পরিবেশ সংরক্ষণে পোকা-মাকড়ের জৈবিক দমন

রবিবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ | ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ | 1238 বার

পরিবেশ সংরক্ষণে পোকা-মাকড়ের জৈবিক দমন

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এ দেশের অধিকাংশ লোক কৃষির উপর নির্ভরশীল। শতকরা ৬৩ ভাগ লোক বিভিন্ন প্রকার ফসলের আবাদ করেন। এ দেশের বিরাজমান আবহাওয়া ফসল উৎপাদনের জন্য যেমন সহায়ক তেমনি বিভিন্ন প্রকার আপদের জন্য অনুকূল প্রভাব ফেলে থাকে। এই ক্ষতিকর আপদ হল আমাদের ফসলের পোকা-মাকড়।


কৃষকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ও অতি কষ্টে উপার্জিত টাকা পয়সা খরচ করে তারা জমিতে ফসল ফলান। অথচ ক্ষতিকর পোকা-মাকড়ের আক্রমণে অল্প সময়ের মধ্যেই ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পোকার আক্রমণ বেশি হলে শতকরা ৮০-১০০ ভাগ পর্যন্ত নষ্ট হতে পারে। জরিপে দেখা যায় পোকা মাকড়ের আক্রমণে প্রতি বছর আমাদের দেশে গড়ে শতকরা ১০-১৫ ভাগ পর্যন্ত ফসল মাঠেই নষ্ট হয়। শুধু মাঠেই নয়, তা সংরক্ষণের পর আরো ৫-৮ শতাংশ গোদামজাত ফসল নষ্ট হয়ে থাকে। পরিসংখ্যানে দেখা য়ায় আমাদের সরকারি খাদ্য গোদামে প্রতি বছর পোকা-মাকড়ের আক্রমণে এক লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য নষ্ট হয়। এতে করে আমাদের বিরাট ক্ষতি হয়।
বাংলাদেশে ১৬২ প্রকারের আবাদি ফসলে (বনজ সহ) ৬৮২ টি রোগের আক্রমণ হয় শুধুই পোকা-মাকড়ের কারণে। এর ফলে আমাদের প্রায় ৭২০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়। ফসলে পোকা-মাকড়ের আক্রমণে ফলন যেমন কমে, তেমনি ফসলের গুণগত মানও অনেকাংশে কমে যায়। এছাড়া পোকা-মাকড় দমনে আরো ফসল উৎপাদনে ১০-৩০ শতাংশ উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।


বাংলাদেশে প্রায় ৬০০ ধরণের পোকা-মাকড় ফসলের ক্ষতি করে থাকে। আমাদের মোট উৎপাদনের মধ্যে ১৫-২৩ লক্ষ মেঃ টন ফসলের ক্ষতি হয় শুধু পোকা-মাকড়ের আক্রমণে। তা দূর করতে আমাদের উচিত পরিবেশ বান্ধব কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা।
আমরা প্রাথমিকভাবে কীটনাশকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াতে ফসলের যে পরিমাণ ক্ষতি করছি তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করছি আমাদের পরিবেশের। তা ত্বরান্বিত করতে আমাদের উচিত দ্রুত জৈবিক বালাই দমন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হওয়া। এতে করে আমাদের পরিবেশ বিপর্যয় হতে রক্ষা পাবে নতুবা আমরা মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হব। তাই কীটনাশক ছাড়া আমরা প্রাকৃতিক বা জৈবিক উপায়ে ফসলের ক্ষতি না করে ফসলের শত্রু পোকা-মাকড় দমন করার পদ্ধতিকে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম বলে। এই পদ্ধতি অবলম্বনে আমরা নি¤েœাক্ত উপকার পেতে পারি।


