করোনাভাইরাস : কারণ ও প্রতিকার

রবিবার, ২২ মার্চ ২০২০ | ২:৩৫ অপরাহ্ণ | 48 বার

করোনাভাইরাস : কারণ ও প্রতিকার
  • মুহাম্মাদ আকতার আল-হুসাইন

আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন সময় মানবজাতিকে বিভিন্ন মহামারী দিয়ে শাস্তি দেন এবং উপদেশ দেন যাতে এসব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পাপকাজ ছেড়ে দিয়ে শুধু তাঁর ইবাদত করি। মহামারী আসে আমাদের কৃতকের্মর জন্য। ইরশাদ হচ্ছে- আর আমি পাকড়াও করেছি ফিরাউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষ ও ফল- ফলাদির ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা: আরাফ, আয়াত- ১৩০)। চীনের উহানে গত ডিসেম্বর মাসে করোনাভাইরাস সনাক্ত হওয়া পর থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ হাজারের বেশি লোক মারা গেছে। এ ভাইরাসের সন্ধান মেলে ১৯৩০ এর দশকে। নতুন ওই ভাইরাসটি শনাক্ত করে চীনা র্কতৃপক্ষ। বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল সায়ন্সেডাইরক্টে ডটকম ২০১২ সালে এক গবেষণামূলক নিবন্ধে বলা হয়েছে, মুরগির ‘অ্যাকউটি রেসপিরেটির ইনফকেশন’ দেখা দিলে জানা যায় ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাস (আইবিভি) এর মূল কারণ।


প্রথমবারের মত মানুষের দেহে করোনাভাইরাস সংক্রমণের তথ্য পান বিজ্ঞানীরা। সায়ন্সেএর্লাট ডটকম বলেছে, এই ভাইরাসের রয়েছে চারটি জনোস বা গণ এগুলো হল- আলফাকরোনাভাইরাস, বেটাকরোনাভাইরাস, গামাকরোনাভাইরাস এবং ডেলটাকরোনাভাইরাস। প্রথমটি বাদুর, শুকর, বিড়াল ও মানুষে সংক্রমণ ঘটায়। আর গামাকরোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় পাখি ও পোলট্রি প্রজাতির প্রাণি। তবে ডেলটাকরোনাভাইরাসে পাখি ও স্তন্যপ্রায়ী প্রাণী উভয়ই আক্রান্ত হতে পারে। নতুন এ ভাইরাস বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী সর্তকতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও)।


যুক্তরাজ্য-ভিত্তিকি সংবাদমাধ্যম দ্য ডেডনল স্টারে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ভাইরাসের প্রতিরোধে প্রতিষেধক তৈরিতে কাজ শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। তবে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাস প্রতিষধেক তৈরিতে তাদের আরো এক বছর সময় লাগেত পারে। মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলার পাশাপাশি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকেলও নতুন ধরনের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কোথা থেকে শুরু হয়েছে সে বিষয় এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রাণঘাতি এ ভাইরাস কোনো প্রাণী থেকেই মানুষের দেহে এসেছে। তারপর এ রোগের জীবাণু বাতাসে ভেসে ও স্পর্শের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ছে। এ মহামারী সম্পর্কে সূরা আরাফের ১৩৩ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- “সুতরাং আমি তাদের বিরুদ্ধে বিস্তারিত নিদর্শনাবলী হিসাবে পাঠালাম তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত। তার পরেও তারা অহঙ্কার করল। আর তারা ছিল এক অপরাধী কওম”। অন্যত্র সূরা রুমের ৪১ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- “মানুষের কৃতকের্মর দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকের্মর স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে”। করোনা ভাইরাস বা মহামারী ছড়ানোর কারণ হাদিসে উল্লেখ রয়েছে আর তাহলো অশ্লীলতার ভয়াবহ সয়লাব।


ইবেন মাজাহের হাদিসে এসেছে- “রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন- ‘যখন কোনা জাতির মধ্যে অশ্লীলতা-বেহায়াপনা ছড়িয়ে পড়বে তখন তাদের মধ্যে এমন এমন রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়বে যা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি”। আবু দাউদের হাদিসে এসেছে- “আবু মালিক আল-আশআরী (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা:) বলেছেন- আমার উম্মাতের কতক লোক মদের ভিন্নতর নামকরণ করে তা পান করবে। তাদের সামনে বাদ্যবাজনা চলবে এবং গায়িকা নারীরা গীত পরিবেশন করবে। আল্লাহ তায়ালা এদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিবেন এবং তাদের কতককে বানর ও শুকরে রুপান্তরিত করবেন”। যখন কোনো জনপদে মহামারী দেখা দেয় তখন মানুষের জন্য ইসলামের দিক-নিদের্শনা হলো- সর্বপ্রথম আল্লাহর কর্তৃক তাকদীরের উপর খুশী থাকা। সাওয়াবের আশা নিয়ে ধৈর্য ধারণ করা। আল্লাহর কাছে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকেত সাহায্য চাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা:) তাঁর উম্মতকে এসব অবস্থায় সান্তনা দিতেন। হাদিসে শরীফে এসেছে- “মহামারী আল্লাহ তায়ালার একটি শাস্তি। তবে তা মুমিন- মুসলমানদের জন্য রহমত”। যারা আল্লাহর উপর অগাধ আস্থা এবং বিশ্বাস রাখে, সেসব লোকের পায়ে যদি কোনো কাটাও ফুটে, তবে তারা আল্লাহর কাছে এর বিনিময় পাবে। সুতরাং যারা মাহামারীর ভয়াবহ অবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা করে ধৈর্য ধারণ করবে তাদের জন্য তা মহামারী নয়। এদের জন্য আল্লাহর রহমত।

