ধানের পোকা দমনে পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ‘লাইভ পার্চিং’ ব্যবহারে অনুকরণীয় তোয়াহিদ আলী

মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৩:২৪ অপরাহ্ণ | 677 বার

ধানের পোকা দমনে পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ‘লাইভ পার্চিং’ ব্যবহারে অনুকরণীয় তোয়াহিদ আলী

সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালাবাজার ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রামের বাসিন্দা তোয়াহিদ আলী। সত্তরোর্ধ্ব এ মানুষটির জীবন-জীবিকার পুরোটা জুড়ে রয়েছে কৃষি।
কৃষি কাজ তার বংশ পরম্পরা প্রধান ও একমাত্র পেশা। এপেশাতে তিনিও তার ধারাবাহিক উত্তরসূরী তৈরি করতে পেরেছেন। নিজের সন্তানদের যেমন আদর্শ কৃষক হিসেবে গড়ে তুলেছেন তেমনি তৃতীয় প্রজন্ম দৌহিত্রদেরকেও সম্পৃক্ত করেছেন এপেশাতে। তারা অবশ্য খন্ডকালীন হিসেবে কাজ করেন।

নিজের সন্তানদের তেমন পড়ালেখা না করাতে পারলেও দৌহিত্রদের যুগের সাথে মিল রেখে পড়ালেখা করিয়ে আসছেন। তারা পড়ালেখার পাশাপাশি নিয়মিত দাদা ও বাবাকে কৃষি কাজে সহযোগিতা করে অবদান রাখছে কৃষি নির্ভর পরিবারে।

দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার ইউনিয়নে তোয়াহিদ আলীর ধানক্ষেতে ধৈঞ্চা ‍দিয়ে স্থাপিত লাইভ পার্চিং

তোয়াহিদ আলী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রাপ্ত যেকোন প্রযুক্তি গ্রহন করেন সবার আগে। জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শণী গ্রহণ করে আধুনিক চাষাবাদের সাথে তালমিলিয়ে হালনাগাদ থাকেন সবসময়। নতুন লাগসই প্রযুক্তি গ্রহণে তিনি সকল কৃষকদের জন্য অনুকরণীয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তা উপসহকারী কৃষি অফিসার এ. কে. আজাদ ফাহিমের পরামর্শে তিনি সব সময় তার ফসলের যেকোন সমস্যার সমাধান যেমন করেন, তেমনি আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করে অন্য সব কৃষক থেকে এগিয়ে থাকেন।

তিনি ধান চাষাবাদে সঠিক বয়সে ও সঠিক দূরত্বে চারা রোপন, সারিতে চারা রোপন, ধান ফসলে লোগো পদ্ধতি অনুসরণ করেন।

এছাড়াও তিনি ধান ক্ষেতে ক্ষতিকর পোকা দমনে ধৈঞ্চা দিয়ে লাইভ পার্চিং করে থাকেন। লাইভ পার্চিং ব্যবহার করে ফসলের ক্ষতিকর পোকা মাকড় বিভিন্ন পোকা খেকো পাখির দ্বারা দমন করে ফসলকে নিরাপদ রাখেন। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেমন ফসলের ক্ষতিকর পোকা দমনে কীটনাশক ব্যবহারের খরচ বাঁচে তেমনি পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা পায়।

দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার ইউনিয়নে তোয়াহিদ আলীর ধানক্ষেতে ধৈঞ্চা ‍দিয়ে স্থাপিত লাইভ পার্চিং

তোয়াহিদ আলীর সাথে আলাপ করে জানা যায়, তিনি তিন মৌসুমেই ধান চাষ করে থাকেন। সব সময় ধানে লাইভ পার্চিং করে থাকেন। ধানের জমিতে চারা রোপনের সাথে সাথেই তিনি পার্চিং দেন। ধান রোপনের সাথে সাথেই পার্চিং করার কারণে এ প্রযুক্তি দ্বারা তিনি বেশি উপকারীতা পেয়ে থাকেন তিনি। পার্চিং ব্যবহার করে মাজরা, পাতামোড়ানো, চুঙ্গিসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার হাত থেকে ফসলকে রক্ষা করে আসছেন বলে জানান।

উপসহকারী কৃষি অফিসার এ. কে. আজাদ ফাহিম বলেন, পার্চিং হলো ফসলের জমিতে ডাল বা খুঁটি দিয়ে পাখি বসার সুযোগ করে দেয়া এতে বিভিন্ন পাখি ফসলের ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফসল রক্ষা করে। পার্চিং এমন একটি প্রযুক্তি যা ব্যবহার করতে কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ করা লাগেনা। ডেড পার্চিং করতে বাড়ি থেকে বাঁশ বা গাছের ডালপালা সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে পারেন। লাইভ পার্চিং ব্যবহারে ধানের বীজতলা করার কিছুদিন পূর্বে ধৈঞ্চা বীজ বুনতে হবে। ধৈঞ্চাগাছের চারা ধানের চারার তুলনায় কিছুটা বড় হওয়া প্রয়োজন। এতে ধান রোপনের সাথে সাথেই ধৈঞ্চা দিয়ে পার্চিং স্থাপন করে লাভবান হওয়া যায়।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ শামিমা আক্তার বলেন, ধানে পার্চিং স্থাপনে কৃষি বিভাগ সবসময়ই কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে আসছে। নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারে উপকারী ও অপকারী পোকা সমানভাবে মারা যায়। এতে করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। কিন্তু লাইভ পার্চিং ব্যবহারে কৃষকরা ক্ষতিকর পোকাদমনের পাশাপাশি আর্থিকভাবেও লাভবান হতে পারবেন। কারণ লাইভ পাচিং স্থাপনে যে ধৈঞ্চা ব্যবহৃত হয় এতে বিশেষ ধরণের নড্যুল রয়েছে যা দ্বারা বাতাসের নাইট্রোজেন মাটিতে নিতে সক্ষম। ধৈঞ্চাগাছ বড় হয়ে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করলে সেখানে পাখি বসে ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করবে এবং ধৈঞ্চার নড্যুল বাতাসের নাইেেট্রাজেন মাটিতে সরবরাহ করে কৃষকের ইউরিয়া সারের খরচও কমাবে। আমি মনে করি তোয়াহিদ আলীর মতো সকল কৃষকদের অবশ্য উচিত ধান ক্ষেতে লাইভ পার্চিং স্থাপন করা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com