জিরা চাষ : প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ

শুক্রবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭ | ৮:০৯ অপরাহ্ণ | 655 বার

জিরা চাষ : প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ
জিরা

মোঃ গোলাম রায়হান (হাদী)

জিরা একটি মূল্যবান মশলা। এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় মশলা এবং রান্না করা খাবার সুস্বাদু করতে জিরার জুড়ি নেই।

পরিচিতিঃ
বাংলা নামঃ জিরা
ইংরেজী নামঃ Cumin
বৈজ্ঞানিক নামঃ Cuminum cyminum
পরিবারঃ Apiaceae

জিরার পুষ্টিগুণ(প্রতি ১০০ গ্রামে):

ক্যালোরি- ৩৭৫
আমিষ- ১৮ গ্রাম,
শর্করা- ৪৪ গ্রাম,
চর্বি- ২২ গ্রাম।

বাংলাদেশে জিরার চাহিদা মেটাতে পুরোটাই নির্ভর করতে হয় আমদানির ওপর। আর সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রয়েছে ইরান। এ ছাড়া ভারত, মরক্কো, চীন, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি দেশে ব্যাপকভাবে জিরার চাষ হয়। এই ফসলের উৎপত্তিস্থল হিসেবে ধরা হয় মিসর, সিরিয়া, তুর্কিস্তান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে।

তবে জিরা চাষে এবার বাংলাদেশেও বিপুল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে শীতকালীন এই ফসল ঘরে তুলতে পারবে কৃষকরা। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা স্বল্প পরিসরে সফল ভাবে জিরা উৎপাদন করতে পেরেছেন এবং উনারা আশাবাদী অচিরেই এটি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারবেন। পাশাপাশি দেশের নানা জায়গায় অনেক কৃষক নিজ উদ্যোগে জিরা চাষে সাফল্য পেয়েছেন।

জিরাগাছ সাধারণত ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। প্রধান কাণ্ডের ওপর আরো তিন থেকে পাঁচটা প্রধান প্রাথমিক শাখা বের হয়, যেখান থেকে আবার দুই থেকে তিনটা মাধ্যমিক শাখা উৎপন্ন হয়। জিরা উষ্ণমণ্ডলীয় ফসল কিন্তু মধ্যম মানের আবহাওয়া বেশি পছন্দ করে। শীতকালীন ফসল হিসেবে এর আবাদ হয়। সাধারণত নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরে জিরার বীজ বপন করা হয়। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করে, তখন ফুল ফোটা ও বীজ গঠন সম্পন্ন হয়। ৮০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে জিরা পরিপক্ব হয়।

চাষাবাদঃ

জাতঃ
প্রধানত চার ধরনের জিরা দেখা যায়। লম্বা, বেঁটে, গোলাপী ফুল এবং
সাদা ফুল। গোলাপী ফুল জিরার ফলন অনেক বেশী।

মাটি ও জলবায়ুঃ
ফল ধরার সময়ে শুকনো এবং ঠাণ্ডা আবহাওয়া এবং ফল পুষ্ট হওয়ার সময়ে
নাতিশীতোষ্ণ এবং শুষ্ক আবহাওয়া জিরা চাষের জন্যে আদর্শ। মেঘলা আবহাওয়া ও অধিক বৃষ্টিপাত এবং অতিরিক্ত ঠান্ডায় জিরার ফলন ভাল হয় না। সুনিষ্কাশিত উর্বর, গভীর এবং বেলে দোঁআশ মাটি জিরা চাষের জন্যে উত্তম। জিরা চাষের জন্য ভালোভাবে জমি চাষ করতে হয় যাতে মাটি ঝুরঝুরে হয়। এরপর জমিতে ছত্রাকনাশক দিতে হয়।