এর মাধ্যমে তাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন। সব সময় এ দোয়াটি পড়া উত্তম হবে : “হে আল্লাহ! আপনার কাছে আমি শ্বেত রোগ থেকে আশ্রয় চাই। মাতাল হয়ে যাওয়া থেকে আশ্রয় চাই। কুষ্ঠু রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে আশ্রয় চাই। আর দূরারোগ্য ব্যাধি (যেগুলোর নাম জানিনা) থেকে আপনার আশ্রয় চাই”(আবু দাউদ, তিরিমজি)। তিরিমজির অন্যত্রে এসেছে: হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার কাছে খারাপ (নষ্ট-বাজে) চরিত্র, অন্যায় কাজ ও কুপ্রবৃত্তির অনিষ্টতা এবং বাজে অসুস্থতা ও নতুন সৃষ্ট রোগ বালাই থেকে আশ্রয় চাই। সুতরাং কোনো অঞ্চলে মহামারী দেখা দিলে সেখান থেকে পালিয়ে না যেয়ে ওই অঞ্চলেই ধৈর্য্যধারণ করে বসবাস করা। যারা সে অঞ্চল থেকে না পালিয়ে র্ধৈর্যধারণ করে অবস্থান করবে, যদি তারা সেখানে মারাও যায়, তাহলে তাদের হবে শহীদি মৃত্যু। সূরা আরাফের ১৫৬ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে-“আমার দয়া প্রত্যেক বস্তুতে পরিব্যাপ্ত”। হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে- “আমার উম্মত কেবলই যুদ্ধ ও মহামারীতে ধ্বংস হবে”। তাই যে এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়বে সেখানে অবস্থান করে যদি কেউ মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে শহিদ বলে আখ্যায়িত হবে। আর মহামারী এলাকা থেকে যে পালিয়ে আসবে তাকে জেহাদ থেকে পলায়নকারীর মতোই গণ্য করা হবে। যুদ্ধের ময়দান থেকে নিজেদের সঙ্গীসাথীদের সহযোগিতা না করে পলায়ন করাকে হাদিসে যেমন কবিরা গোনাহ আখ্যা দেয়া হয়েছে তেমনি কুরআনে জেহাদ থেকে পলায়নকারীকে আল্লাহর ক্রোধে নিপতিত হওয়ার ধিক শোনানো হয়েছে। তাই মহামারী আক্রান্ত এলাকা থেকে পলায়ন করা জেহাদ থেকে পলায়ন করার মতই। করোনাভাইরাস আক্রান্ত এলাকার মানুষের জন্য এ বিধান।


ভাইরাস আক্রান্ত এলাকা থেকে যেমন কেউ পালিয়ে অন্যত্র যাবে না তেমনি বাহিরের অঞ্চল থেকের ভাইরাস আক্রান্ত এলাকায় যাওয়া ঠিক নয়। বুখারি ও মুসলিম শরীফের হাদিসে এসেছে- “রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন- যখন কোনো এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়ে তখন যদি তোমরা সেখানে থাকো তাহলে সেখান থেকে বের হবে না। আর যদি তোমরা বাইরে থাকো তাহলে তোমরা সেই আক্রান্ত এলাকায় যাবে না”। এ সবই রাসুল (সা:)-এর নিদের্শ। এ নিদের্শ পালনে কারণ না খুঁজে প্রথম তার নিদের্শ পালন করাই প্রত্যেক মুসলমানরে অন্যতম কাজ। ইসলাম সব বিষয়েই মধ্যপন্থা শিক্ষা দেয়। সে জন্যে মধ্যপন্থা পালন করা একান্ত জরুরি। আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে করোনাভাইরাসসহ যাবতীয় মহামারী থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আমাদের সবাইকে কুরআন সুন্নাহর সঠিক অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।


লেখক: ইমাম ও খতিব, ওল্ডহাম জামে মসজিদ ইউ কে।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com