার্বেল আকার ধারণ করলে উপরোক্ত ঔষধ আরও একবার স্প্রে করতে হবে।
★ সালফারের গুড়া পাউডার প্রতিলিটার পানিতে ২ গ্রাম হিসাবে মিশিয়ে ভালভাবে স্প্রে করতে হবে।

#ঝুল রোগঃ
লক্ষণঃ ঝুল রোগের আক্রমণে পাতার উপর কালো আবরণ পড়ে। এই কালো আবরণ হচ্ছে ছত্রাকের দেহ ও বীজ কণার সমষ্টি। আমের শরীরেও কালো আবরণ দেখা দেয়।

বিস্তারঃ রোগের বীজকণা বা কনিডিয়া বাতাসের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে থাকে। হপার বা শোষক পোকা আমের মুকুলের মারাত্মক শত্রু। এ পোকা মুকুল থেকে অতিরিক্ত রস শোষণ করে এবং মধু জাতীয় এক প্রকার আঠাল পদার্থ (যা হানিডিউ নামে পরিচিত) নিঃসরণ করে। উক্ত হানিডিউ মুকুল ও পাতার উপর  পতিত হয় তার উপর ছত্রাকের বীজকণা জন্মায় এবং কালো আবরণের সৃষ্টি করে। হপার ছাড়াও ছাতরা পোকা (মিলিবাগ)ও স্কেল পোকা হানিডিউ নিঃসরণ করে এবং ঝুল রোগের আক্রমণে সহায়তা করে। হানিডিউ ছাড়া এ রোগ জন্মাতে পারে না।

প্রতিকারঃ
★ হানিডিউ নিঃসরণকারী হপার, মিলিবাগ বা স্কেল পোকা কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে দমনে রাখতে পারলে ঝুল রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
★ আক্রান্ত গাছে সালফার গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ভালভাবে স্প্রে করে এ রোগ দমন করা যায়।

#দাদ রোগঃ

লক্ষণঃ
আম মটর দানার মত হলেই এ রোগের আক্রমণ শুরু হতে পারে। আক্রান্ত আমের শরীর বাদামী রং ধারণ করে, খোসা ফেটে যায় ও খসখসে হয়ে উঠে। আক্রান্ত আমের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে তা ঝড়ে পড়ে। রোগের আক্রমণে বাড়ন্ত আমের শরীরে বাদামী দাগের দৃষ্টি হয়। অনুকূল আবহাওয়ায় দাগগুলো বাড়তে থাকে এবং সম্পূর্ণ আমের শরীর ঢেকে ফেলে। আক্রান্ত স্থানে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। আমের শরীর খসখসে অমসৃণ হওয়ার কারণে আমের বাজার দর কমে যায়।

প্রতিকারঃ
রোগের আক্রমণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে রোভরাল (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম) অথবা ব্যাভিস্টিন প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে ৭-১০ দিন পর পর ৩/৪ বার স্প্রে করে গাছ রোগমুক্ত রাখা যায়।

#গামোসিস বা আঠা ঝরা রোগঃ বর্তমানে আম গাছের  যে সমস্ত রোগ দেখা যায় তাদের মধ্যে আমের  আঠা ঝরা এবং হঠাৎ মড়ক অন্যতম । বর্তমানে সব জেলাতেই এ রোগটির আক্রমন পরিলক্ষিত হচ্ছে । বিজ্ঞানী এবং আম চাষীদের মতে, আম গাছের গামোসিস বা আঠা ঝরা এবং হঠাৎ মড়ক সবচেয়ে মারাত্মক । কারণ এ রোগটি ছোট বড় সব বয়সী গাছেই আক্রমন করে এবং আক্রান্ত গাছ খুব অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায় । গবেষনায় দেখা গেছে যে গামোসিস বা আঠা ঝরা এবং হঠাৎ মড়ক রোগে আক্রান্ত বড় একটি গাছ (৫০ বছরের উর্ধে বয়স) ৩-৬ মাসের মধ্যেই মারা যায়।

