জীবনঘাতী “ব্রেইন স্ট্রোক” চিকিৎসা ও প্রতিরোধে করণীয়

বুধবার, ১১ জুলাই ২০১৮ | ৭:০০ অপরাহ্ণ | 2646 বার

জীবনঘাতী “ব্রেইন স্ট্রোক” চিকিৎসা ও প্রতিরোধে করণীয়

♦ভূমিকাঃ
স্ট্রোক বা ব্রেইন স্ট্রোক নিয়ে মানুষের সু-ধারণা বা কু-ধারণার কমতি নেই। স্ট্রোক না হওয়ার জন্য মাথায় না গায়ে আগে পানি দিবেন ইত্যাদির ধারণাও অনেকে দেয়ার চেষ্টা করে থাকেন। আবার চিকিৎসায় অমানবিকতার বহিঃপ্রকাশও আছে। স্ট্রোক আক্রান্ত রোগীকে মাটিতে পুঁতে ও চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। জ্ঞান বিজ্ঞানে আজ মানুষ অনেক উন্নত। তাই প্রতিটা কথার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি জরুরী। এই বৈজ্ঞানিক ধারণার উপরই কোন রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে। এই লেখায় স্ট্রোক বা ব্রেইন স্ট্রোকের বৈজ্ঞানিক ভিত্তির কিছুটা ধারণা দেয়া হয়েছে।

♦স্ট্রোক বা ব্রেইন স্ট্রোক কি একই??
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ব্রেইন স্ট্রোক নামে কোন রোগের অস্তিত্ব নেই। সাধারণ মানুষ যাকে ব্রেইন স্ট্রোক বলে চিকিৎসা বিজ্ঞান তাকে শুধুই স্ট্রোক বলে থাকে।
তবুও সাধারন মানুষের বুঝার সুবিধার্থে এই লেখায় ব্রেইন স্ট্রোক শব্দ ও ব্যবহার করা হয়েছে।

♦স্ট্রোক বা ব্রেইন স্ট্রোক কাকে বলে??
ব্রেইনের রক্ত নালী বন্ধ বা ব্রেইনের মধ্যে রক্ত ক্ষরণের ফলে হঠাৎ ব্রেইনের কার্যক্ষমতা হারানোকে স্ট্রোক বা ব্রেইন স্ট্রোক বলে।

♦ উপসর্গের স্থায়িত্বের উপর নির্ভর করে স্ট্রোক বা ব্রেইন স্ট্রোককে নিন্মের বিভিন্ন ভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়ঃ
১. ট্রানজিয়েন্ট ইশ্চেমিক অ্যাটাকঃ
যে স্ট্রোকের উপসর্গ ২৪ ঘন্টার মধ্যে ভাল হয়ে যায়।
২.মাইনর স্ট্রোক বা মাইল্ড স্ট্রোকঃ
যে স্ট্রোক ২৪ ঘন্টার বেশী থাকে, কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা কম হয়, তাকে মাইনর বা মাইল্ড স্ট্রোক বলে।
৩. স্ট্রোকঃ
যে স্ট্রোকে শারীরিক অক্ষমতা ২৪ ঘন্টার বেশী থাকে।
৪. প্রগ্রেসিভ স্ট্রোক বা স্ট্রোক ইন ইভানুয়েশানঃ
যে স্ট্রোকে প্রথম উপসর্গ দেখা দেয়ার পর, তা বাড়তেই থাকে।
৫. কমপ্লিটেড স্ট্রোকঃ
যে স্ট্রোকে প্রাথমিক উপসর্গ পরবর্তীতে একই রকম থাকে, আর বাড়ে না।

