লাউয়ের চাষাবাদ – ২য় পর্ব

রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ | 913 বার

লাউয়ের চাষাবাদ – ২য় পর্ব

লাউয়ের চাষাবাদ -২য় অংশ

[লাউয়ের চাষাবাদ লিখাটি পাঠ ও প্রকাশের সুবিধার্থে ২টি পর্বে ভাগ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আজ থাকছে লাউয়ের পোকামাকড় ও রোগবালাই আক্রমন লক্ষন, করনীয় ও দমন নিয়ে ২য় পর্ব। ১ম পর্বে ছিল লাউয়ের চাষাবাদ কৌশল নিয়ে।]

ক্ষতিকর পোকামাকড়ঃ

লাউয়ের মাছি পোকাঃ
এ পোকা লাউয়ের ফলের মধ্যে প্রথমে ডিম পাড়ে, পরবর্তীতে ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের ভেতরে খেয়ে নষ্ট করে ফেলে।

দমন ব্যবস্থাঃ
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ :
মাছি পোকর কীড়া আক্রান্ত ফল দ্রুত পচে যায় এবং গাছ হবে মাটিতে ঝরে পড়ে। পোকা আক্রান্ত ফল কোনোক্রমেই জমির আশেপাশে ফেলে রাখা উচিত নয়। পোকা আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেললে মাছি পোকার বংশবৃদ্ধি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।

সেক্স ফেরোমনঃ
কিউলিওর নামক সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণে মাছিপোকার পুরুষ পোকা আকৃষ্ট করা সম্ভব। পানি ফাঁদের মাধ্যমে ওই ফেরোমন ব্যবহার করে আকৃষ্ট মাছি পোকাগুলোকে মেরে ফেলা যায়।

বিষটোপঃ
বিষটোপ ফাঁদে পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী ও পুরুষ মাছি পোকা আকৃষ্ট হয় এবং ফাঁদে পড়ে মারা যায়। ১০০ গ্রাম পাকা মিষ্টি কুমড়া কুচি কুচি করে কেটে তা থেঁতলিয়ে ০.২৫ গ্রাম মিপসিন ৭৫ পাউডার অথবা সেভিন ৮৫ পাউডার এবং ১০০ মিলি পানি মিশিয়ে ছোট একটি মাটির পাত্রে রেখে তিনটি খুঁটির সাহায্যে এমনভাবে স্থাপন করতে হবে যাতে বিষটোপের পাত্রটি মাটি থেকে ০.৫ মিটার উঁচুতে থাকে। বিষটোপ তৈরির পর ৩-৪ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করে তা ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে তৈরি বিষটোপ ব্যবহার করতে হয়। সেক্স ফেরোমন ও বিষটোপ ফাঁদ কুমড়া জাতীয় ফসলের জমিতে ক্রমানুসারে ১২ মি. দূরে দূরে স্থাপন করতে হবে।

পামকিন বিটল :
পামকিন বিটলের পূর্ণ বয়স্ক পোকা চারাগাছের পাতায় ফুটো করে এবং পাতার কিনারা থেকে খেতে খেতে সম্পূর্ণ পাতা খেয়ে ফেলে এবং বয়স্ক গাছের পাতার শিরা উপশিরা গুলো রেখে সম্পূর্ণ সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। এ পোকা ফুল ও কচি ফলেও আক্রমণ করে। এদের কীড়া শিকড় বা মাটির নিচে থাকা কা- ছিদ্র করে ফলে গাছ ঢলে পড়ে এবং পরিশেষে শুকিয়ে মারা যায়।

দমন ব্যবস্থাঃ
১. চারা অবস্থায আক্রান্ত হলে হাত দিয়ে পূর্ণবয়স্ক পোকা ধরে মেরে ফেলতে হবে।
২. ক্ষেত সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।
৩. চারা বের হওয়ার পর থেকে ২০-২৫ দিন পর্যন্ত মশারির জাল দিয়ে চারাগুলো ঢেকে রাখলে এ পোকার আক্রমণ থেকে চারাগুলো বেঁচে যায়।
৪. আক্রমণের হার বেশি হলে চারা গজানোর পর প্রতি মাদার চারদিকে মাটির সঙ্গে চারাপ্রতি ২-৫ গ্রাম অনুমোদিত দানাদার কীটনাশক (কার্বফুরান জাতীয় কীটনাশক) মিশিয়ে গোড়ায় পানি সেচ দেয়।

রোগবালাইঃ

মোজাইকঃ
চারা অবস্থায় বীজ গজানোর পর বীজপত্র হলুদ হয়ে যায় এবং পরে চারা নেতিয়ে পড়ে। বযস্ক গাছের পাতায় হলুদ-সবুজ ছোপ ছোপ মোজাইকের মতো দাগ দেখা যায়। দাগগুলো অসম আকারের। দ্রুত বড় হয়। আক্রান্ত পাতা ছোট, বিকৃত ও নিচের দিকে কোকড়ানো, বিবর্ণ হয়ে যায়। শিরা-উপশিরাও হলুদ হয়ে যায়। ফুল কম আসে এবং অধিক আক্রমণে পাতা ও গাছ মরে যায়। আক্রান্ত ফল বেঁকে যায় ও গাছের কচি ডগা জটলার মতো দেখায়। ফলের উপরি অংশ এবড়ো-থেবড়ো দেখা যায়।

