বালাইনাশক ব্যবহারে ভারসাম্যহীনতা

সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮ | ৯:৩৩ অপরাহ্ণ | 1378 বার

বালাইনাশক ব্যবহারে ভারসাম্যহীনতা

ফসলের রোগবালাই ও ক্ষতিকর কীট প্রতিরোধে সারা বিশ্বে পাঁচ ধরনের বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়— ইনসেকটিসাইড, ফাঙ্গিসাইড, হারবিসাইড, মিটিসাইড ও রোডেনটিসাইড। এর মধ্যে ইনসেকটিসাইডের (কীটনাশক) গড় ব্যবহার মাত্র ২২ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে এ হার ৩৯ শতাংশ, যা বৈশ্বিক ব্যবহার মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। বালাইনাশকের এমন ভারসাম্যহীন ব্যবহার প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য হুমকির পাশাপাশি কৃষকের স্বাস্থ্য ঝুঁকিরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (বিসিপিএ) সূত্রে জানা গেছে, দেশে গত আট বছরে মোট ৪ লাখ ২২ হাজার ৬৬৬ টন বালাইনাশক ব্যবহার হয়েছে। এর মধ্যে ইনসেকটিসাইডের পরিমাণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৬ টন, যা মোট ব্যবহূত বালাইনাশকের প্রায় ৩৯ শতাংশ।

দেশে মূলত তিন ধরনের ইনসেকটিসাইডস আমদানি করা হয়— গ্রানুলার, লিকুইড ও পাউডার। গত আট বছরে ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৩১ দশমিক ৫৭ টন গ্রানুলার ইনসেকটিসাইড, ৩৬ হাজার ৯০৯ দশমিক ৫০ টন লিকুইড ইনসেকটিসাইড ও ৯ হাজার ৪৯৫ দশমিক ৩৫ টন পাউডার ইনসেকটিসাইড ব্যবহার করা হয়েছে।

এসব কীটনাশক প্রাণ-প্রকৃতির কম-বেশি ক্ষতি করছে বলে জানান ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর অর্গানিক এগ্রিকালচার মুভমেন্টের (আইএফওএম) সদস্য ও বাংলাদেশ জৈব কৃষি নেটওয়ার্কের (বিওএএন) সাধারণ সম্পাদক ড. মো. নাজিম উদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বালাইনাশকের ভারসাম্যহীন ব্যবহারের কারণে অর্থের অপচয় হচ্ছে ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া কীটনাশক ব্যবহারের কারণে নদী-নালা ও অন্যান্য জলাধারে এখন আগের মতো ছোট মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যপণ্য সরবরাহ করতে না পারলে জনমিতির (পপুলেশন ডিভিডেন্ড) যে সুবিধা রয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে পারব না আমরা। কৃষিতে বালাইনাশকের প্রয়োজন হলে বায়োপেস্টিসাইডসের ব্যবহার বাড়াতে হবে। সারা বিশ্বে যে জৈব কৃষির প্রচলন হচ্ছে, সেটি কার্যকরভাবে দেশে চালু করতে হবে।

দেশে ইনসেকটিসাইড ছাড়া অন্য বালাইনাশকের মধ্যে ফাঙ্গিসাইড আমদানি করা হয় দুভাবে— ফাঙ্গিসাইড জেনারেল ও ফাঙ্গিসাইড সালফার। গত আট বছরে দেশে ৪৯ হাজার ৭১১ দশমিক ৬৭ টন ফাঙ্গিসাইড জেনারেল ও ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪২ দশমিক ৪০ টন ফাঙ্গিসাইড সালফার আমদানি হয়েছে। অন্যদিকে ৩৮ হাজার ৭১১ দশমিক ৭০ টন হার্বিসাইড, ৮২৫ দশমিক ৮৪ টন মিটিসাইড ও ৬৩৮ দশমিক ১ টন রোডেনটিসাইড আমদানি হয়েছে।

