আমের চাষাবাদ – ৪র্থ পর্ব আমের পোকা,ক্ষতির লক্ষন ও প্রতিকার-

বুধবার, ২৮ মার্চ ২০১৮ | ১:১৫ অপরাহ্ণ | 596 বার

আমের চাষাবাদ – ৪র্থ পর্ব আমের পোকা,ক্ষতির লক্ষন ও প্রতিকার-

রাসেল মাহবুবঃ

আম চাষাবাদের বিগত পর্বগুলোতে আপনারা আমের পুষ্টি, চাষবাদ, জাত পরিচিতি ও রোগ, লক্ষন ও তার প্রতিকার জেনেছেন। আজ আপনারা আমের পোকা,ক্ষতির লক্ষন ও প্রতিকার বিষয়ে জানবেন।

আম চাষাবাদের ধারাবাহিকতায় আগামী ও শেষ পর্বে থাকবে আম উৎপাদনে প্রাকৃতিক কিছু প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধানের উপায়। আশা করি আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন।

কান্ডের মাজরা পোকাঃ

বাংলাদেশের সর্বত্রই কম বেশি এ পোকার আক্রমণ দেখা যায় এবং খুব কমসংখ্যক গাছে আক্রমণ  দেখা দেয়। তবে অনেক সময় সিরিয়াস পেষ্ট হিসাবেও দেখা দিতে পারে।

ক্ষতির ধরনঃ
এ পোকা আমগাছের কান্ড ও শাখাকে আক্রমণ করে। আক্রমণ স্থান দিয়ে পোকার মল নিগৃত হয়। ছোট গাছ আক্রান্ত হলে গাছ মারা যেতে পারে। আক্রান্ত শাখাগুলো সহজেই ভেঙে যায়।

প্রতিকারঃ
★ গাছের কান্ড বা শাখায় কোনো ছিদ্র দেখা গেলে ঐ ছিদ্র পথে সুচালো লোহার শিক বা সাইকেলের স্পোক ঢুকিয়ে পোকাটির কীড়াকে খুঁচিয়ে মেরে ফেলা যায়।
★ ছিদ্রটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে তার মধ্যে কেরোসিন বা পেট্রোল ভিজানো তুলা ঢুকিয়ে ছিদ্রের মুখ কাদা দিয়ে ভালোভাবে বন্ধ  করে দিতে হবে।
★আলকাতরা দিয়ে ছিদ্রের মুখ বন্ধ করে দেয়া।
★ রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা হিসেবে সাইপারমেথিন গ্রুপের কীটনাশক ছিদ্রে প্রবেশ করানো যেতে পারে।

 

পাতা কাটা উইভিলঃ

দেশের সব স্থানে ও সব ধরনের আম গাছেই এ পোকার আক্রমন পপরিলক্ষিত হয়। তবে নার্সারিতে চারা গাছের কচি পাতায় এ পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়। তাছাড়া অনেক সময় বড় আমগাছের কচি পাতা কাটতেও দেখা যায়। এ পোকা সাধারণত আম ছাড়া অন্য কোনো গাছের ক্ষতি করে না।

ক্ষতির ধরনঃ
এ পোকা আমগাছের শুধু কচি পাতা কেটে ক্ষতি করে। কচি পাতার নিচের পিঠে মধ্য শিরার উভয় পাশে স্ত্রী পোকা ডিম পাড়ে এবং পরে পাতাটির বোঁটার কাছাকাছি কেটে দেয়। ভালো করে দেখলে কেঁচি দ্বারা কেউ কেটেছে বলে মনে হয়। এ পোকার আক্রমণে গাছের নতুন পাতা ধ্বংস হয় বেশি আক্রমণে একটি ছোট গাছ পাতাশূন্য হতে পারে।

প্রতিকারঃ
★নতুন কাটা পাতা মাটি থেকে সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
★গাছে কচি পাতা বের হওয়ার সংগে সংগে ফেনিট্রোথিয়ন বা ফেনথিয়ন ২ মিলি/লিটার পানিতে স্প্রে করলে পোকার আক্রমণ রোধ করা যায়। তাছাড়া কার্বারিল জাতীয় কীটনাশক ২ গ্রাম/লিটার পানিতে স্প্রে করলেও পোকার আক্রমণ রোধ করা যায়।

আমের ভোমরা পোকাঃ

আমের ভোমরা পোকার আক্রমনে ফলনে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে থাকে।

ক্ষতির নমুনাঃ
ভোমরা পোকার কীড়া আমের গায়ে ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে শাঁস খায়। সাধারণত কচি আমে ছিদ্র করে এরা ভিতরে ঢুকে এবং ফল বড় হওয়ার সাথে সাথে ছিদ্রটি বন্ধ করে দেয় এ জন্য বাইরে থেকে আমটি ভাল মনে হলেও ভিতরে কীড়া পাওয়া যায়।