♦ কি কি কারনে স্ট্রোক হয়ঃ
১. ব্রেইনের ধমনী বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ইনফার্কটিভ স্ট্রোক। এই স্ট্রোক সবচেয়ে বেশী। যা ৮৫% ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
২. ব্রেইনের শিরা বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ভেনাস থ্রম্বসিস। যা খুব কম, ১% এর চেয়ে ও কম ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
৩. ব্রেইনের ধমনী ছিড়ে যাওয়া বা রক্তক্ষরণ বা হেমেরেজিক স্ট্রোক। যা ১৫% ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এদের তার মধ্যে ব্রেইনের মধ্যে রক্তক্ষরণ বা ইন্ট্রাসেরিব্রাল হেমোরেজ ১০%, ব্রেইন ও ব্রেইনের আবরনীর মধ্যে রক্তক্ষরণ বা সাব-এরাকনয়েড হেমোরেজ ৫%।

♦স্ট্রোকের উপসর্গঃ
স্ট্রোকের বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হতে পারে। যেমনঃ-
১. শরীরের একপাশ দুর্বলতা নিয়েই স্ট্রোক অধিকাংশ সময় প্রকাশ পায়।
২. রোগী জ্ঞান হারাতে পারে তবে খুব কম সংখ্যক লোকের ক্ষেত্রে তা দেখা যায়।
৩. স্ট্রোকে কথা বলতে সমস্যাও হতে পারে।

♦স্ট্রোকের মত উপসর্গ নিয়ে অন্যান্য কি কি রোগ প্রকাশ পেতে পারে??
১. ব্রেইন টিউমার।
২. ব্রেইন আবরণীর নীচে বা উপরে রক্তক্ষরণ।
৩. ব্রেইন এবসেস বা ব্রেইনের মধ্যে পুঁজ জমা।
৪. এক ধরণের মৃগী রোগের খিঁচুনি হওয়ার সময়।
৫. টোড প্যারেসিস বা খিঁচুনি পরবর্তী সময়ে।
৬. মাইগ্রেনের মাথা ব্যাথার পূর্ববর্তী অরা নামক অবস্থায়।
৭. হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে গ্লুকোজ কমে যাওয়া।
৮. মিনিয়ার্স ডিজিজ।
৯. এনকেফালাইটিস নামক ব্রেইন প্রদাহ।
১০. কনভার্সন ডিজঅর্ডার।
……আরও অনেক…

♦স্ট্রোক হয়েছে না অন্যান্য রোগ তা বুঝার উপায়??
সাধারণত নিম্নোক্ত উপসর্গ দিয়ে স্ট্রোক হয়েছে না অন্য রোগ হয়েছে, তা নিয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। যেমনঃ-
১. স্ট্রোকঃ
উপসর্গ খুব তাড়াতাড়ি যেমন মিনিটের মধ্যেই শুরু হয় এবং খুব অল্প সময়েই পুরো উপসর্গ প্রকাশ পেয়ে যায়।
একপাশ দুর্বলতা নিয়ে সাধারনতঃ প্রকাশ পায় কিন্তু জ্ঞান খুব কমই হারায়। এতে মেমোরি সাধারণত অক্ষত থাকে।
২. স্ট্রোক এর মত উপসর্গ কিন্তু স্ট্রোক নাঃ
সাধারণত ধীরে ধীরে উপসর্গ শুরু হয় এবং পুরো উপসর্গ প্রকাশ পেতে সময় লেগে যায়। এসব ক্ষেত্রে খুব বেশী পরিমাণে জ্ঞান হারায়। এদের মেমোরি হারাতে দেখা যায়।

♦ রক্তনালী বন্ধ বা ব্রেইনে রক্ত ক্ষরণ বুঝার কোন উপায় আছে কিনা??
এ রকম নিশ্চিত ভাবে বলা কঠিন তবে যদি দেখা যায় খুব বেশী মাথা ব্যথা ও বমির সাথে যদি এক পাশ দুর্বলতা দেখা দেয় তাহলে ধরে নেয়া যায় তার ব্রেইনে রক্ত ক্ষরণের সম্ভাবনা অত্যাধিক।

