গাছের চারা রোপনে স্থান নির্বাচন

বুধবার, ১২ জুন ২০১৯ | ১০:১২ পূর্বাহ্ণ | 169 বার

গাছের চারা রোপনে স্থান নির্বাচন

বাংলাদেশ অবস্থান ভৌগোলিক ভাবে মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলে। জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসগুলোতে এদেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এ সময়টায় এদেশে বর্ষাকাল। এসময় মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকে বিধায় চারা লাগানে সহজে জিইয়ে উঠে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রমশ উষ্ণতার দিকে যাচ্ছে।সামনে নিশ্চিত পরিবেশ বিপর্যয়। আর এ পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে পর্যাপ্ত গাছ থাকা চাই।
পরিবেশ রক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই সময়টায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করতে হবে।

আর গাছ যেখানে সেখানে লাগিয়ে দিলেই হবে না তাহলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হতে পারে। তাই জাত ও প্রজাতি ভেদে সঠিক স্থানে সঠিক চারা রোপন করতে হবে।

আর এজন্যে প্রথমেই পতিত জায়গা বা কোন কোন জায়গায় চারা লাগানো যায় তার পরিকল্পনা আগে করতে হবে। তারপর জায়গা সিলেক্ট হওয়ার পর জায়গার ধরন ও অবস্থানের উপর জেলা ও উপজেলা বৃক্ষমেলা কিংবা নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করতে হবে। সুস্থ, সবল, মধ্যমাকৃতির, পরবর্তী বংশধরদের কথা চিন্তা করে ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা লাগানোর প্রতি বেশি নজর দেয়া উচিত। এতে ফল, ঔষধ এবং কাঠ সবই পাওয়া যায়।

বন্যামুক্ত, আলোবাতাস চলাচল করতে পারে এবং সূর্যালোক পড়ে এমন জায়গায় চারা রোপণ করা উচিত। দো-আঁশ, বেলে দো-আঁশ, এঁটেল দো-আঁশ, উর্বর, নিষ্কাশনযোগ্য ও উঁচু স্থানে চারা রোপণ করা উত্তম।
কোথায় কোন চারা রোপণ করা উচিত আসুন তা নিচের আলোচনায় জেনে নিই। 

প্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গঃ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেমন- মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামনে ও আশেপাশে শোভাবর্ধনকারী এবং ছায়া দানকারী গাছ যেমন, দেবদারু, নারিকেল, সুপারি, তাল, খেজুর, নিম, পাম, ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, আম, কাঁঠাল, লিচু গাছ রোপণ করতে পারেন। 

বসতবাড়ির দক্ষিণ পার্শ্বেঃ রোদ ও আলোর জন্য ছোট এবং কম ঝোপালো গাছ লাগাতে হবে। সুপারি, নারিকেল, নিম, দেবদারু, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, জাম্বুরা, ডালিম, মেহেদী, গাছ লাগানো যেতে পারে। 

বসতবাড়ির পূর্ব-পশ্চিমেঃ মাঝারি উঁচু এবং মাঝারি ঝোপালো গাছ লাগাতে হবে। এতে সকাল-সন্ধ্যায় বাড়ির আঙ্গিনায় আলো থাকবে। বাউকুল, আপেলকুল, সফেদা, আম্রপালি, লিচু, খেজুর, ডালিম, কলা, আতা, বেল, পেয়ারাসহ বিভিন্ন গাছ।

বসতবাড়ির উত্তরেঃ বসতবাড়ির উত্তরপাশে বড় ও উঁচু গাছপালা থাকলে ঝড়-তুফান প্রতিরোধ হয়। এখানে আম, কাঁঠাল, জাম, কামরাঙ্গা, মেহগনি, শিশু, সেগুন, হরিতকি, আকাশমণি, বাঁশ, ইত্যাদি গাছ রোপণ করা যায়। 

পতিত জমিতেঃ সব ধরনের গাছ যেমন- আম, কাঁঠাল, জাম, কামরাঙ্গা, মেহগনি, শিশু, সেগুন, হরিতকি, আকাশমণি, দেবদারু, নারিকেল, সুপারি, খেজুর, নিম, পাম, ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, বাঁশ ইত্যাদি। 

হাট-বাজারেঃ ছায়দানকারী গাছ রোপণ করা উচিত। আম, কাঁঠাল, জাম, সেগুন, দেবদারু, সুপারি, খেজুর, নিম, পাম, কৃষ্ণচূড়া, বটগাছ রোপণ করা উচিত। 

রাস্তার পাশেঃ উঁচু, ও ডালপালা ছাঁটাই করা যায় এমন গাছ রোপণ করা দরকার। মেহগনি, শিশু, সেগুন, হরিতকি, আকাশমণি, দেবদারু, নারিকেল, সুপারি, খেজুর, নিম, পাম, ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, বাবলা, ইপিল ইপিল, শিমুল ইত্যাদি গাছ রোপণ করা যায়। গাঁয়ের পথের দু´ধারে বা ফিডার রোডের পাশে শিশু, নিম, দেবদারু, চম্পা, ইপিল ইপিল, পাইন্যাগোলা বা লুকলুকি, মান্দার, পালিত মাদার, পানিয়া মাদার, বাবলা, খয়ের, বকফুল, তাল, খেজুর ইত্যাদি লাগানো যেতে পারে। বড় রাস্তা বা মহাসড়কের পাশে কৃষচূড়া, কনকচূড়া, রেইনট্রি, গগন শিরীষ, রাজকড়ই, শিলকড়ই, শিশু, মেহগনি, অর্জুন, দেবদারু, সোনালু, নিম, নাগেশ্বর, আকাশমণি, বকুল, পলাশ, তেলসুর, ঝাউ, বটল পাম প্রভৃতি গাছ লাগানো যায়। 

