কৃষি হোক আমাদের কৃষ্টি

বুধবার, ১১ এপ্রিল ২০১৮ | ৯:০২ অপরাহ্ণ | 349 বার

কৃষি হোক আমাদের কৃষ্টি

 

জীবনে বেঁচে থাকতে হলে খাদ্যের কোন বিকল্প নাই। কারন, খাদ্যের বিকল্প এখনও আবিষ্কৃত হয় নাই। আর এই খাদ্যের যোগান দেয় কৃষি। কৃষি এখনো দেশের বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা এবং অধিকাংশ জনগণই জীবন-জীবিকা ও কর্মসংস্থানের জন্য কৃষির উপর নির্ভরশীল। দেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক প্রত্যক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এ দেশের অধিকাংশ লোকের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায় হচ্ছে কৃষি। কারণ কৃষক ও কৃষির উন্নতির ওপর দেশের উন্নতি নির্ভর করে।

কৃষি ও কৃষক হলো বাংলাদেশের প্রাণ। পলিমাটি সমৃদ্ধ বাংলার মাঠে ময়দানে যে বিশাল সবুজের সমারোহ দেখা যায় তার প্রায় সবই কৃষিজাত দ্রব্য। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ আর এই বাংলাদেশ মানেই গ্রাম বাংলা, পল্লীবাংলা, মাটি ও মানুষের বাংলা। এক কথায় গোটা বাংলাই কৃষিক্ষেত্র। সুতরাং কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই কৃষিজীবী এবং সমাজে তারা খেটে খাওয়া কৃষক হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতি ও অগ্রগতিতে কৃষি ও কৃষক কেবল গুরুত্বপূর্ণই নয় বরং অপরিহার্য। আমাদের কৃষি উৎপাদন ভালো হলে জাতীয় অর্থনীতি হয়ে ওঠে সবল ও সমৃদ্ধ। কিন্তু কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশে আসে অভাব ও দুর্যোগ। বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক কেবল খাদ্য উৎপাদনেই নয়, পুষ্টি সমস্যা সমাধানে, শিল্পায়নে, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং সর্বোপরি জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশে উৎপাদিত পণ্যের অধিকাংশই আসে কৃষি থেকে। খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল পর্যন্ত সবকিছুর যোগান দেয় কৃষি।

বাংলাদেশের কৃষকরা একসময় গৌরবময় জীবন যাপন করতো। “গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরু” ছিল প্রতিটি কৃষকের বাড়িতে। পুকুরে ছিল মাছ। মোটা ভাত, মোটা কাপড়ের অভাব হয়নি কোনদিন বাংলার কৃষকের। অবশ্য এর পেছনে কারণ ছিল। তখন দেশের লোকসংখ্যা ছিল কম, জমি ছিল পর্যাপ্ত। কৃষকদের মহাজনের ঋণের বোঝা বইতে হতো না। তখনকার দিনে কৃষকের স্বাস্থ্য ছিল সবল। মনোবল ছিল অটুট। তাদের সমাজজীবনে বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান ছিল। মোট কথা, কৃষকের নিজের হাতে গড়া সোনার বাংলা ধনেশ্বৈর্যে ভরপুর ছিল। বাংলার কৃষক সুখে দিন যাপন করতো। বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষকের কথা মনে পড়লে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে এক রোগজীর্ণ অস্থি-কঙ্কালসার দৈন্যের চরম প্রতিমূর্তি। পরণে বস্ত্র নেই, মুখে চরম হতাশা ও নৈরাজ্যের ছাপ, দারিদ্র, ব্যাধি, কুসংস্কার, অশিক্ষা তাকে ঘিরে রাজত্ব করছে।
বাংলাদেশের কৃষকের এ করুণ অবস্থার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। আমাদের কৃষিতে এখনো পুরোপুরিভাবে বিজ্ঞানের ছোঁয়া লাগেনি। এ দেশের কৃষকরা এখনো নানা অঞ্চলে মানন্ধাতার আমলের পদ্ধতিতে জমি চাষাবাদ করে থাকে। ফলে উৎপাদন হয় অত্যন্ত কম। ফসল উৎপাদনের পর কৃষিঋণ এবং মহাজনের দেনা পরিশোধ করার জন্য কমদামে কৃষককে সব ফসল বিক্রয় করতে হয়। ফলে কৃষক প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। বাংলাদেশের কৃষকদের এক বিরাট অংশ ভূমিহীন। তারা অন্যের জমি চাষ করে। তাই উৎপাদিত ফসলের বেশির ভাগই মালিকের নিকট চলে যায়। ফলে কৃষক দরিদ্র থেকে যায়। দেশে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত হয় না। শুষ্ক মৌসুমে সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করার জন্য গভীর নলকূপ বসানোর সামর্থ্য ও কৃষকের থাকে না। অনেক সময় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে তা সরবরাহ করা হয় না। ফলে উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হয়। এছাড়া বন্যা, খরা, জলোচ্ছাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতি বছর হাজার হাজার একর জমির ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায় বা নষ্ট করে দেয়। ফলে কৃষকের দৈন্য আরো বেড়ে যায়।