১। পরিবেশ দূষণ রোধ বা কমিয়ে আনে।
২। উপকারি পোকা মাকড়, মাছ, ব্যাঙ, পশুপাখি ইত্যাদি সংরক্ষণে সহায়তা করে।
৩। প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান জৈবিক ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়তা করে।
৪। বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্যাদির যথেচ্ছ ব্যবহার কমিয়ে আনে।
৫। ক্ষতিকর বালাই সমূহ বালাইনাশক সহনশীলতা অর্জন করার সুযোগ পায়না।
৬। কম খরচে ফসলের বেশি ফলন পেতে সহায়তা করে।
৭। কীটনাশক ব্যবহার না করায় প্রাকৃতিকভাবে ম্ছা ও ফসল উৎপাদন বেশি হওয়ায় আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছি।
৮। উপকারি পোকা-মাকড় বেচে থাকার কারনে তাদের বংশ বিস্তার হওয়ায় ক্ষতিকর পোকা মাকড় বিনষ্ট হয়। যাতে ৫০ রকমের মাকড়সা ও ৪০ ধরনের বোলতা জাতীয় পরজীবি পোকা সনাক্ত হয়। যা আমাদের ফসলের জন্য খুবই উপকারি।
জৈবিক উপায়ে পোকা-মাকড় দমনে আমাদের উচিত প্রথমেই মাটির স্বাস্থ্যগত চেহারার পরিবর্তন। জমিতে বেশি পরিমাণে জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করলে জমির মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে বায়ু ও পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ে। এতে করে ক্ষতিকর পোকা-মাকড়ের উপদ্রব কমে আসে। জমি পতিত না রেখে বারবার চাষের ফলে পোকা-মাকড় অনেকটা জৈবিক উপায়ে দমন হয়ে থাকে। জমিতে একই ফসল বারবার না করে তাতে বিভিন্ন প্রকার ফসল আবাদের ফলেও পোকা-মাকড় দমন হয়। যা পরিবেশের জন্য খুবই উপকারি। মাটির স্বাস্থ্য ভাল করতে আমরা বিভিন্ন প্রকার জৈব সার ব্যবহার করি তা হল কুইক কম্পোষ্ট, ভার্মি কম্পোষ্ট, ট্রাইকো কম্পোষ্ট, বসত বাড়ির আঙ্গিনায় উৎপাদিত কম্পোষ্ট, মোরগের বিষ্ঠা ও গোবর অন্যতম।
পোকা-মাকড় নিয়ন্ত্রনে বীজ বিরাট অবদান রাখে। ভাল মানের বীজ পোকা-মাকড়ের আক্রমণমুক্ত হওয়ায় এতে ফসলে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম হয়। বীজ যদি প্রাথমিকভাবে বাছাই পূর্বক নেয়া যায় তাহলে অনেক উপকারে আসে।


জমিতে সেচ পোকা-মাকড় দমনে মারাত্মক ভূমিকা পালন করে। জমিতে সেচের ফলে অনেক পোকা পানি সহ্য করতে না পেরে তা মাটির নিচ হতে বের হয় । তখন কিছু পোকা-মাকড় পাখি খেয়ে ফেলে তাতে করে জৈবিক উপায়ে পোকা-মাকড়ের দমন হয়। যেমন থ্রিপস, লেদা পোকা, কাটুই পোকা, ছাতরা পোকা, বাদামী গাছ ফড়িং ইত্যাদি। জমি ভেজানো শুকানোর মাধ্যমেও ফসল আবাদের পর পোকার আক্রমণ কমানো যেতে পারে।
জমিতে পার্সিং করে পাখি বসার ব্যবস্থা করে দিলে তা পাখি খেয়ে ফেলে। এতে করে পোকা-মাকড়ের দমন হয়। বিভিন্ন প্রকার ফসলের সেক্স ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করেও পোকা-মাকড় দমন করে ফসল রক্ষা করা সম্ভব। ইহার ফলে আমাদের নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
হাত জাল ব্যবহার করে আমরা মাজরা, পামরী, ঘাস ফড়িং, উড়চুঙ্গা, চুঙ্গিপোকা, পাতা মোড়ানো, লেদা পোকা ইত্যাদি দমন করা যায়। এতে করে জৈবিকভাবে ফসল উৎপাদন করে পরিবেশ রক্ষা হয়।
জমিতে রাত্রে আলোর ফাঁদ ব্যবহার করে পোকার উপস্থিতি নিশ্চিত করে বিভিন্ন প্রকার পোকা-মাকড়ের দমন করা যায়। আলোর ফাঁদের ফলে ফসলের কি কি পোকা-মাকড়ের আক্রমণ হয়েছে বুঝা যায়। আলোর ফাঁদের সাহায্যেও বিভিন্ন প্রকার পোকা-মাকড় মেরে দমন করা যায়।


