করোনায় খাদ্য সংকট মোকাবেলায়

বস্তা পদ্ধতিতে সবজি চাষ

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০ | ১০:২৮ অপরাহ্ণ | 644 বার

বস্তা পদ্ধতিতে সবজি চাষ

কোভিড-১৯ যা করোনা ভাইরাস নামে পরিচিত – সাম্প্রতিক সময়ে আবিস্কৃত হওয়া একটি বৈশ্বিক দূর্যোগ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে প্রাদুর্ভাব হলেও বর্তমানে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই এই ভাইরাসে আক্রান্ত। বাংলাদেশেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত ১১ মার্চ করোনাভাইরাসকে বিশ্বব্যাপী ছড়ানো মহামারি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। কেউ কেউ এ ভাইরাসকে খোদায়ী গজব মনে করছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন চীনের জীবানু অস্ত্র এটা। কেউ আবার এ ভাইরাসকে করোনানবিক বোমা হিসেবে নামকরণ করছেন। যে কারনেই সৃষ্টি হোক বা  যে নামেই ডাকা হোক  না কেন। এ মহামারী যে গোটা বিশ্বকে মেচাকার করে দিচ্ছে এতে কারো দ্বিমত নেই।  করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে কি হতে যাচ্ছে আমরা কেউই জানিনা কিন্তু এটা জানি যে ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্রাকচার পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। সেই অবস্থা কিভাবে ফেস করতে হবে আমরা জানিনা।

তাইজন্যে আমাদেরকেও মনে করতে হবে, আমরাও ভয়াবহ বিপর্যস্থ হতে যাচ্ছি এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস যতটা না আগ্রাসী হবে তার চেয়ে বেশী আগ্রাসী হয়ে ওঠবে আমাদের ক্ষুধা। সবাই ঘরে থাকলে ফসল ফলবেনা, ফললেও সেটা আপনার বাড়িতে বা  ৮-১০ তালা উঁচু বাসাতে উড়ে আসবেনা। কেউ অভাবের তাড়নায় খেতে পারবেনা কেউ খাদ্য কেনার  অর্থ পকেট ভর্তি থাকার পরও কাঙ্খিত দ্রব্য পাবেনা। ফ্যাক্টরি বন্ধ মানে সব জিনিসের উৎপাদন বন্ধ থাকবে বা খুবই কমে যাবে। খাদ্য সঙ্কট মোকাবিলায় আমাদের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই।

বাংলাদেশের মানুষ প্রধানত ভাত, ডাল, শাক-সবজি, মাছ, মাংস ইত্যাদি খেয়ে বাঁচে। গত বোরো ও আমন মৌসুমে অনেক ভালো ধান উৎপাদন হয়েছে। দেশের চাহিদা পূরন করে উদ্বৃত্ত্বও আছে। মাঠে বর্তমানে বোরো ধান দন্ডায়মান আছে। কোনো প্রকার প্রাকৃতিক দূর্যোগ দেখা না দিলে এ ফসলও ভালো হবে আশা করি। করোনা পরিস্থিতি অবনতি হলেও আপাতত চালের সংকট দেখা দিবে না।

রবি মৌসুম শেষ হয়ে গেছে। বাজারে এখনও কিছু লেট জাতের রবি শস্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে আর বেশি দিন পাওয়া যাবেনা। এসময়ে স্বাভাবিক ভাবেই শাকসবজির ঘাটতি থাকে। চলমান মৌসুমে শাকসবজির চাষ করা একটু কষ্টসাধ্য। এ সময় রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, খরা, শিলাবৃষ্টিসহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগে থাকে। সেজন্য একটু সতর্কতার সাথে এ সময় বিভিন্ন শাক-সবজির চাষ করতে হয়।