বীজের হার ও বপনঃ
ছিটিয়ে বীজ বপন করলে প্রতি হেক্টরে ১২-১৫ কেজি বীজ
লাগে এবং সারিতে মাদা করে লাগালে প্রতি হেক্টরে ৮-১০ কেজি বীজ লাগে। সারিতে বপন করলে দুরত্ব হবে ২৫ সেঃমিঃx ১৫ সেঃমিঃ। জিরা
বোনার আগে ২/৩ দিন ভিজিয়ে রাখতে হবে এবং বোনার আগে প্রতি কেজি বীজের সাথে ২ গ্রাম হারে ভিটাভেক্স মিশিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। অক্টোবর, নভেম্বর মাস বীজ বোনার উত্তম সময়।

পরিচর্যাঃ
বীজ বোনার ২৫-৩০ দিন পর আগাছা এবং অতিরিক্ত চারা তুলে ফেলতে হবে এবং চারার গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে হবে। জমিতে যথেষ্ট পরিমাণ জো না থাকলে বীজ বোনার পরে হালকা সেচ দিতে হবে।
পরবর্তীকালে আরো ২/৩ বার সেচ দিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হতে ফুল আসার সময়ে এবং জিরা পুষ্ট হওয়ার সময়ে যেন মাটি শুকনা না থাকে।

রোগ ও পোকা মাকড় দমনঃ
ফুল ফোটার সময় জিরা ফসলে রোগের আক্রমণ শুরু হয়। এ সময় বৃষ্টি হলে বৃষ্টি দ্বারা এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। গাছের নতুন পাতার শীষে এ রোগের আক্রমণ হয়। এ রোগের আক্রমণে পাতা কালো হয়ে মরে যায়। তবে প্রোভেক্স-২০০ নামক ছত্রাকনাশক ৩ গ্রাম প্রতি কেজি বীজে মিশিয়ে বীজ শোধন করলে এই রোগের আক্রমণ কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। জ্যাসিড বা জাবপোকা এবং শুঁয়াপোকা এই ফসলে আক্রমণ করে। জাবপোকা পূর্ণ বয়স্ক পাতা, কচি কাণ্ড, ফুল, ফুলের কুঁড়ি, বোঁটা ও ফুলের কচি অংশের রস চুষে খায়। গাছ দূর্বল ও হলুদ হয়। ফুলের কলি ও ফল ঝরে পড়ে। এ জন্য ফেনিট্রোথিয়ন-৫০ তরল (সুমিথিয়ন) লিবাসিড-৫০ তরল বা ম্যালাথিয়ন-৫৭ তরল এর যেকোনো একটি ২০০ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

ফসল উত্তোলনঃ
সাধারণত জিরা শস্য ৮০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়। যখন গাছ হলুদ বর্ণ ধারণ করে, পাতা নেতিয়ে যায় ও বীজ
হালকা ধূসর বাদামি বর্ণ ধারণ করে তখন এই শস্য তুলতে হয়। প্রতিটি গাছ হাত
দিয়ে উঠিয়ে বা কাস্তে দিয়ে মাটির কাছাকাছি অংশে কাটতে হয়। ফসল পাকা মেঝেতে প্রথমে স্তূপ করে রাখতে হয়। বীজ শুকানোর পর তা
গাছ থেকে আলাদা করার জন্য লাঠি দিয়ে আঘাত করতে হয়। এরপর চালুনি
দিয়ে চেলে বীজ পরিষ্কার করে সামান্য শুকিয়ে নিলেই তা রান্নায় ব্যবহার উপযোগী হয়।

ফলনঃ
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জিরা চাষ করলে হেক্টর প্রতি ৮০০-১০০০ কেজি ফলন পাওয়া সম্ভব।

বাজার দরঃ
জিরা বীজ প্রতি ১০০ গ্রাম প্রায় ১০০০ টাকায় বাজারে বিক্রি হয়!
আর জিরা মশলার জন্য প্রতি কেজি প্রায় ৩২০ – ৪৩০ টাকায় বিক্রি হয়!

[তথ্যসূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, উদ্যোক্তা, বিএআইএসসি, ইন্টারনেট ইত্যাদি]

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Development by: webnewsdesign.com