ধান কাটা শেষ

গোলা ভরে ধান তুলে স্বস্তিতে হাওরের কৃষক

মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২০ | ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ | 97 বার

গোলা ভরে ধান তুলে স্বস্তিতে হাওরের কৃষক

তীব্র রোদ মাথায় খলায় ধান শুকাচ্ছিলেন খরচার হাওরের গৌরারং গ্রামের কৃষক রণজিত দাসের স্ত্রী। সঙ্গে তার মেয়ে, ছেলে ও জা। শুকাতে দেওয়া ধানে পা ডুবিয়ে তৃপ্তিতে ধান নাড়ছিলেন। এই সপ্তাহেই তাদের ৬ একর জমির সব ধান কাটা হয়ে গেছে। 

একই হাওরে ৮ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন কান্দাগাও গ্রামের কৃষক আমিন উল্লাহ। মাথায় গামছা বেঁধে মোবাইলে কারি আমির উদ্দিনের বাউল গান বাজিয়ে মনের আনন্দে তিনিও জমির শেষ ধান কাটছিলেন। সঙ্গে স্থানীয় শ্রমিক ও পরিবারের লোকজন। কেমন ধান কাটলেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, করোনা-উরুনা আমরা মানছি না। বাক্কাদিন বাদে মেগবাদলি ছাড়া বালা দিন পাইয়া ধান খাটছি। ইলা বছর বারবার আয়না। মেগ, তুফান, টাটা, ঝিলকি, পাইরা ঢল কুন্তা নাই। উগার বইরা ধান তইছি ইবার। (করোনা আমরা মানিনি। বহুদিন পরে বৃষ্টি বাদল ছাড়া ভালো দিন পেয়ে ধান খাটছি। এমন বছর বারবার আসেনা। মেঘ, তুফান, বজ্রপাত পাহাড়ি ঢল কিছুই নাই। ভাড়ার ভরে ধান রেখেছি এবার)।

শুধু তিনিই সদয় প্রকৃতির কল্যাণে পুরো জমির ধান একা কাটেননি, হাওরের প্রায় আড়াই লাখ চাষির ৯৮ ভাগ কৃষকই গত ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ধান কাটতে সক্ষম হয়েছেন। খেয়ালি প্রকৃতি উদার হাতে বৈশ্বিক মহামারির সময়ে তাদেরকে কষ্টের ফসল তুলতে সহায়তা করেছে।

দেখার হাওর ও খরচার ঘুরে একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে তাদের মধ্যে স্বস্তি ও তৃপ্তি লক্ষ করা গেছে। সবাই দীর্ঘদিন পর ‘উগার’ (গোলা) ভরে ধান তুলতে পেরে আনন্দিত। করোনা বিপর্যয়ে দিশেহারা কৃষক যখন বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন তখন প্রকৃতি উদারভাবে কৃষকের অনুকূলে কাজ করে ভাগ্যের থলি পুরোপুলি ভরে দিয়েছে। বাম্পার ফলনে কৃষক খুশি থাকলেও ধানের ন্যায্য দাম নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ লক্ষ করা গেছে। তবে হাওরের পুরো ধান কাটতে পেরেছেন এটাই তাদের কাছে বড় স্বস্তি ও আনন্দের। করোনাভয় তাড়িয়ে বছরের খোরাকি সংগ্রহ করতে পেরে উৎফুল্ল সবাই।

সুনামগঞ্জ জেলায় এ বছর ২ লাখ ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। গত ১০ মে পর্যন্ত হাওরের বোরো ধান প্রায় ৯৮ ভাগ কাটা হয়ে গেছে। জেলায় গত শনিবার পর্যন্ত আবাদকৃত জমির ১ লাখ ৯১ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমির বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে। গত বছর জেলায় ৯৮ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছিল।

হাওর ঘুরে দেখা গেছে, প্রকৃতি অনুকুলে থাকায় কাটা ধান মাড়াই ও শুকিয়ে গোলায়ও তুলে নিয়েছেন কৃষক। একই সঙ্গে হালের গবাদিপশুর খাবার খড়ও সংগ্রহ করছেন। 

জানা গেছে, ২০১৭ সনে হাওরের সম্পূর্ণ ফসলডুবির ঘটনায় সরকার নতুন করে হাওরের ফসল রক্ষায় বিশেষ নজর দেয়। ফসল রক্ষা বাধে ঠিকাদারি প্রথা বিলোপ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে বাঁধের কাজ শুরু করে। এ বছর জেলায় হাওরের ফসল রক্ষায় সরকার ১৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। তবে প্রকৃতি সদয় থাকায় এই বরাদ্দ ফসল রক্ষায় কোনো কাজে আসেনি। সুনামগঞ্জ জেলার বোরো ধান থেকে এ বছর ১৩ লাখ মেট্রিকটন চাল উৎপাদন হওয়ার কথা। যা স্থানীয় চাহিদা ৫ লাখ মেট্রিকটন মিটিয়ে বেশির ভাগই উদ্বৃত্ত থাকবে। 