সামনে আসছে পবিত্র রমজান মাস। রমজান মাসকে ঘিরে বাংলাদেশে শাক-সবজিসহ দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়মতান্ত্রিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তার উপর করোনাতঙ্কতো বাড়ছেই। ততদিনে হয়তো হিসেব শুরু হয়ে যাবে করোনায় অমুক গ্রামে কতজন, তমুক গ্রামে এতজন আক্রান্ত হয়েছে, মরেছে। অন্য দেশের খবর নেয়ার সময় হয়তো থাকবে না। তার উপর অভাবের করাল গ্রাস ছোবল মেরে বসতে পারে জনজীবনে। সরকারি-বেসরকারি, সামাজিক-ব্যক্তিগত ত্রাণ সহায়তা অনেকদিন পর্যন্ত চলমান থাকবে না। কারন আমাদের দেশ ইটালী-কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য বা অন্যসব উন্নত দেশের মতো সক্ষম নয়।

কৃষক বানিজ্যিকভাবে শাকসবজি উৎপাদনের ঝুঁকি নিবে না। নিলেও বিফল হতে পারে। কিন্তু মন্ত্রী-সাংসদ, কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক, জেলে-কৃষক, ইমাম-মুসল্লি, পাদ্রি-পুরোহিত, ধনী-গরিব সকলকেই বেঁচে থাকার জন্য খেতে হবে।

একবার চিন্তা করেনতো সে খাদ্যের যোগান আসবে কোথা থেকে! আমার টাকা আছে আমি ইচ্ছামত খরচ করবো এই ভাবনা কিভাবে করবেন! জমিতে ফসল ফলবেনা, ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন হবে না। আপনিতো টাকা খেয়ে বাঁচতে পারবেন না!

এর থেকে উত্তরণের জন্য বাংলার প্রতিটি ঘরে, ফ্ল্যাটে, বারান্দায়, ছাদে, কার্ণিশে, বাড়ির সামনে, পিছনে যেখানেই এতটুকু জায়গা পতিত পাওয়া যাবে সেটাকে কাজে লাগাতে হবে। পরিত্যক্ত বালতি, বোতল, টুকরি, বস্তা, টব, ক্যারেট প্রভৃতিতে ফলাতে হবে শাক-সবজি, আদা-মরিচ, পেঁয়াজ-রসুন ইত্যাদি। শতভাগ পারিবারিক চাহিদা মেটাতে নিজস্ব উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে।

লকডাউনের সময়টাকে কাজে লাগিয়ে আমরা ‘স্যাক কালটিভেশন’ বা বস্তা পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে আসন্ন বিপর্যের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারি। এতে বাসায় বন্দি বিষন্ন সময়গুলোকে উপভোগ্যও করে তুলতে পারি। এ সময়ে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি, গ্রীষ্মকালীন টমেটো, বরবটি, পটোল, শসা, ঝিঙ্গা, ঢেঁড়স, করলা, কাঁকরোল, চিচিংগা, গীমাকলমি, পুঁইশাক, পাটশাক, ডাটা, সজিনা, বিলাতি ধনিয়া, মিষ্টি আলু, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া এসবের চাষ করতে পারি।

বস্তা পদ্ধতিতে সবজি চাষ:

ছবি: সংগৃহিত

বস্তা পদ্ধতিতে সবজি চাষে প্রধান কাজটি হচ্ছে মাটি তৈরি। এটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের দেশের মাটি খুবই উর্বর। এ মাটিতে এমনিতেই বীজ ফেলে রাখলে হয়ে যায়। কোনো রকম পরিকল্পিত পরিচর্যা লাগেনা। মাঠ কিংবা জমির উপরের স্তরের ‘এক কোদাল মাটি’, অর্থাৎ এক কোপে যতটা গভীর পর্যন্ত কোদাল যেতে পারে (চার-ছয় ইঞ্চি গভীর), সেই মাটি সংগ্রহ করতে হবে৷ বর্তমান মৌসুম মাটি সংগ্রহ করার খুবই উপযোগি।