প্রতিকারঃ
★আম গাছের মরা ও অতিরিক্ত পাতা শাখা এবং পরগাছা কেটে ফেলতে হবে। ★গাছে ফল আসার ১-২ সপ্তাহ পর অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করা দরকার।

আমের শোষক পোকাঃ

এ পোকা অন্য সব পোকার চেয়ে আমের বেশি ক্ষতি করে থাকে। বাংলাদেশের সর্বত্র এবং সবজাতে এ পোকা আক্রমণ করে থাকে। সারা বছর আমগাছে এই পোকাগুলো দেখা যায়।

ক্ষতির ধরনঃ আম গাছে কচি পাতা বা মুকুল বের হওয়ার সাথে সাথে এগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ পোকা নিম্ফ ও পূর্ণবয়স্ক উভয় অবস্থায় আমগাছের সব কচি অংশ থেকে গাছের রস চুষে খেয়ে বেঁচে থাকে। নিম্ফগুলো আমের মুকুল থেকে রস চুষে খায় এতে মুকুল শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে। একটি হপার পোকা দৈনিক তার দেহের ওজনের ২০ গুণ পরিমাণ রস শোষণ করে খায় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত আঠালো রস মলদ্বার দিয়ে বের করে দেয়, যা মধুরস বা হানিডিউ নামে পরিচিত। এ মধুরস মুকুলের ফুল ও গাছের পাতায় জমা হতে থাকে যার ওপর এক প্রকার ছত্রাক জন্মায়। এই পোকার আক্রমণে আমের উৎপাদন শতকরা ২০-১০০ ভাগ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। তাছাড়া হপার আক্রান্ত গাছের বৃদ্ধি কমে যায়।

প্রতিকারঃ
★আম বাগান সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে বিশেষ করে গাছের ডালপালা যদি খুব ঘন থাকে তবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ছাঁটাই করতে হবে যাতে গাছের মধ্যে প্রচুর আলো বাতাস প্রবেশ করতে পারে।
★আমের মুকুল যখন ৮-১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয় তখন একবার এবং আম মটরদানার মতো হলে আর একবার প্রতিলিটার পানিতে ১ মিলি হারে সাইপারমেথ্রিন মিশিয়ে সম্পূর্ণ গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করতে  হবে।
★আমের হপার পোকার কারণে শুটিমোল্ড রোগের আক্রমণ অনেক সময় ঘটে। তাই শুটিমোল্ড দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে সালফার জাতীয় ওষুধ ব্যবহার্য কীটনাশকের সাথে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

 

ফল ছিদ্রকারী পোকাঃ
আম ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ ১৯৯৫ সন থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় লক্ষ্য করা যায়। এরপর প্রায় প্রতি বছর এ পোকার আক্রমণ দেখা গেছে। বর্তমানে আম চাষীদের কাছে এ পোকা একটি অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত।

ক্ষতির ধরণঃ আম মার্বেল আকারের হলেই এ পোকার আক্রমণ শুরু হয় এবং আম পাকার পূর্ব পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। পূর্ণ বয়স্ক স্ত্রী পোকা আমের নিচের অংশে খোসার ওপর ডিম পাড়ে। কয়েক দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে কীড়া বের হয়। কীড়া খুব ছোট বিন্দুর মতো আম ছিদ্র করে আমের ভেতর ঢুকে পড়ে এবং আমের শাঁস খেতে থাকে। পরে আঁটি পর্যন্ত আক্রমণ করে। আক্রান্ত স্থানটি কালো হয়ে যায়। আক্রান্ত স্থানে জীবাণুর আক্রমণের ফলে পচন ধরে যায়। বেশি আক্রান্ত আম ফেটে যায় এবং গাছ থেকে পড়ে যায়।

প্রতিকারঃ
★আক্রান্ত আম সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে অর্থাৎ মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে এবং গাছের মরা ডালপালা ছেঁটে ফেলতে হবে। ফলে পোকার আক্রমণ কম হবে।
★আম বাগান নিয়মিত চাষ দিয়ে আগাছামুক্ত ও পরিষ্কর পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
★পোকার আক্রমণ দেখা দেয়া মাত্র ফেনিট্রোথিয়ন বা ফেনথিয়ন প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে স্প্রে করতে হবে। তাছাড়া কার্বারিল ২ গ্রাম/লিটার পানিতে দিয়ে স্প্রে করা যায়।

 

মাছি পোকাঃ
মাছি পোকা দ্বারা পরিপক্ব ও পাকা আম আক্রান্ত হয়। ফজলি, ল্যাংড়া, খিরসাপাতসহ বিভিন্ন জাতের পরিপক্ব ও পাকা আম গাছে থাকা অবস্থায় এ পোকা আক্রমণ করে।

