বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে করণীয়

শনিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২:৫৮ অপরাহ্ণ | 2229 বার

বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে করণীয়
বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে করণীয়

বেগুন বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় সবজি। এর আগে শুধু রবি মৌসুমে চাষ হলেও এখন সরই বেগুন চাষ হয়। দেশে সবজি চাষের আওতায় যে পরিমাণ জমি রয়েছে তার শতকরা ১৫ ভাগ জমিতে বেগুন চাষ হয়। বেগুন চাষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিন্তা করা হয় ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ। এটি বেগুনের সর্বাধিক ক্ষতিকর পোকা। এ পোকার আক্রমণে ক্ষেত্র বিশেষে ৮৫ ভাগ পর্যন্ত ফলনের ক্ষতি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ পোকার আক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শীতের শেষে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ পোকার আক্রমণ ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ক্ষতির লক্ষণ : সাধারণত চারা রোপণের ৪-৫ সপ্তাহ পর এ পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। এ কিড়া বা লার্ভা ফল ধরার আগে কচি ডগা ও পাতার বোঁটায় ছিদ্র করে ভেতরে ঢোকে এবং সেখান থেকে খেয়ে খেয়ে বড় হতে থাকে। এতে আক্রান্ত ডগা ও পাতা ধীরে ধীরে ঢলে পড়ে। কিছুদিনের মধ্যে আক্রান্ত ডগাগুলো শুকিয়ে আসে এবং পাশ থেকে নতুন শাখা-প্রশাখা বের হয়। গাছে ফুল-ফল আসার পর ডগার তুলনায় ফুল-ফলে এ পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত ফলের গায়ে ছিদ্র হয় এবং ওই ছিদ্র পথে কিড়ার মল ও কিড়া বের হতে দেখা যায়। বেশি মাত্রায় আক্রান্ত হলে ফল পচতে থাকে এবং ঝরে পড়ে। গ্রীষ্মকালে এ পোকা বেশি সক্রিয় থাকে। সাধারণত শীতের শেষে যখন তাপমাত্রা ও আদ্রতা বাড়তে থাকে তখন এ পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়।

কৃষক ভাইদের করণীয় : আমাদের দেশের কৃষক ভাইরা এ পোকা দমনের জন্য অতিমাত্রায় রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভর করে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের কৃষক ভাইদের একটি বড় অভিযোগ হলো তারা কীটনাশক প্রয়োগ করেও এসব পোকামাকড় দমন করতে পারছেন না। যার দরুন একদিকে ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ফসল উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আবার সবজি ফসলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এ সমস্যা উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা একটি পরিবেশবান্ধব আইপিএম প্যাকেজ প্রণয়ন করেছেন।

নিরাপদ ফসল উৎপাদনে আইপিএম প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত দমন ব্যবস্থাগুলো হলো- রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার, যান্ত্রিক দমন, জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহার, জৈব বালাইনাশক ব্যবহার, উপকারী পোকা-মাকড়ের ব্যবহার, সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ পদ্ধতি প্রভৃতি। আইপিএম ব্যবস্থাপনায় কার্যকরভাবে ক্ষতিকর পোকা-মাকড় দমন করা যায়।

আইপিএম প্যাকেজ:
১। গাছের আক্রান্ত অংশ ধ্বংস করা : চারা রোপণের ১৫ দিন পর থেকে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১-২ বার অবশ্যই সরেজমিন বেগুন ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে। একই সঙ্গে রোগাক্রান্ত ডগা ও ফল হাত দিয়ে সংগ্রহ করে জমি থেকে দূরে মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এতে গাছের আক্রান্ত অংশগুলোই বিদ্যমান পোকার কিড়া বা লার্ভাগুলো মারা যায় এবং জমিতে পোকার আক্রমণ কমে আসে।

২। সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার : বেগুনের এ পোকা দমনের জন্য সেক্স ফেরোমন ফাঁদ এখন বাজারে সহজলভ্য। প্রতি ১০ বর্গমিটার এলাকার জন্য একটি ফাঁদ গাছের উচ্চতার ওপর খুঁটি দিয়ে স্থাপন করতে হবে। চারা লাগানোর ৪-৫ সপ্তাহ পর ফাঁদ স্থাপন করতে হবে এবং ৫০-৬০ দিন পর ফাঁদ পরিবর্তন করে দিতে হবে। সেক্স ফেরোমন ফাঁদ পুরুষ পোকগুলোকে আকৃষ্ট করে। পরে পুরুষ পোকাগুলো আটকা পড়ে ও মারা যায়। এতে এ পোকার প্রজনন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় এবং পোকার আক্রমণ কমে আসে। ইস্পাহানী বায়োটেকসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সেক্স ফেরোমন ফাঁদ বাজারজাত করছে। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকেও কৃষকদের এ ফাঁদ সরবরাহ করা হয়।

৩। উপকারী পোকার ব্যবহার : ট্রাইকোগ্রামা ও ব্রাকন নামক দুটি উপকারী পোকা ব্যবহার করে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা যায়। ট্রাইকোগ্রামা পোকার ডিমগুলো খেয়ে ফেলে আর ব্রাকন পোকার লার্ভাগুলো খায়। সম্প্রতি কিছু এনজিও এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কৃষকদের এ পোকাগুলো সরবরাহ করছে। কৃত্রিমভাবে জমিতে এ দুটি উপকারী পোকা ছড়িয়ে দিলে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কমে আসে। এ ক্ষেত্রে ক্ষেতে হেক্টরপ্রতি ১ গ্রাম ট্রাইকোগ্রামা এবং ৮০০-১২০০টি ব্রাকন উপকারী পোকা পর্যায়ক্রমে ছাড়তে হবে।

৪। কীটনাশক ব্যবহার : আইপিএম প্যাকেজে সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে কীটনাশক স্প্রে করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে একই কীটনাশক ক্রমাগত ব্যবহারের কারণে এ পোকা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে অনেক কীটনাশকই কাজ করছে না। এ ক্ষেত্রে ভলিউম ফ্লেক্সি প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি করে মিশিয়ে ৭ দিন অন্তর অন্তর স্প্রে করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। অথবা প্রোক্লেইম ৫ প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম করে মিশিয়ে ৭ দিন অন্তর অন্তর স্প্রে করতে হবে।

তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, এক সপ্তাহে ভলিউম ফ্লেক্সি ব্যবহার করলে পরবর্তী সপ্তাহে প্রোক্লেইম ব্যবহার করতে হবে। এভাবে পরিবর্তন করে কীটনাশক ব্যবহার করলে কৃষক ভাইরা ভালো সুফল পাবেন। এছাড়া ট্রেসার প্রতি লিটার পানিতে ৪ মিলি করে অথবা মার্শাল ২০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি করে মিশিয়ে স্প্রে করা যায়। খেয়াল রাখতে হবে প্রতি সপ্তাহে একবার জমি থেকে বেগুন সংগ্রহ করার পর কীটনাশক স্প্রে করতে হবে।
একমাস বয়স থেকে নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করলে এ পোকার আক্রমণ সফলভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

স্বাস্থ্যসম্মত এবং পরিবেশবান্ধব সবজি উৎপাদনের জন্য আইপিএম প্যাকেজ একটি লাগসই প্রযুক্তি। দিন দিন দেশে এবং দেশের বাইরে বাংলাদেশের সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে নানারকম ক্ষতিকর পোকা-মাকড়ের আক্রমণ। আইপিএম পদ্ধতি ব্যবহার করে ক্ষতিকর পোকা-মাকড় দমন করা যায় এবং গুণগত মানসম্পন্ন সবজি উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়।

লেখক : আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ, সহকারী অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

কৃষি মন্ত্রনালয়ে ১১-২০তম গ্রেডে বিভিন্ন পদে নিয়োগ
শম্ভুগঞ্জ এর মোমেনশাহী এটিআই এ প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পূনর্মিলনী অনুষ্ঠিত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ১০৮১ জন নিয়োগ
সারাবছর চাষযোগ্য পেঁয়াজ বারি-৫, ফলন তিনগুন বেশি

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com