ডিপ্লোমাবিদগণ দেশের উন্নয়নে অংশীদার : এ. কে. আজাদ ফাহিম

শুক্রবার, ০৪ মে ২০১৮ | ৮:১৫ অপরাহ্ণ | 4410 বার

ডিপ্লোমাবিদগণ দেশের উন্নয়নে অংশীদার : এ. কে. আজাদ ফাহিম
এ. কে. আজাদ ফাহিম

মাধ্যমিক শেষ করে অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চার বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হই। ছাত্র হিসেবে মোটামুটিরকম ছিলাম। সেবছরে এসএসসি’তে স্কুলের সর্বোচ্চ রেজাল্ট আমিই অর্জন করি। পুরো ব্যাচের মধ্যে আমি একাই ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হই।

নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পড়ালেখার উদ্দেশ্যই পড়ালেখা শেষে কোনোমতে একটা চাকুরি যোগানো। আমার ক্ষেত্রেও হয়তো তা-ই।

ভর্তি হওয়া ইনস্টিটিউট বাড়ি থেকে দূরবর্তী হওয়ায় ছাত্রাবাসে ওঠতে হলো। প্রথমত খাপখাইতে কষ্ট হলেও পরে পরে ঠিক হয়ে যায়।

স্বজন-প্রতিবেশি যে বা যারাই কোথায় পড়ছি জানতে চাইলে ডিপ্লোমা করছি শুনে খুশি হতো। সবাই মনে করে এখানে পড়লেই বুঝি চাকুরি এনে বাড়িতে দিয়ে যায়! এলাইন থেকে শর্টকাটে চাকুরি পাওয়ার সুযোগ বেশী। বুঝতে পারলাম একটি চাকুরিই যেন একজন ডিপ্লোমাবিদের একমাত্র লক্ষ্য। অল্পতেই পাকতে হয় একজন ডিপ্লোমাবিদকে বুঝতে বাকি রইলোনা।

খুব অল্প বয়সেই একজন ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী কিশোর বয়সে মা-বাবার নাগালের বাইরে চলে আসেন। নিজেকেই নিজের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করতে হয়। এসুযোগ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা পাননা। তারা এইচএসসি পর্যন্ত মায়ের আঁচল নীড়ে বড় হয়ে থাকেন। এছাড়া ভর্তিযুদ্ধে ও প্রস্তুতিতে কেটে যায় আরো বছর খানেক।

ততদিনে সমবয়সী ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী তার পরবর্তী কর্মক্ষেত্র কি হবে এসব নিয়ে ভাবনা শুরু করে দেন। অনেকের ‘চাকরির খবর’ পত্রিকার সাথে পরিচয় ঘটে যায় ইতোমধ্যে। বিডি জবস এ ঢু মারা অভ্যাসে পরিণত হয়।

অল্প বয়সে স্বাধিনতা পেয়ে অনেকে আত্মনির্ভরতা শক্তিকে চাঙ্গা করে তোলেন আবার অনেকে বখে যান। সমবয়সী উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী পড়ালেখা, জীবনের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে গড়াবে তার পরিকল্পনা বা প্রচেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত। আর অন্যদিকে একজন ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী ততদিনে রাজনীতি, র্যাগিং, রাতজাগা, আড্ডা, টিউশনি, বন্ধুত্ব, প্রেম, বিরহ প্রভৃতিতে বেশ পরিণত। চাকুরির প্রতিযোগিতায় নিজেকে প্রস্তুতকরণেও অনেকদূর এগিয়ে যায়।

ডিপ্লোমা শেষ করলাম। এবারে জাতির প্রশ্ন চাকুরি করি কিনা, কি চাকুরি করি, চাকুরি করিনা কেন ইত্যাদি! অবশ্য আমি ততদিনে হালকা শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে দিই। ডিপ্লোমা অধ্যয়নকালীন সময়েই একটি সাহিত্যপত্রের সম্পাদনা করতাম। এরপর চলে যাই হাতিয়া। কর্মজীবনের শুরু হয় মূলত সেখান থেকেই। এনজিও বেইজড্ ইউরোপিয় ইউনিয়নের একটি প্রজেক্টে কাজ শুরু করি। এরপর আবার কিছুদিন ঢাকাতে টুকটাক সাংবাদিকতা। তারপর থেকেই সরকারি চাকুরিতে। তখনও সমবয়সী অনেকে স্নাতক শেষ করেনি।

এবারে বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজনদের একটাই মাথা ব্যাথা আমার বিয়ে। তাদের বক্তব্য, চাকুরিতো করছো তবে বিয়ে করছোনা কেন, কবে করছো, আরে করে ফেল ইত্যাদি। আমার আশপাশের সমবয়সী বা সিনিয়র অনেকের বিয়ের প্রশ্ন আসছেনা যেখানে, সেখানে আমি যেন ‘বিয়েলাক’ হয়ে ‘বিয়েকোটি’ হয়ে যাচ্ছি!