আমাদের মানব দেহ পরিচালনা করতে যেমন সুষম খাবারের প্রয়োজন, সেরকম ফসল উৎপাদনে সুষম সার ব্যবহারও অত্যাবশ্যক। সুষম সার ব্যবহারের ফলে ফসল ও ফলন ভাল হয়। এতে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম হয়। তবে জমিতে নাইট্রোজেন সারের ব্যবহারের পরিমাণ কমালেও পোকা-মাকড়ের উপদ্রব কম ঘটে।
জৈব বালাই নাশক হিসাবে আমাদের পরিবেশের অতি পরিচিত যা আদি কাল হতে কৃষক ব্যবহার করে আমাদের ফসলকে রক্ষা করে আসছেন তা হল-বিষকাটালি, ধুতুরা, নিম, গোল মরিচ, তামাক পাতা ও মেহগনির বীজ। ইহা ব্যবহার করে আমাদের কৃষক ফসলকে রক্ষা করতে পারেন।


ফসল ও মানুষের ক্ষয় ক্ষতি এবং উৎপাত করা ছাড়াও কিছু কিছু পোকা ও মেরুদন্ডী প্রাণী আমাদের ফসলে উপকার করে থাকে। যেমন মাকড়সা, লেডিবার্ড বিটল, ড্যামসেল ফ্লাই ইত্যাদি পোকাগুলো পরভোজী। এরা ফসলের ক্ষতিকর পোকা যেমন বাদামী গাছ ফড়িং সাদা পিঠ গাছ ফড়িং আঁকাবাঁকা পাতা ফড়িং, চুঙ্গি পোকা ইত্যাদি খেয়ে ধ্বংস করে আসছে। আবার কিছু পরজীবি পোকা যেমন বোলতা জাতীয় পোকা ফসলের ক্ষতিকর মাজরা পোকা, প্লান্ট হোপার,লিপ হোপার ইত্যাদি পোকার ডিমের গাদার উপর ডিম পেড়ে তা থেকে সৃষ্ট পরজীবি কীড়া গুলো ক্ষতিকর পোকা গুলোর ডিমের ভ্রুণ বা ডিমের কীড়া খেয়ে বংশ বৃদ্ধি ব্যাহত করে তাদের সংখ্যা কমিয়ে রাখছে। তাছাড়া ব্যাঙ, গুইসাপ,বেজী,শিয়াল, বনবিড়াল ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ফসলের ক্ষতিকর পোকা ও ইঁদুর খেয়ে ফসলকে রক্ষা করে আসছে। যা সম্পূর্ণ জৈবিক উপায় অবলম্বন করে আমাদের পরিবেশ রক্ষা করা হচ্ছে। 


পরিশেষে বলা যায়, আমরা নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাবার উৎপাদনের দিকে নজর দিতে আমাদেরকে অবশ্যই পরিবেশ সংরক্ষণে জৈবিক উপায়ে পোকা-মাকড় দমন করে আমাদের ফসলকে রক্ষা করা উচিত। আমরা পরিবেশের আগামী ভবিষ্যৎ নষ্ট না করে সুন্দর পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com