সরেজমিন দেখার হাওর ও খরচার হাওর ঘুরে দেখা গেছে, হাওরের ধানকাটা প্রায় শেষ। খলায় ধান শুকানোর পাশাপাশি গোখাদ্য হিসেবে খড় সংগ্রহ করছেন কৃষক। স্বস্তিতে ধান কাটতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন তারা অনেকেই। কৃষকরা জানান, নিকট অতীতে বোরো মৌসুমে এমন সদয় প্রকৃতি দেখেননি। বজ্রপাত, শীলাবৃষ্টি, ঝড় ও অতিবৃষ্টির কারণে বন্যায় ফসলহানির নিয়মিত চিত্র দেখেছেন। এই মৌসুমে ভিন্ন এক প্রকৃতি দেখেছেন তারা। বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং ব্লাস্ট রোগ ছিল না। ফলন হয়েছে বাম্পার।

কৃষকরা জানান, প্রথম সপ্তাহে ২-৩ দিন মাঝারি বৃষ্টি এবং একদিনের বজ্রপাতে কৃষক উদ্বিগ্ন ছিলেন। এরপর থেকেই প্রকৃতি কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয়। কৃষকরা জানান, করোনার কারণে শ্রমিক সংকট নিয়েও হতাশ ছিলেন প্রথমে। কিন্তু বিশেষ ব্যবস্থায় প্রশাসন বাইরের জেলা থেকে প্রায় ১১ হাজার শ্রমিকসহ সরকারিভাবে ধান কাটতে ৪ শ মেশিনের ব্যবস্থা করেছিল। প্রতিটি হাওরেই স্বেচ্ছাসেবীরাও এ বছর ধান কাটায় সময় কৃষককে সহযোগিতা করেছেন। স্থানীয় শ্রমিকদেরও ত্রাণের আওতায় এনে ধান কাটায় উৎসাহিত করা হয়। যার ফলে দ্রুত গতিতে সর্বত্র ধান কাটা চলে। 

দেখার হাওরের হালুয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক সবিবুর রহমান বলেন, আমি প্রায় দেড় একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলাম। এক সপ্তাহ আগেই আমার ধান কাটা শেষ হয়েছে। এখন ধান ও খড় শুকাচ্ছি। এ বছর ফলনও ভালো হয়েছে। কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে ধানের দাম এখনো কম। ধানের দাম বৃদ্ধি পেলে এবং সব কৃষক সরকারকে ধান দিতে পারলে লাভবান হতে পারত।

খরচার হাওরের গৌরারং গ্রামের কৃষক রণজিত দাস বলেন, আমি ৩ হাল জমিতে বোরো চাষ করেছিলাম। প্রথমে শ্রমিক ও করোনাভাইরাসের কারণে ধান কাটা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম। পরে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা কেটে যায়। গত ১৮ এপ্রিলের পর এখন পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো। মাঝে-মধ্যে রাতে ও সকালে একটু বৃষ্টি হলেও তা প্রভাব ফেলেনি। তিনি বলেন, প্রতি বছরই শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল বা ব্লাস্ট রোগে ফসলের কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়। বৃষ্টির কারণে ধান ও খড়ও শুকানো যায় না। এবার সম্পূর্ণ ফসল গোলায় তুলতে পেরেছি। 

হালুয়ারগাও গ্রামের কিষাণী মাজেদা বেগম বলেন, ৯ কিয়ার জমিনো ধান লাগাইছিলাম। সব ধান কাটিলিছি। এখন মাড়াই করা ধান ফতো হুকায়রাম। খড়ও খলাত হুকাইতাছি। ইবার আমরার কোন সমস্যা অইছেনা। শান্তি মতো বৈশাখিটা তুলতাম পারছি। 

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্দ সফর উদ্দিন বলেন, আমাদের জেলার হাওরের কোনো কৃষকের ধানকাটা আর বাকি নেই। হাওরে আবাদকৃত ১ লাখ ৬১ হাজার ১০৫ হেক্টরের মধ্যে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪৯৭ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ। শ্রমিক সংকট না থাকায় করোনার মধ্যেও দ্রুত গতিতে ধান কেটেছেন তারা। বাম্পার ফলন পেয়ে খুশি। নির্বিঘ্নে বহুদিন পরে তারা হাওরের প্রায় পুরো ফসল তুলতে পেরেছেন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, প্রথমে করোনায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছিল। আমরা বাইরের জেলা থেকে ১১ হাজারের মতো শ্রমিক এনেছিলাম। স্থানীয় শ্রমিকদের ত্রাণ দিয়ে এবং স্বেচ্ছাসেবীদের উৎসাহ দিয়ে ক্ষেতে নামিয়েছিলাম। তা ছাড়া প্রায় ৪ শ মেশিনও ছিল। সুন্দর আবহাওয়ার কারণে শ্রমিক সংকট না থাকায় হাওরের ধান কাটা শেষ হয়েছে। হাওরের কৃষক এবার ভীষণ খুশি।

সূত্রঃ কালের কন্ঠ।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com