চাকুরিক্ষেত্রে দেখা যায় একজন ডিপ্লোমাবিদ অফিসে সবচেয়ে বেশি লোড বহন করেন। ডিপ্লোমা জাতিকে মধ্যমপন্থী বলে মনে হয় আমার কাছে। এরা ঊর্ধ্বতন কর্তাদের সাথে যেমন লড়াকু আবার বিনীতও। অধস্তনদের ব্যাপারেও তারা সফট প্রকৃতির হয়ে থাকেন। বিভিন্নক্ষেত্রে দেখা যায় একজন ডিপ্লোমাবিদ অনেকের ঈর্ষার পাত্র হয়ে থাকেন। যেমন মাস্টার্স সম্পন্ন করা নন বিএড একজন শিক্ষক মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে ১১ তম গ্রেড পাচ্ছেন। কিন্তু ডিপ্লোমাবিদ একজন সহকারী শিক্ষক ১০ম গ্রেড পেয়ে থাকেন শুরু থেকেই। এটাও অনেকের ঈর্ষার কারণ। যদিও ডিপ্লোমা শিক্ষাক্রমের সিলেবাস সমৃদ্ধ হওয়ায় আলাদা বিএড’র প্রয়োজন হয় না। জনপ্রিয়তার দিক থেকেও অনেক এগিয়ে থাকতে দেখা যায় একজন ডিপ্লোমাবিদ শিক্ষককে।

উপকারভোগি মহলেও নিবেদিত ডিপ্লোমাবিদগণ। আমি দেখেছি ডিপ্লোমাবিদগণ বেশিরভাগ সহাস্যমুখী হয়ে থাকেন। যেমন- একজন ডাক্তার যখন রোগী দেখতে এসে ভীষণ তাড়াহুড়ো করছেন চেম্বারিং এর ধান্দার টার্গেটে কিন্তু একজন ডিপ্লোমাবিদ নার্স বা উপসহ. কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার রোগীর একান্ত আপনজনের মতো রোগীর ভাষাতেই রোগীকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যত্ন নিচ্ছেন। আমাদের রেডিমেড শিল্পের দিকে তাকালে দেখা যাবে একজন সেলাই দিদিমণির পাশে থেকে দেশের জন্য অবদান রাখছেন একজন ডিপ্লোমা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, মেকানিক্যাল, কম্পিউটার, আর্কিটেকসহ সকল ডিপ্লোমা প্রকৌশলীগণ স্বদেশ গড়ার কারিগর হিসেবে প্রকৌশলীদের তুলনায় বেশি অবদান রেখে আসছেন।

কৃষি উন্নয়নে ডিপ্লোমা কৃষিবিদের তুলনা হয়না কারো সাথে। একজন কৃষিবিদ যেখানে কৃষকের ভাষাই বুঝতে পারেননা সেখানে একজন ডিপ্লোমা কৃষিবিদ উপসহ. কৃষি অফিসার কৃষকের ভাষাতেই বুঝিয়ে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন প্রযুক্তি। কৃষকের পাশে থেকে নিরলস সেবা দিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে অবদান রাখছেন একজন ডিপ্লোমা কৃষিবিদই।

দেশে কারিগরি শিক্ষার অনেক প্রসার ঘটেছে। এশিক্ষাক্রমকে আরো যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নজর থাকা দরকার এ বিভাগের প্রতি। ক্লাসরুম, শিক্ষক ছাত্রের অনুপাত সঠিক রাখা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তির ব্যবস্থা করা। এতে ডিপ্লোমা শিক্ষাক্রম আরো যুগোপযোগী হবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পাবে। যেসব কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আধীনে আসেনি। সেগুলোকে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে সকল ডিপ্লোমা কোর্সকে সমানতালে মানসম্মত করে গড়ে তোলা দরকার।

একজন ডিপ্লোমাবিদ ডিপ্লোমা শেষ করে যেন চাকুরির পেছনে ঘুরতে না হয় সেজন্য তাদেরকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা উচিত। দেশেবিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

করিগরি বোর্ডের সস্তা অনুমোদনে যেখানেসেখানে গড়ে ওঠছে কারিগরি প্রতিষ্ঠান। যেখান থেকে আদৌ মানসম্মত একজন কারিগর গড়ে তোলা কোনভাবেই সম্ভব না। সেখান থেকেও প্রতিবছর ডিপ্লোমাবিদ বের হচ্ছে। সস্তা হচ্ছে ডিগ্রী। বদনাম বাড়ছে, কারিগরিতে পাশ করা লোকও চাকুরি পাচ্ছেনা। কারিগরি বোর্ডের প্রতি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের বিশেষ তদারকি বাড়ানো আবশ্যক।

একজন ডিপ্লোমাবিদ কাজ করেন দেশকে ভালবেসে দেশের মানুষকে ভালোবেসে। এগিয়ে যাচ্ছে দেশ এগিয়ে যাবে দেশ। এভাবে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করতে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন একজন ডিপ্লোমাবিদ।

লেখক- ডিপ্লোমা কৃষিবিদ।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com