♦কি কি পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে??
অনেকে মনে করেন স্ট্রোক তো ব্রেইনেরই রোগ সুতরাং ব্রেইনের পরীক্ষা করলেই হয়ে যায়, ডাক্তারেরা এমনি এমনি অনেক পরীক্ষা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তা সঠিক নয়। স্ট্রোক আক্রান্ত রোগীর পরীক্ষা প্রয়োজন হয় অনেক কারণে।
পরীক্ষা করার কারণ সমূহঃ-
১. এ রোগের শণাক্ত করার জন্য।
২. কি কারণে হয়েছে তা দেখার জন্য।
৩. ভবিষ্যতে আবার হওয়ার রিস্ক আছে কিনা তা দেখার জন্য।

পরীক্ষা সমূহঃ-
১. ব্রেইনের সিটি স্ক্যান পরীক্ষা।
২. ব্রেইনের এমআরআই পরীক্ষা।
৩. ব্রেইনের এনজিওগ্রাফী।
৪. শিরদাঁড়ার রস নিয়ে পরীক্ষা।
৫. হার্টের বিভিন্ন পরীক্ষা।
৪. গলার রক্ত নালীর পরীক্ষা।
৫. কিছু রক্ত পরীক্ষা ইত্যাদি…
….তবে সব পরীক্ষা এক সাথে প্রয়োজন হয়না। রোগের কারণ ও ধরণ দেখে বিভিন্ন পরীক্ষা করতে হয়

♦কি কি কারণে ধমণী বন্ধ হওয়া বা ইনফার্কটিভ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে??
অনেক কারণে এই স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে, তাদের মধ্যে কিছু কিছু কারণ আছে পরিবর্তন যোগ্য আর বাকী সব অপরিবর্তনীয়।

পরিবর্তযোগ্য কারণ সমূহঃ
১. উচ্চ রক্তচাপ।
২. রক্তে চর্বির পরিমাণ বেশী থাকা।
৩. ডায়াবেটিস।
৪. ধূমপান।
৫. মাত্রারিক্ত মদ্যপান।
৬. হার্টের সমস্যা যেমনঃ এট্রিয়াল ফিব্রিলেশান, কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউর, ইনফেকটিভ এন্ডোকার্ডাইটিস।
৭.কিছু কিছু ঔষধ, যেখানে ইস্ট্রোজেন নামক উপাদান আছে যেমনঃ জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি, হরমোন রিপ্লেইসমেন্ট থেরাপি।

অপরিবর্তনীয় কারণ সমূহঃ
১. বেশী বয়স।
২. জেন্ডার যেমন পুরুষের স্ট্রোক হওয়ার হার মেয়েদের হতে বেশী। তথাপি খুব কম বা খুব বেশী বয়সে স্ট্রোকের হার একই।
৩. বর্ন যেমনঃ আফ্রো-ক্যারিবিয়ানরা সবচেয়ে বেশী, তারপর এশিয়ান এবং তারপর ইউরোপিয়ানরা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে থাকে।
৪. জন্মগত কিছু কারণ।
৫. আগের কিছু রোগ যেমন পূর্বে মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশান নামক হৃদরোগে , স্ট্রোকে বা পেরিফেরাল ভাসকুলার ডিজিজ নামক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকলে।
৬. কিছু রক্তরোগ যেমনঃ সিকেলসেল ডিজিজ, রক্তে ফিব্রিনোজেন নামক উপাদান বেশী থাকলে।

