বিপ্লবী কালেমা – নঈম সিদ্দিকী

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ | 101 বার

বিপ্লবী কালেমা – নঈম সিদ্দিকী

এ কথা ভাববার কোনই অবকাশ নেই যে, বিশ্বনবী সা. কোন আকীদা- বিশ্বাস, মতাদর্শ, বা পরিকল্পনা ছাড়াই সংস্কার ও বিনির্মাণের কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। তিনি নিছক একটা অস্পস্ট চেতনা, লক্ষ্যহীন আবেগ এবং অপরিপক্ক উন্মাদনা দ্বারা তাড়িত হয়ে এ কাজ শুরু করেননি। বরং তিনি মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যের মশাল হাতে নিয়ে ময়দানে নেমেছিলেন।

তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল মন নিয়ে বছরের পর বছর ধরে জীবনের সমস্যাবলী নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। হেরা গুহার নির্জন প্রকোষ্ঠে দীর্ঘকাল ব্যাপী নিজের অন্তর্জগত ও বহির্জগত নিয়ে ধ্যান করেছেন। সভ্যতার কল্যাণ ও অকল্যাণ কিসে হয়, তার নীতিমালা বুঝবার জন্য তিনি অনেক মাথা ঘামিয়েছেন। কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপ ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করেননি, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ পাক তাঁর হৃদয়কে সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত করে দিয়েছেন এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সত্য তাঁর সামনে উদঘাটিত হয়েছে। সেই শ্রেষ্ঠতম সত্য হলো, মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা ও প্রভু আছেন এবং মানুষ তাঁরই গোলাম ও দাস। এই সত্য কালেমাই ছিল বিশ্বনবীর সা. সূচিত বিপ্লবের বীজ। এই বীজ থেকেই জন্ম নিয়েছিল সৎ জীবন ও নিষ্কলুষ সভ্যতার সেই পবিত্র বৃক্ষ, যার শেকড় মাটির অনেক গভীরে উপ্ত এবং যার ডালপালা উচ্চ আকাশে বিস্তৃত।

বিশ্বনবীর সা. ঘোষিত এই কালেমা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিপ্লবাত্মক কালেমা। আমরা সবাই জানি, এই কালেমা হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। শাব্দিকভাবে এটা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। কিন্তু অর্থের দিক দিয়ে অত্যন্ত গভীর। “এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই”। তিনিই একমাত্র ‘ইলাহ’।

ইলাহ সেই শক্তি বা সত্তাকে বলা হয়, যার গোলামী করা যায়, যার জন্য মানুষ নিজেকে ও নিজের যথাসর্বস্বকে অকাতরে উৎসর্গ করতে পারে, যার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে উপাসনা করে, যার সর্বাত্মক প্রশংসা, গুণগান, পবিত্রতা ঘোষণা ও বন্দনা করে। যার জন্য মান্নত মানে, যার কাছে সর্ব প্রকারের কল্যাণের আশা করে, যার পাকড়াওকে ভয় করে, যার কাছে সৎকাজের পুরস্কারের আশা ও অসৎকাজের শাস্তির আশংকা করে, যাকে নিজের নিরংকুশ মালিক মোখতার মনে করে, যাকে শাসক ও আইনদাতা মানে, যার আদেশ অনুযায়ী কাজ করে ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকে, যার দেয়া নীতিমালাকে নিজের জীবনের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, যার হালাল ও হারামের বিধিকে বিনা বাক্য ব্যয়ে কার্যকরী করে, যাকে নিজের জন্য হেদায়াতের উৎস মনে করে, যার ইচ্ছা ও মর্জী অনুযায়ী জীবন বিধান তৈরী করে, যার প্রিয়জনদের সম্মান ও বিরোধীদেরকে প্রত্যাখ্যান করে এবং যার সন্তুষ্টি অর্জন তার জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পরিণত হয়। একটি মাত্র শব্দ ইলাহের মধ্যে এই ব্যাপক তাৎপর্য নিহিত ছিল।

মানব সমাজ ইলাহর এই অধিকারগুলোকে এক আল্লাহর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ভাগ বাটোয়ারা করে রেখেছিল। ফলে সমাজ ও সভ্যতার বিভিন্ন স্তরে জেঁকে বসেছিল অসংখ্য ইলাহ। মানুষের নিজের প্রকৃতি ও তার কামনা বাসনা, পরিবার ও গোত্রের রসম রেওয়াজ, বর্ণ, বংশ ও জাতিগত সংঘবদ্ধতার ঐতিহ্য, জমিদার ও ধর্মযাজকদের আধিপত্য, রাজপরিবার ও পরিষদবর্গের দাম্ভিকতা ইত্যাদি তাদের ইলাহ হয়ে বসেছিল। এসব ইলাহর নাম নিয়ে সমাজের এক শ্রেণী অপর শ্রেণীকে শাসন শোষণ করতো, লুটে পুটে খেত।

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”( আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই”। কথাটা এই সমস্ত খোদার খোদায়ীর ওপর একই সাথে প্রচন্ড আঘাত হানতো। এই কালেমার উচ্চারণকারী প্রকারান্তরে এ কথাই ঘোষণা করতো যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রভুত্ব আমি মানিনা, কারো কর্তৃত্ব ও আধিপত্য মানিনা, কারো রচিত আইন কানুন আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কারো অর্জিত অতিমানবীয় অধিকার বৈধ নয়, কারো সামনে মাথা নোয়ানো হবেনা, কারো সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির তোয়াক্কা করা হবেনা, কারো আঙ্গুলের ইশারায় জীবন চলবেনা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল খোদার খোদায়ী ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়া হবে। বস্তুত, এই কালেমা ছিল মানুষের প্রকৃত স্বাধীনাতার ঘোষণা।

এই কালেমার দ্বিতীয় অংশে এই মর্মে অংগীকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যে, মানবজাতির হেদায়াত তথা মুক্তি ও কল্যাণের পথের সন্ধান দান এবং সভ্যতা ও সংস্কার সংশোধনের একমাত্র পথ হলো আল্লাহর প্রেরিত নবী ও রসুলগণের দেখানো পথ। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় আসল ও নির্ভুল জ্ঞানের একমাত্র উৎস হলো ওহী। এ থেকেই মানবীয় বিবেক চিন্তা করার মূলনীতি কী জানতে পারে। মুহাম্মাদ সা. রিসালাতের এই ধারাবাহিকতার পূর্ণতাদানকারী সর্বশেষ নবী ও রাসূল। জীবনের সঠিক পথের সন্ধান তাঁর কাছ থেকেই নিতে হবে এবং তাঁর নেতৃত্বেই বিশ্ব মানবতা কল্যাণ ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম।

এই কালেমার এই গুরুত্বের কারণেই তার স্বীকৃতি ইসলাম গ্রহণের পয়লা শর্তে পরিণত হয়েছে। এই কালেমাকে মুয়াযযিনগণ আযান দেয়ার সময় উচ্চ স্বরে পাঠ করে থাকে এবং তাকে শ্রেষ্ঠ যিকির বলে আখ্যায়িত ও নামাযের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

রাসূল সা. এর এই বিপ্লবাত্মক কালেমা যার অন্তরেই প্রবেশ করেছে, তার ভেতরে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এ কালেমা যার জীবনেই ঢুকেছে, তার নকশা পাল্টে গেছে। এ বীজ থেকে নতুন মানুষ জন্মগ্রহণ করেছে এবং লালিত পালিত ও বিকশিত হয়েছে।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com