ফিরে আসুক সেই শুদ্ধ সংস্কৃতি

বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ | ৫:০৪ অপরাহ্ণ | 756 বার

ফিরে আসুক সেই শুদ্ধ সংস্কৃতি

গুরাশাল, সুরমা নদীর শাখা নদী। তারই তীরে ছোটবড় টিলায় গড়ে উঠেছে জনপদ। এরকমই এলাকার একটি গ্রামে আমার জন্ম। গ্রামের নাম নোয়াগাঁও।লোকমুখে চাটিবহর নোয়াগাঁও নামেই পরিচিত। এটি সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা কোম্পানিগঞ্জের তেলিখাল ইউনিয়নে অবস্থিত। ভৌগলিক কারনে এলাকাটি জন্মলগ্ন থেকেই অনুন্নত। পাথর আর বালু ব্যবসা প্রধান এলাকা হলেও এখানকার শতকরা ৯০ ভাগ লোক শ্রমিক।বাকি ১০ ভাগের মধ্যে প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেশার।


প্রধানত হাওড় অঞ্চল হওয়ায় এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।দুই যোগের ও বেশি সময় আগে একবার উপজেলার সাথে সড়ক যোগাযোগ হয়েছিল।সেই থেকে অদ্যবদী ভাঙ্গাচূরা রাস্তাই হচ্ছে একমাত্র ভরসা।বছরে প্রায় ছয় মাস পানিবন্ধি থাকতে হয় এই গ্রামের লোকদের।


গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ ই দরিদ্র সীমার নীচে বসবাস করছে।লেখাপড়ার সুযোগ না থাকার দরুন পুরু গ্রামে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কোন এস এস সি পাশ ব্যাক্তি ছিলেন না।ইদানিংকালে শত প্রতিকূলতা এড়িয়ে দশাধিক ছেলেমেয়ে বিভিন্ন কলেজে পড়াশুনা করছে।সেই অর্থে এখন এই গ্রামে শিক্ষিতের হার ১% বললেও বেশি হবে।


স্বাভাবিকভাবে এলাকায় কুসংস্কার, অসচেতনতা, ঝগরা, ফ্যাসাদ লেগেই থাকে।যদিও ইদানিংকালে এর প্রকোপ বহুলাংশেই হ্রাস পেয়েছে।
এতগুলো নেতিবাচক অপসংস্কৃতির মধ্যে একটা শুদ্ধ সংস্কৃতি প্রচলিত আছে সহজ সরল মানুষগুলোর মধ্যে।কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে,এই শুদ্ধ সংস্কৃতিটাও আজ প্রায় হারিয়ে গেছে।


প্রিয় পাঠক আসুন জেনে নিই কেমন ছিল এই জনপদের শুদ্ধ সংস্কৃতি যা সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস আমার দীর্ঘদিনের।
দরিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত এই মানুষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে দেখা যায় গ্রামের কোন মেয়ের বিয়েতে।যৌতুকের ভয়ে যেখানে দেশের অন্যন্য অঞ্চলে কোন বাবা মেয়েকে বিয়ে দিতে পারছেনা,বিয়ে হলেও সংসার ঠিকছেনা,অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মত ঘঠনাও ঘঠে সেখানে এই গ্রামের লোকগুলোর মেয়েদের বিয়ে নিয়ে কোন ভয় ছিলনা।উলটো কোন মেয়ের বিয়ের আয়োজন মানেই ছিল উৎসব মূখর পরিবেশ।সারা গ্রামের লোকজন উপস্থিতি আর হইহোল্লোরে আপনি বুঝতেই পারবেন যে এদের কারো কারো মধ্যে কিছুদিন আগেও ঝগরা বেধেছিল।


তার মূল কারন হলো গ্রামের সবাই মিলে এক একটা মেয়েকে বিয়ে দেয়া হয়।একা যেন মেয়ের বাবার উপর বর কে দেয়া সব মালামালের বোঝা বইতে না হয় সেজন্য সবাই মিলে বিয়ের আগে দফায় দফায় মিটিং করে।বিয়ের দিন কি রান্না হবে,কে রান্না করবে,কে হলুদের স্টেজ সাজাবে,কে গেট সাজাবে,কে প্যান্ডেল সাজাবে কে কি উপহার দিবে তাই ঠিক করা হয় আগে থেকেই।অসম্ভব ভাল লাগার বিষয় ঠিক এই যায়গাতেই সবাই নিজ নিজ পছন্দমতো জিনিস উপহার দিচ্ছে অথচ সবার সতস্ফুর্ত।


আমি ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার কারনে নানা বাড়িতে থাকায় এই শুদ্ধ সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতাম না।ইদানিং গ্রামে থাকি।আর বাবা প্রবাসে থাকায় আমার পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে আমি প্রায় সময় এমন সভাতে উপস্থিত থেকে শুধু অবাক ই হয়েছি।লক্ষ করেছি যৌতুকের দেনার দায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মধ্যে নেই।


এভাবে কয়েক দফায় সাভ্যস্ত হওয়া সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিয়ের দিন বিয়ে বাড়িতে গ্রামের সবাই এক এক করে উপস্থিত হয়।কেউ কোন কারনে উপস্থিত হতে না পারলেও তার পক্ষ থেকে উপহারটা ঠিক পৌছে যায় কনের বাড়িতে।তারপর উৎসব আর আনন্দে শেষ হয় বিয়ের সমস্ত আয়োজন।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে,নানা অপসংস্কৃতি যুক্ত হলে এই শুদ্ধ সংস্কৃতি টা আজ প্রায় বিলীনের পথে।এখন আর কেউ কোন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার ডাকে সারা দেয়না।গ্রামের সবাই মেয়ের বিয়ে নিয়ে তেমন ব্যস্ত হয়না।সভ্যতার যাতাকলে যেন পিষ্ঠ এই শুদ্ধ সংস্কৃতি।

আমরা চাই এই শুদ্ধ সংস্কৃতি নয়, দূর হোক যৌতুক প্রথা,পিষ্ঠ হোক বরপক্ষের অহেতুক বায়না,বিলীন হোক শত অপসংস্কৃতির। বেঁচে থাকুক সব শুদ্ধ সংস্কৃতি।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com