রোগের কারণঃ  এক প্রকার ছত্রাকের কারনে এ রোগটি হয়ে থাকে ।

রোগের লক্ষণঃ
* প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত গাছের কান্ড বা ধড় বা শাখাপ্রশাখার কিছু কিছু জায়গা থেকে ক্ষুদ্র বিন্দুর মত হালকা বাদামি থেকে গাঢ় বাদামি বা কালো রঙের আঠা বা রস বের হতে থাকে ।
* আক্রমন বাড়ার সাথে সাথে কান্ড এবং শাখা-প্রশাখার অনেক স্থানথেকে আঠা বা রস বের হতে থাকে । আক্রান্ত ডগাটির কোষ বিবর্ণ হয়ে উঠে। আক্রান্ত গাছের ডগা এবং শাখাপ্রশাখা লম্বালম্বিভাবে কাটলে বাদামী লম্বা দাগের নজরে পড়ে ।  বেশী আক্রান্ত ডগা বা ডালটি অল্প দিনের মধ্যেই মারা যায়। এ অবস্থায় মরা ডালে পাতাগুলো ডগায় আঁটকে থাকে ।
* কোন কোন ক্ষেত্রে পাতাগুলো কিছুদিন পর ঝরে পড়ে । কিছুদিন পর দেখা যায় আরেকটি ডাল একই ভাবে মারা যাচ্ছে। এভাবে এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ গাছ মারা যেতে পারে।
* এ রোগটির উল্লেখযোগ্য একটা বৈশিষ্ট হচ্ছে যে সব গুলো ডাল একসাথে মারা যাবে না। একটা একটা করে পর্যায়ক্রমিক ভাবে আক্রান্ত হবে এবং মারা যাবে । সবশেষে সম্পূর্ণ গাছটিই মারা যাবে।

প্রতিকারঃ
★ আঠা বা রস বের হওয়ার স্থানের ছাল/বাকলের কিছু সুস্থ অংশসহ তুলে ফেলে উক্ত স্থানে  বোর্দো পেষ্টের  ( ১০০ গ্রাম তুঁতে ও ১০০ গ্রাম চুন  ১ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে পেষ্ট তৈরী করা যায়) প্রলেপ দিতে হবে।

★ গাছে আক্রান্ত বা মরা ডাল পালা থাকলে তা কিছু সুস্থ অংশসহ কেটে ফেলতে হবে । কাটা ডাল পালা যত শীঘ্র সম্ভব পুড়ে ফেলতে হবে। কাটা অংশে বোর্দো পেষ্টের প্রলেপ দিতে হবে।

★ যে সকল গাছে পেষ্টের প্রলেপ দেওয়া সম্ভব না সেক্ষেত্রে বোর্দোমিক্সার অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন- কুপ্রাভিট প্রতি লিটার পানিতে ৭ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

★ গাছে নতুন পাতা বের হলে মেনকোজেব গ্রূপের ছত্রাকনাশক যেমন-ডায়থেন এম ৪৫/ পেনকোজেব/ইন্ডোফিল/কাফা ইত্যাদি প্রতি লিটার পানিতে ২-৩ গ্রাম হারে অথবা কার্বেন্ডাজিম গ্রূপের ছত্রাকনাশক যেমন- ব্যভিষ্টিন প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে ৭-১০ দিনের ব্যবধানে ৩/৪ বার স্প্রে করতে হবে।

★ আক্রান্ত গাছে পর্যাপ্ত পরিমান গোবর /আবর্জনা পঁচা/ কম্পোসট এবং রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে এবং নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে ।

[সংগৃহীত ও সংকলিত]
সংকলন সহযোগীতায় – জোবায়ের কায়সার ও আজহারুল ইসলাম (জীবন),
(লেখক ও সংকলনকারীগন প্রত্যকেই) উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com