♦ব্রেইনে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ে কি কি কারণে??
১. উচ্চ রক্তচাপ।
২. রক্তে কোলেস্টেরল বেশী থাকলে।
৩. বেশী বয়সে।
৪. কিছু কিছু ঔষধ সেবনে যেমনঃ এন্টিকোয়াগুলেন্ট বা থ্রম্বোলাইটিক ঔষধ।
৫.কিছু কিছু রক্ত রোগ যেমনঃ যে রোগে রক্ত জমাট বাধতে সমস্যা হয়।
৬. নেশা জাতীয় ঔষধ যেমনঃ ইয়াবা, কোকেন, মদ ইত্যাদি।
৭.জন্ম গত কিছু কারণ যেমনঃ শিরা ও ধমনীর অস্বাভাবিক সংযোগ,কেভার্নাস হেমানজিওমা নামক রোগ।
৮. পারিবারিক কিছু রোগ যা পরিবারের অনেকের থাকতে পারে।
…..আরও অনেক…

♦ চিকিৎসাঃ
চিকিৎসার অনেকদিক রয়েছে।
……….
চিকিৎসার লক্ষ্য সমূহঃ-
১. স্ট্রোকের কারণ শণাক্তকরন।
২. ব্রেইন নষ্ট হওয়ার পরিমান কমানো।
৩. নতুন কোন শারীরিক সমস্যা যাতে তৈরী না হয়, বা নতুন সমস্যা হলে তার চিকিৎসা।
৪. অক্ষমতা কমানো।
৫. ভবিষ্যতে যাতে আর স্ট্রোক না হয় তার চিকিৎসা।

# চিকিৎসা কি কি ভাবে করা যায়ঃ-
রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়, সবচেয়ে ভাল হয় যেখানে স্ট্রোক ইউনিট আছে সেখানে। নাকে নল দিয়ে খাবার বা ঔষধ দেয়া লাগতে পারে।
১. ঔষধের মাধ্যমে চিকিৎসা, যাতে রক্ত তরল করার ঔষধ সহ আরও কিছু ঔষধ ব্যবহৃত হয়।
২. ফিজিওথেরাপি, যা স্ট্রোক চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যা শারীরিক অক্ষমতা কমাতে সাহায্য করে।
৩. রিপারফিউশান, যার মাধ্যমে ব্রেইনের ব্লক ছুটানো হয়।
৪. কেরোটিড এন্ডআর্টারিয়েকটমি ও এনজিওপ্লাস্টি।
৫. যেসব কারণে স্ট্রোকের রিস্ক বাড়ে তার চিকিৎসা।
৬. সেরিব্রাল ভেনাস থ্রম্বোসিস এ অনেক সময় এন্টিজোয়াগুলেন্ট, এন্টিবায়োটিক ইত্যাদিও প্রয়োজন হয়।

♦কত জন ভাল হতে পারে??
স্ট্রোকে আক্রান্ত, ২০% রোগী এক মাসের মধ্যে মারা যায়, আর যারা বেঁচে থাকে তাদের অর্ধেকের বিভিন্ন পরিমাণে শারীরিক অক্ষমতা থেকে যায়।

♦শেষ কথাঃ
তাহলে দেখা যায় স্ট্রোকের মত মনে হলে যে স্ট্রোকই হয়েছে, তা চিন্তা করার অবকাশ নাই। যদিও অন্য রোগ হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫ ভাগের মত তবুও চিকিৎসার স্বার্থে সম্ভাবনাটুকু মনে রাখা জরুরী। তাছাড়া এও লক্ষ্যণীয় যে স্ট্রোক বা ব্রেইন স্ট্রোকে উল্লেখযোগ্য রোগী মারা যায় বা অক্ষম হয়ে যায়, তাই প্রতিরোধই উত্তম। আসুন আমরা স্ট্রোক ঝুঁকি বাড়ে এসব উপাদান বা রোগ হতে বাঁচি, স্ট্রোক প্রতিরোধ করি এবং সুস্থ থাকি।

লেখক-
ডাঃ এম ফরহাদ
এমবিবিএস, এমসিপিএস, এমডি
ফেলোশীপ ট্রেইনিং ইন নিউরোলজী।

[ডাঃ এম ফরহাদ এর ফেইসবুক ওয়াল হতে সংগৃহীত(সংগ্রহে- রাসেল মাহবুব)]

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com