শস্যের প্রবৃদ্ধিতে গতি আনতে বাড়ানো হচ্ছে শস্যের নিবিড়তা। এটি করতে গিয়ে ফসলে রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ক্ষেতে অতিমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ করছেন কৃষক। দানাদার শস্যের পাশাপাশি কীটনাশকের প্রয়োগ হচ্ছে শাকসবজিতেও। এতে সার্বিকভাবে বাড়ছে ফসলে বিষের ব্যবহার। তবে শস্য আবাদ এবং পোকা দমনে ভুল পদ্ধতি প্রয়োগের কারণেই কীটনাশকের ব্যাপকতা বাড়ছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক কৃষির সমন্বয়ক দেলোয়ার জাহান। তিনি বলেন, জমির বালাইগুলোকে ধ্বংস না করে বরং প্রতিরোধ করার মানসিকতা তৈরি হলে এগ্রো ইকোলজি ঠিক রাখা সম্ভব। পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার জন্য প্রাকৃতিক উপায় রয়েছে। বালাইনাশকের বিকল্প যেসব পথ ও উপায় রয়েছে, সেগুলোকে কৃষকের মধ্যে সম্প্রসারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) আরো অধিক কার্যকর করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফসলের জমিতে মূলত দুই শ্রেণীর পোকার আক্রমণ হয়। শস্যের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে এক ধরনের পোকা আক্রমণ করে। আরেক ধরনের পোকা শস্যের কাণ্ড, ডগা কিংবা দানা থেকে রস খাওয়ার জন্য ক্ষেতে আক্রমণ করে। গন্ধে আকৃষ্ট পোকার জন্য ক্ষেতের আইলে বা আশপাশে নানা ধরনের বিকট গন্ধযুক্ত ছোট গাছপালা, বিশেষ করে ছোট ছোট বুনো তামাক লাগানো যেতে পারে। অন্যদিকে যেসব পোকা রস খেতে আসে, সেটি রোধের জন্য যত তিতাযুক্ত ফল রয়েছে, সেগুলোর রস জমিতে স্প্রে করা যেতে পারে। পাশাপাশি একই এলাকায় একই ধরনের শস্যের আবাদ করলে বিশেষ পোকার আক্রমণ আসতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট এলাকায় শস্য আবাদে বৈচিত্র্য আনা গেলে পোকার আক্রমণ কম হবে।

দেশের শস্যক্ষেতে ৬০৭ ধরনের পোকা দেখা গেছে। এর মধ্যে মাত্র ২৩২টি বা ৩৮ শতাংশ পোকা ফসলের জন্য ক্ষতিকর। বাকি সব কীটপতঙ্গ বা পোকা ফসলের জন্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপকারী। এর মধ্যে ১৮৩টি বা ৩০ দশমিক ১৫ শতাংশ পোকা সরাসরি ফসলের জন্য উপকারী। আর ১৯২টি বা ৩১ দশমিক ৬৩ শতাংশ পোকা ক্ষতিকর পোকা খেয়ে বা পরজীবী ও পরভোজী হিসেবে ফসলের উপকার করে। কিন্তু নির্বিচার কীটনাশকের ব্যবহারে উপকারী এসব পোকাও ধ্বংস হচ্ছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিএই) কৃষিবিদ মোহাম্মদ মহসীন বলেন, উপকারী পোকা রক্ষা করা ছাড়াও অবাধে কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে কৃষক প্রশিক্ষণ ছাড়াও বিকল্প পদ্ধতি ও প্রযুক্তি কৃষকের মাঝে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার কমেছে। আমরা আইপিএম প্রকল্প ছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিষমুক্ত ও কীটনাশকমুক্ত শাক-সবজি ও ফল আবাদের পদ্ধতি কৃষকের মাঝে পৌঁছে দিচ্ছি। ফেরোমেন ফাঁদ, জৈব বালাইনাশক এবং নতুন প্রযুক্তিগুলো জনপ্রিয় করছি। তাছাড়া শস্য আবাদে কীট ও পোকার আক্রমণ কম হবে এমন জাত উন্নয়নে গবেষণা করছে। নতুন কিছু জাতও উন্নয়ন করা হচ্ছে। কঠিন সাজার ব্যবস্থা রেখে এ-সংক্রান্ত আইন করা হয়েছে। এসবের সঠিক ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত হলে সামনের দিনে কীটনাশকের ব্যবহার আরো কমে আসবে।

দেশে এখন তিন ও চার ফসলি জমির ব্যবহার বাড়ার কারণে বালাইনাশকের চাহিদা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিসিপিএর সভাপতি কৃষিবিদ একেএম আজাদ। তিনি বলেন, আগে দানাদার খাদ্যশস্যগুলোয় বালাইনাশকের ব্যবহার হলেও এখন প্রায় সব ধরনের সবজি ও অন্যান্য শস্যে ব্যবহার হচ্ছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের রোগ ও পোকার আক্রমণ হচ্ছে। পাশাপাশি আগাছাও জন্মাচ্ছে জমিতে। সেগুলো মোকাবেলায় বালাইনাশকের কোনো বিকল্প নেই। দেশে হঠাৎ করে ব্লাস্টের আক্রমণ হয়। সেটিও বালাইনাশকের মাধ্যমে কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে দেশে এখনো এটির ব্যবহার সহনীয় পর্যায়ে। সেটি ধরে রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম ও বিধি মেনেই যেমন বিপণন করা হচ্ছে, পাশাপাশি কৃষককেও সচেতন করা হচ্ছে।

সূত্রঃ বণিকবার্তা

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com