তাই কৃষির গুরুত্বের কথা উপলব্ধি করে আমাদের দেশে কৃষি বিপ্লব ঘটাতে হবে। তাহলেই আমরা এদেশের ষোল কোটি মানুষের মুখে হাসি দেখতে পাব। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের কৃষির উন্নতির জন্য প্রথমে কৃষকদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে সচেষ্ট হতে হবে। কারণ কৃষক ও কৃষির উন্নতির মধ্যেই আমাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এছাড়া কৃষি শিক্ষায় আমাদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। কৃষি বিজ্ঞানে পড়াশুনা করে এখন দেশের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পৌঁছানো যায় সেটা সবাইকে জানাতে হবে। কৃষিতে ডিগ্রি লাভ করে বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের (বিসিএস) পরীক্ষায় টেকনিক্যাল ও সাধারণ উভয় ক্যাডারে আবেদনের সুযোগ পাওয়ায় দেশের সব কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি ৪ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্স শেষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সহ সরকারি-বেসরকারি, স্বায়িত্বশাসিত ও বহুজাতিক বিবিধ প্রতিষ্ঠানে কৃষিবিদ ও ডিঃকৃষিবিদদের কাজের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এনজিও এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন কৃষিক্ষেত্রে তাদের কাজের পরিধি বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার, বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন, রেশম উন্নয়ন বোর্ড এর ওপরে আলাদা গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন অধিদফতর, কৃষি তথ্য সার্ভিস, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সহ এ রকম অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। ভেটেরিনারি থেকে পাস করে বিসিএস পরীক্ষায় ভেটেরিনারিয়ানরা উপজেলাগুলোতে ভেটেরিনারি সার্জন হয়ে যোগদান করা যায়। একই পরীক্ষায় পশুপালন অনুষদের স্নাতকেরা উপজেলাগুলোতে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পশু উৎপাদন কর্মকর্তা কিংবা পোল্ট্রি উন্নয়ন কর্মকর্তা হয়ে যোগদানের সুযোগ পান। কৃষিবিদদের জন্য বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে উচ্চশিক্ষার বিশাল সুযোগ। যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মান, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত ও মালয়েশিয়ায় প্রতি বছর বৃত্তি নিয়ে পড়তে যাচ্ছে এদেশের ভবিষ্যৎ কৃষিবিদরা।

সর্বোপরি মাথা ছাড়া যেমন মানবদেহে ভাবা যায় না, তেমনি কৃষির উন্নতি ছাড়া ও আমাদের অর্থনীতির উন্নতির কথা ভাবা যায় না। তাই, বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষির উন্নতি ঘটাতে পারলেই আমাদের অর্থনীতির মরা গাঙ্গে জোয়ার আসবে।আশার কথা, ইতিমধ্যে উপরোল্লিখিত প্রতিষ্ঠান সমূহে হাজার হাজার কৃষিবিদ ও ডিঃকৃষিবিদ সোনার বাংলায় সবুজ বিপ্লব ঘটানোর নিমিত্তে রাত-দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তখন সোনার বাংলা ভরে উঠবে ধনে-ধান্যে, পুষ্প পল্লবে। কৃষি পরিনত হবে আমাদের কৃষ্টিতে।

লেখকঃ
ডিঃকৃষিবিদ রায়হান হোসেন
বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Development by: webnewsdesign.com