খাঁচায় মাছ চাষ ও সংরক্ষণ

শুক্রবার, ৩০ মার্চ ২০১৮ | ১১:০১ অপরাহ্ণ | 172 বার

খাঁচায় মাছ চাষ ও সংরক্ষণ
খাঁচায় মাছ চাষ

জলাশয়ে উপযুক্ত পরিবেশে প্রয়োজনীয় আকারের খাঁচা যথাযথভাবে স্থাপন করে মাছ চাষ করা যায়। এটাই হলো মূলত খাঁচায় মাছ চাষ প্রযুক্তি। এভাবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাছ চাষ করা যায়।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে খাঁচায় মাছ চাষ শুরু হয়েছে বটে। তবে পৃথিবীর মৎস্য চাষের ইতিহাসে এটি নতুন ঘটনা নয়। চীনের ইয়াংঝি নদীতে প্রায় সাড়ে সাতশ’ বছর আগে খাঁচায় মাছ চাষ শুরু হয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং বাণিজ্যিক কারণে খাঁচায় মাছ চাষ ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে।

প্রশ্ন হতে পারে যে, আমরা খাঁচায় মাছ চাষ কেন করবো। এ প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ। এই পদ্ধতিতে খাঁচাকে পুকুরের মতো ব্যবহার করা যায়। খাঁচায় মাছ চাষের মাধ্যমে বিভিন্ন জলাশয়ে অতিরিক্ত মাছ উৎপাদন করা যায়।

নদীর পানিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করে মাছ চাষ করা যায়। আবার মাছের বর্জ্য প্রবহমান নদীর পানির সাথে চলে যাওয়ায় নদীর পানি দূষিত হয় না। পানি প্রবহমান থাকায় খাঁচার ভেতরের পানি অনবরত পরিবর্তিত হতে থাকে এবং সে কারণে খাঁচায় অধিক ঘনত্বে মাছ চাষ করা যায়। খাঁচার মাছের উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে নদ-নদীতে প্রাকৃতিক প্রজাতির মাছের উৎপাদন বেড়ে যায়।

পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে খাঁচায় মাছ চাষ হচ্ছে। চীন দেশে এই প্রযুক্তি বেশ জনপ্রিয়। যতদূর জানা যায়-চীনেই প্রথম ছোট খাঁচায় বেশি ঘনত্বে মাছ চাষ শুরু হয়েছিল। সে দেশে সম্পূরক খাবার দিয়ে খাঁচায় তেলাপিয়া এবং কমন কার্প চাষ খুব জনপ্রিয়। তাইওয়ানেও খাঁচায় মাছ চাষ করা হয়। সেখানে ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম ওজনের তেলাপিয়া খাঁচায় চাষ করে ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের তেলাপিয়ায় পরিণত করা হয় এবং পরে ফিলেট আকারে রফতানি করা হয়। দেশটি সেই ২০০৬ সালেই ২০,০০০ মেট্রিক টন ফ্রোজেন তেলাপিয়া এবং ৩,১০০ মেট্রিক টন তেলাপিয়ার ফিলেট রফতানি করে।

ইন্দোনেশিয়ায়ও খাঁচায় মাছ চাষ জনপ্রিয়, তবে জাভা অঞ্চলে এই প্রযুক্তির প্রচলন অনেক বেশি। জাভা অঞ্চলের ‘সিরাতা’ থেকে প্রায় ৩০,০০০ খাঁচায় মাছ চাষ করা হচ্ছিল।

থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে অতি সাধারণ জাল দিয়ে তৈরি খাঁচায় এক বছরের জন্য কোরাল বা ভেটকি মাছ চাষ করা হয়। সমুদ্রে ছোট মাছ ধরে তা খাঁচায় মাছের জন্য খাবার হিসেবে দেয়া হয়। ওদিকে, ভিয়েতনামে স্রোতহীন নদীতে খাঁচায় জলজ আগাছা খাদ্য হিসেবে দিয়ে গ্রাসকাপ এবং তেলাপিয়া মাছ চাষ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের ৬টি এলাকা-দিরাইয়ে সুরমা নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করে দুই বছর আগেই দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিককালে চাঁদপুর এলাকার ডাকাতিয়া নদীতে থাইল্যান্ডের প্রযুক্তি অনুসরণ করে খাঁচায় মাছ চাষ করা হচ্ছে। ২০০২ সাল থেকে মাত্র ছয় বছরের মধ্যে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদী এবং লক্ষ্মীপুর জেলার মেঘনা নদীর রহমতখালি চ্যানেলে প্রায় এক হাজার মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ করা হচ্ছে। এ থেকে বছরে ৭০০ মেট্রিক টন রফতানিযোগ্য তেলাপিয়া উৎপাদিত হচ্ছে। চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করে বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে, আর তাই এখানকার ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন মডেলকে খাঁচায় মাছ চাষের ‘ডাকাতিয়া মডেল’ বলা হয়।

এ এলাকাগুলোতে মাছ চাষের মাধ্যমে আমিষের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। এ ধরনের মাছ চাষকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় অনেকগুলো মাছের খাদ্যের দোকান গড়ে উঠেছে, সিলেট অঞ্চলে সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক এনজিও ‘হেলডেটাম সুইস ইন্টারকোঅপারেশন’ দারিদ্র্যমুক্তির লক্ষ্যে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দুই বছরের মধ্যে এনজিওটির সাফল্য দেখে অন্য এনজিওগুলো খাঁচায় মাছ চাষে এগিয়ে আসে।

২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নে সুরমা নদীতে ১৮টি খাঁচা তৈরি করে তাতে মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ শুরু হয়। এরপর দিরাই ও শাল্লা উপজেলায় ৭০টি খাঁচা স্থাপন করা হয়। দশটি দলে ভাগ করে ১৪৮টি পরিবারের লোকজনকে খাঁচায় মাছ চাষের সুযোগ করে দেয়া হয়। এ সব পরিবারের লোকজন দারিদ্র্যমুক্ত হয়।

মাছ সংরক্ষণ
আমরা জাানি, ফরমালিন এক ধরনের সংরক্ষক, Preservative যৌগ। এটা কাঠ, আসবাবপত্র কারখানায় সংক্রামক জীবাণুনাশক যৌগ, Disinfectant হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর বিষাক্ততা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল Volatile বৈশিষ্ট্যের কারণে এটা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও বাস্তবতা হচ্ছে দেশের এক শ্রেণীর অসাধু মাছ ব্যবসায়ী মাছ টাটকা, শক্ত রাখা এবং দীর্ঘ সময় পচন থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে এ বিষাক্ত যৌগটি ব্যবহার করে থাকে। ফরমালিন দেয়া মাছ মানুষের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ফরমালিনের জন্য মানুষের চর্মরোগ, ডায়রিয়া, শ্বাসপ্রশ্বস সংক্রান্ত জটিল সমস্যা, অন্ধত্ব, কিডনি সমস্যার এবং ক্যান্সারের মতো জটিল অসুখ হতে পারে। স্বাস্থ্যঝুঁকি ছাড়াও ফরমালিনের অপব্যবহারের কারণে দেশে মাছ উৎপাদনের উপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আরো বলা দরকার- ফরমালডিহাইড বা মিথানল গ্যাসের ৪০ শতাংশ জলীয় দ্রবণকে ফরমালিন বলা হয়। এ মিথানলকে পানিতে দিয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জলীয় দ্রবণ বা ফরমালিন তৈরি করা হয়। এ হচ্ছে এক ধরনের কার্বনাইল যৌগ তবে কার্যকর জীবাণুনাশক। ফরমালডিহাইড সাধারণ তাপমাত্রায় এক ধরনের বর্ণহীন গ্যাস, তবে এটা তীব্র গন্ধযুক্ত এবং দাহ্য পদার্থ।