শুরুতে আনুমানিক ৩০ কেজি মাটিকে গুড়ো করে তার সঙ্গে পরিমাণ মতো জৈবসার (পঁচা গোবর, হাঁস-মুরগির পঁচা বিষ্ঠা, গুড়ো খৈল) ও রাসায়নিক সার (ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, বোরণ) মিশাতে হবে। এরপর সিনথেটিক বস্তা বা ব্যাগের (সিমেণ্ট কিংবা মাছ-মুরগির ফিড, সারের পরিষ্কার বস্তা, বাজারের ব্যাগ) মুখ পর্যন্ত বস্তার তিন ভাগ মাটি ভরতে হবে। বস্তা প্রায় তিন ফুট উঁচু করতে হবে। কয়েক দিন পর তাতে লাউ, উচ্ছে, করলা, ঝিঙে, পুঁইশাক, মরিচ, আদা, বরবটি, মিষ্টি কুমড়া, রসুন, পিঁয়াজ ও পেঁপেসহ আপনার পছন্দ মতো বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজির বীজ বপন বা চারা রোপণ করে দিন।

চারা না পাওয়া গেলে বীজ বপন করতে হবে। এক্ষেত্রে ফসলভেদে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বীজ পানিতে ভিজিয়ে নিতে হবে। পরে বীজের পানি ঝড়িয়ে নিতে হবে। বস্তার উপরের মাটি নিড়ানি দিয়ে নাড়িয়ে বীজ ২-৩ ইঞ্চি গভীরে বুনে দিতে হবে।

তারপর বীজের চারপাশে বীজ থেকে তিন ইঞ্চি দূরে, মাটির দুই ইঞ্চি গভীরে শুকনো মরিচের গুঁড়ো দিতে হবে। যা বীজের সুরক্ষায় কীটনাশক হিসেবে কাজ করবে। এভাবে থাকা অবস্থায় বীজ গজানো পর্যন্ত পরিমাণমতো পানি সেচ দিতে হবে। অঙ্কুরিত বীজের (মাটির ওপর স্টেম কিংবা সুট সিস্টেমে) কচি পাতা দেখা যাবে। তিন-চারটি পাতা গজানোর পর, জৈব সার মিশিয়ে শুকনো মাটি গাছের চারপাশে যত্ন করে দিতে হবে৷ মাসখানেক পরে পঁচানো সরিষার খৈলের উপরের পানি বা ভার্মি কম্পোস্ট মিশ্রিত পানি পরিমাণ মতো দিন। নিয়মিত স্বাভাবিক সেচ দিন৷ 

৪০ থেকে ৪৫ দিনের মাথায় আপনার কষ্ট সার্থক হয়ে যাবে। ফলন শুরুর আগে কিংবা পরে, গাছের পাতা কুঁকড়ে গেলে, পোকা-মাকড় আক্রমণ করলে ভেজানো শুকনো মরিচের গুঁড়ো পানিতে মিশিয়ে বা নিম পাতা বেটে তার রস কাপড়ে ছেঁকে, তার সঙ্গে যেকোনো শ্যাম্পু বা ডিটার্জেন্টের গুড়ো সামান্য পরিমাণ পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে পারেন। এতে  পোকা-মাকড়ের হাত থেকে গাছ রক্ষার পাবে। কোনো রোগ দেখা দিলে চুন ও তুঁতে দিয়ে বোর্দোমিক্সার তৈরি করে স্প্রে করতে পারেন।

আপনার নিজের ফলানো সামান্য শাক-সবজি সংকটকালীন সময়ে অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে ওঠবে। পারিবারিক পুষ্টি পূরণ ও খাদ্যের যোগান ‍দিতে  অবদান রাখবে। দেরী না করে আজই কাজে নেমে পড়ুন।

  • লেখক:
  • এ. কে. আজাদ ফাহিম, উপসহকারী কৃষি অফিসার, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com