ক্ষতির ধরনঃ
স্ত্রী পোকা ডিম পাড়ার অঙ্গের সাহায্যে গাছে থাকা অবস্থায় পরিপক্ব ও পাকা আমের গা চিরে ডিম পাড়ে অর্থাৎ খোসার নিচে ডিম পাড়ে। আক্রান্ত স্থান থেকে অনেক সময় রস বের হয়। বাইরে থেকে দেখে কোনটি আক্রান্ত আম তা ঝুঝা যায় না। আক্রান্ত পাকা আম কাটলে ভেতের সাদা রঙের কীড়া দেখা যায়। বেশি আক্রান্ত আম অনেক সময় পচে যায়। সাধারণত এ পোকা আমের ওপর এবং নিচ উভয় অংশে আক্রমণ করে।

প্রতিকারঃ
★আম গাছে পাকার আগেই পরিপক্ব অবস্থায় পেড়ে আনা
★আক্রান্ত আম সংগ্রহ করে মাটির নিচে গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে
★প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমের রসের সাথে ৫ গ্রাম সেভিন মিশিয়ে বিষটোপ বানিয়ে এ বিষটোপ বাগানে রেখে মাছিপোকা দমন করা যেতে পারে।
★আম পরিপক্ব ও পাকার মৌসুমে আমবাগানে ব্লিচিং পাউডার প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম হারে স্প্রে করতে হবে।
★আম পরিপক্ব ও পাকার মৌসুমে প্রতিটি আম কাগজ (ব্রাউন পেপার) দ্বারা মুড়িয়ে দিলে আমকে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যাবে।
★মিথাইল ইউজেনল ফেরোমন ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে প্রচুর পুরুষ পোকা মারা যাবে এবং বাগানে মাছি পোকার আক্রমণ কমে যাবে।

পাতার গল মাছিঃ
ক্ষতির ধরনঃ কয়েক প্রকারে গল সৃষ্টিকারী পোকা আমগাছের কচি পাতায় আক্রমণ করে তাতে বিভিন্ন আকারের গল রোগের সৃষ্টি করে। পাতার ওপর কিংবা নিচের পৃষ্ঠে কিংবা উভয় পৃষ্ঠে গল দেখা যায়। গলগুলো বিভিন্ন রঙের যেমন- ধূসর, বাদামি, সবুজ, লাল ইত্যাদি। স্ত্রী পোকা আমের কচি পাতার নিচের দিকে ছিদ্র করে ডিম পাড়ে। ৩-৪ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে ম্যাগোট বা বাচ্চা পোকা বের হয়। পরে পাতার কোষ এবং টিস্যুগুলোতে প্রবেশ করে রস খাওয়ার কারণে পাতায় গলের সৃষ্টি হয়। পাতায় গলের পরিমাণ বেশি হলে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে। অনেক সময় গাছের পাতা শুকিয়ে মারা যেতে পারে।
প্রতিকারঃ
★আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
★ঘনভাবে রোপণকৃত আম বাগানে ছায়া থাকে বিধায় আমগাছের পাতায় গলে আক্রমণটা বেশি হয়। এ জন্য আম পাড়ার পরে কিছু ডালপালা ছাঁটাই করা ভালো।
ডাইমিথয়েট ২ মিলি/লিটার পানিতে দিয়ে স্প্রে করলে আমের পাতায় গল মাছি দমন করা যায়।

অ্যাপসিলা পোকাঃ
অ্যাপসিলা আমের একটি মারাত্মক ক্ষতিকর পোকা। বর্তমানে এ পোকার আক্রমণ তেমন একটা দেখা যায় না। তবে অ্যাপসিলা পোকার আক্রমণ হঠাৎ করে বিক্ষিপ্তভাবে কোথাও কোথাও অল্প করে হলেও দেখা যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এটি তাবিজ পোকা নামে অনেকের কাছে পরিচিত।

ক্ষতির ধরনঃ
কচি পাতায় পাড়া ডিমের ভেতর ভ্রূণাবস্থায় থাকা প্রথম ধাপের নিম্ফ পাতার ভেতর থেকে রস চুষে খায় এবং এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত করে যার কারণে পত্রকক্ষে সুচালো মুখবিশিষ্ট সবুজ রঙের মোচাকৃতি গলের সৃষ্টি হয়। এই গল সৃষ্টি হওয়ার কারণে প্রকৃতপক্ষে আর কোনো নতুন পাতা বা মুকুল বের হতে পারে না। গাছে বেশি পরিমাণে গল সৃষ্টি হলে গলযুক্ত ডগা শুকিয়ে যায় এবং গাছের বৃদ্ধি কমে যায় ও সেই সাথে আমের ফলন কমে যায়।

প্রতিকারঃ
★অক্টোবর-নভেম্বর  মাসে সব আমগাছ থেকে নিম্ফসহ গল (তাবিজ) সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
★মার্চ এপ্রিল মাসে আমগাছের পাতায় অ্যাপসিলা পোকার ডিম পাড়ার ক্ষতচিহ্ন দেখতে পাওয়া গেলে প্রতি লিটার পানির সাথে ডাইমিথয়েট ২ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে পাতা ও ডালপালা ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।

[-চলমান ]

লেখক- উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Development by: webnewsdesign.com