যারা ফরমালডিহাইডের সংস্পর্শে থেকে দীর্ঘকাল কাজ করে তাদের রক্তের লিম্ফোসাইট পরিবর্তন এবং নাসিকা টিস্যুতে মিউটেটিভ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাদের নাকে প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট, চর্ম প্রদাহ এবং অ্যাজমার উপসর্গও দেখা দিতে পারে। কিন্তু অল্প সময় সংস্পর্শে থাকার কারণে সমস্যা নাও হতে পারে। ফরমালিন ফুসফুস ক্যান্সারের কারণও হতে পারে। মহিলাদের ক্ষেত্রে ভ্রুণের অস্বাভাবিকতা, গর্ভপাত, সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস এবং প্রসবজনিত অন্যান্য জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এ অবস্থায় সংরক্ষক হিসেবে ফরমালিনের অপব্যবহার বন্ধ করবার লক্ষ্যে মাছ ব্যবসায়ী মৎস্যজীবী, মৎস্য ভোক্তা, মাছ ক্রেতা বিক্রেতা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সবার মধ্যে এই যৌগটির বিষাক্ত ও ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গণসচেতনতা অভিযান চালাতে হবে। এ প্রসঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য সংরক্ষণে ফরমালিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও গণসচেতনতা সৃষ্টি প্রকল্পের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। প্রকল্পটির কাজ এখনো অব্যাহত রয়েছে।

প্রাকৃতিকভাবে মাছ পচনশীল। তবে আহরণের পর সঠিক সংরক্ষণ এবং পরিচর্যার মাধ্যমে হ্রাস করা যায়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। মাছ পচন রোধে গবেষণার মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাছাড়া, মাছ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত পরিবহনের ব্যবস্থা নিতে হবে। সে ব্যবস্থা নিতে পারলে মাছের পচনহ্রাস পাবে।

ফরমালিন শনাক্তকরদের আধুনিক কিটবক্স উপযুক্ত দূরত্বের এলাকাগুলোতে সরবরাহ করা আবশ্যক, অত্যাধুনিক কিটবক্সের সাহায্যে সহজেই ফরমালিন শনাক্ত করা যায়। এ কিটবক্স বেশ ব্যবহারবান্ধব এবং সহজেই বহনযোগ্য। এর ওজন মাত্র ১৭০ গ্রাম।

এবার ফরমালিন অপব্যবহার প্রতিরোধেই কিছু সমস্যার কথা আলোচনা করা দরকার। দেশে ফরমালিন সম্পর্কিত গবেষণা তথ্যের স্বল্পতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাছাড়া সঠিকভাবে যাচাই না করে কোনো কোনো বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হয় এবং পরবর্তীকালে যথাযথ মনিটরিং করা হয় না। এছাড়া, জনগণের মধ্যে ফরমালিন অপব্যবহারের পরিণাম সম্পর্কে জ্ঞানের স্বল্পতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, আরো প্রতিবন্ধকতা আছে, গবেষণার মাধ্যমে সেগুলো নিরূপণ করা আবশ্যক।

এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে সত্যিকার অর্থে ফরমালিনমুক্ত বাজার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব নয়। তবে সে লক্ষ্যে সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। এসব ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে-

১. ফরমালিন পরীক্ষার জন্য তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত উপযুক্ত স্থানগুলোতে কিটবাক্স সরবরাহ।
২. ফরমালিন ব্যবহারকারী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ।
৩. ফরমালিনবিরোধী অভিযানে নিয়োজিতদের মধ্যে উপযুক্ত সমন্বয়।
৪. ব্যাপক প্রচারের জন্য লিফলেট, পোস্টার, ফেস্টুন, বুকলেট এগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার।
৫. মুদ্রণ ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাহায্যে সঠিকভাবে ব্যাপক প্রচারণা।
৬. ফরমালিন ব্যবহার সম্পর্কিত আইন আধুনিকায়নের মাধ্যমে অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।

খাদ্যসামগ্রীতে ফরমালিনের অপব্যবহার রোধ এবং মাছসহ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চলমান সরকারি বেসরকারি কার্যক্রম আরো বেগবান করা হলে আশাতীত সাফল্য অর্জন করা যাবে এ আশা অবশ্যই করা যায়।

অ্যাডভোকেট কাজী শফিকুর রহমান*
*বাসা ২৩, রোড ৩০, ব্লক ডি, মিরপুর-১০, ঢাকা-১২১৬, ফোন : ৯০৩২৮৪৮, ০১৫৫২৪৫৭৬৬৩, ০১৮২৩৬৩৬৫৯২

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Development by: webnewsdesign.com