রেল লাইনের পাশেঃ মেহগনি, শিশু, সেগুন, আকাশমণি, দেবদারু, নারিকেল, সুপারি, খেজুর, নিম, পাম, শিমুল ইত্যাদি গাছ রোপণ করা যায়। 

বাঁধের ধারেঃ শেকড় শক্ত এবং বিস্তৃত এমন গাছ যেমন বট, আমড়া, বাঁশ, মেহগনি, শিশু, সেগুন, আকাশমণি, দেবদারু, নারিকেল, সুপারি, খেজুর ইত্যাদি গাছ রোপণ করা দরকার। 

জমির আইলেঃ যেসব গাছের শেকড় কম বিস্তৃত কম ছায়াদানকারী, ডালপালা ছাঁটাই করা যায় যেমন- মেহগনি, দেবদারু ইত্যাদি গাছ রোপণ করতে হবে। আজকাল জমির ভেতরেও গাছ লাগানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই ইউক্যালিপটাসকে বেছে নিয়েছেন। ফসলের ক্ষেতে দূরে দূরে অল্প কিছু এরূপ গাছ লাগানো যেতে পারে। বরেন্দ্র এলাকায় এখন ধানের জমিতে মাটির ঢিবি তৈরি করে সেখানে ব্যাপক হারে আমগাছ লাগানো হচ্ছে। এমনকি জমির আইলেও অনেক গাছ লাগানো হয়। অনেক জায়গায় আইলে তালগাছ লাগিয়ে বাড়তি লাভ পাওয়া গেছে। তাল ছাড়া খেজুর, সুপারি, বাবলা, বকাইন, জিগা, কড়ই, ইউক্যালিপটাস, পালিত মাদার ইত্যাদি গাছ লাগানো যেতে পারে।

নিচু জমিতেঃ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে এমন গাছ রোপণ করা দরকার। পিটালি, বেত, মূর্তা, বাঁশ, মান্দার, জারুল, হিজল, কদম ইত্যাদি গাছ নিচু জমিতে রোপণ করা যেতে পারে। 

পুকুর পাড়েঃ মাটি ভাঙ্গে না এবং শোভাবর্ধন করে যেমন সুপারি, নারিকেল, নিম, দেবদারু, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, ডালিম ইত্যাদি গাছ লাগানো যায়। 

নদীর ধারেঃ পানি সহিষ্ণু, শক্ত মজবুত ও বড় হয় এমন গাছ রোপণ করা উচিত। যেমন- শিমুল, ছাতিম, পিটালি, বেত, বাঁশ, মূর্তা, মান্দার, জারুল, হিজল, কদম ইত্যাদি। 

বিলে লাগানোর গাছঃ বিল এলাকা যেখানে বছরে দু-তিন মাস পানি জমে থাকে সেখানে হিজল, করচ, বিয়াস, পিটালী, জারুল, মান্দার, বরুণ, পলাশ, কদম, চালতা, পুতিজাম, ঢেপাজাম, রয়না বা পিতরাজ, অর্জুন ইত্যাদি গাছ লাগানো যায়। 

চরে লাগানোর গাছঃ উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন জেগে ওঠা চরে কেওড়া, বাইন, কাঁকড়া, গরান, গোলপাতা গাছ লাগানো যায়। তবে উপকূলে যেসব চর একটু উঁচু ও স্বাভাবিক জোয়ারের পানি ওঠা না সেসব চরে বাবলা, ঝাউ, সনবলই, সাদা কড়ই, কালো কড়ই, জারুল, রেইনট্রি ইত্যাদি লাগানো যায়। উপকূল ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলে নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে ঝাউ, লোনাঝাউ, পিটালী, করচ, পানিবিয়াস লাগানো যেতে পারে। 

উপকূলীয় অঞ্চলেঃ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, হালকা পাতাবিশিষ্ট গাছ যেমন- সুন্দরী, ছৈলা, গরান, গেওয়া, গোলপাতা, মান্দার, কড়াই, বাবলা, নারিকেল ইত্যাদি গাছ রোপণ করা উচিত। 

উঁচু পাহাড়ঃ বর্তমানে দেশের অনেক পাহাড়ি জমিতে কমলালেবুসহ বিভিন্ন প্রজাতির লেবু, লিচু, আম, পেয়ারা, গোল মরিচ, আদা, আনারসের সফল বিস্তার ঘটেছে। এছাড়াও তেলসুর, চাপালিশ, চিকরাশি, শিলকড়াই, গর্জন, গামার, সেগুন, ইপিল-ইপিল, বাঁশ, কাজুবাদাম প্রভৃতি কাঠের চাহিদা মেটাতে সহায়ক।

“পরিবারের সদস্য প্রতি অন্তত ৩টি করে গাছ লাগান,
দেশ কে ফুল-ফল, কাঠ আর সবুজে ভরে দিন।।”

লেখাঃ রাসেল মাহবুব
উপসহকারী কৃষি অফিসার

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

কৃষি মন্ত্রনালয়ে ১১-২০তম গ্রেডে বিভিন্ন পদে নিয়োগ
শম্ভুগঞ্জ এর মোমেনশাহী এটিআই এ প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পূনর্মিলনী অনুষ্ঠিত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ১০৮১ জন নিয়োগ
উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদে বাছাই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