প্রতিকার ব্যবস্থাঃ
১. আক্রান্ত গাছ দেখলেই প্রাথমিকভাবে তা তুলে ধ্বংস করা। ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার রাখা।
২. ক্ষেতে বাহক পোকা উপস্থিতি দেখা দিলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করে তা দমন করা।
৩. রোগাক্রান্ত গাছ থেকে কোনো বীজ সংগ্রহ ও ব্যবহার না করা।

লাউয়ের ব্লোজম এন্ড রট রোগঃ

রোগ আক্রমণের লক্ষণ:
আক্রান্ত গাছে প্রথমে কচি লাউয়ের নিচের দিকে পঁচন দেখা দেয়। ধীরে ধীরে পুরো ফলটিই পঁচে যায় । সাধারণত আম্লীয় মাটিতে বা ক্যালসিয়ামের অভাব আছে এমন জমিতে এ রোগ দেখা যায়।

বি. দ্র. অনেক সময় ফলের মাছি পোকার আক্রমণেও এরকম পঁচন দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে আক্রান্ত ফলটি কাটলে কীড়া দেখতে পাওয়া যায়।

আক্রমণের আগে করণীয়ঃ
১. অম্লীয় বা লাল মাটির ক্ষেত্রে জমিতে শতাংশ প্রতি চার কেজি হারে ডলোচুন প্রয়োগ করা
২. মাটি পরীক্ষা করে জমিতে সুষম সার ব্যবহার করা।
৩. একই জমিতে বার বার একই সবজি আবাদ করবেন না।

আক্রমণ হলে করণীয়ঃ
১. ক্ষেতে পরিমিত সেচ দেয়া ।
২. গর্ত বা পিট প্রতি ৫০ থেকে ৮০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করা ।
লাউয়ের ঢলে/নেতিয়ে পড়া রোগঃ এটি লাউয়ের মারান্তক একটি রোগ। সতেচ গাছের ডগা হতে হঠাৎ নেতিয়ে পড়ে।

রোগ আক্রমণের লক্ষণ:
এ রোগ হলে গাছের পাতা হলদে হয়ে শুকিয়ে যায়, ধীরে ধীরে গাছ ঢলে পড়ে এবং মারা যায়।
আক্রমণের আগে করণীয়ঃ
১. পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ
২. চারা গজানোর পর অতিরিক্ত সেচ না দেওয়া
৩. মাদার মাটি শোধন করা (ফরমালিন দ্বারা)
৪. মাদায় ট্রাইকোডারমা ভিড়িডি ৩০ গ্রাম ৫০০ গ্রাম গোবরের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা
৫. বপনের পূর্বে বীজ শোধন করা (ভিটাভেক্স-২.৫ গ্রাম বা ব্যাভিষ্টিন- ২ গ্রাম প্রতি কেজী বীজ)ট্রাইকোডারমা ভিড়িডি (৩-৪ গ্রাম/ কেজী বীজ) দ্বারা শোধন করা।
৬. চাষের পূর্বে জমিতে শতাংশ প্রতি ১ কেজি ডলোচুন প্রয়োগ করে জমি তৈরী করা।
৭. একই জমিতে পর পর বার বার লাউ চাষ করবেন না।

আক্রমণ হলে করণীয়ঃ
# আক্রান্ত গাছ সংগ্রহ করে ধ্বংশ করা বা পুড়ে ফেলা।
# এ রোগের আক্রমণ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম কুপ্রাভিট অথবা ৪ গ্রাম চ্যামপিয়ন মিশিয়ে স্প্রে করা ।
# ফসল সংগ্রহের পর পুরাতন গাছ ও আবর্জনা আগুনে পুড়িয়ে দিন।

লাউয়ের ভাইরাসজনিত রোগঃ

রোগ আক্রমণের লক্ষণ:
এ রোগ হলে গাছে হলুদ ও গাঢ় সবুজ ছোপ ছোপ মোজাইক করা পাতা দেখা দেয়।

আক্রমণের আগে করণীয়ঃ
# রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করা।
# ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রপাতি জীবানুমুক্ত রাখা।
# আগাম বীজ বপন করা।
# সুষম সার ব্যবহার নিশ্চিত করা।

আক্রমণ হলে করণীয়ঃ
১. ক্ষেত থেকে আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা/ডাল কেটে দেয়া।
২. জাব পোকা এ রোগের বাহক, তাই এদের দমনের জন্য ইমিডাক্লোরোপ্রিড ১ মি.লি. / লি. হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।
লাউয়ের ডাউনি মিলডিউ রোগঃ

রোগ আক্রমণের লক্ষণ:
বয়স্ক পাতায় এ রোগ প্রথম দেখা যায়। আক্রান্ত পাতায় গায়ে সাদা বা হলদে থেকে বাদামী রংগের তালির মত দাগ দেখা যায়। ধীরে ধীরে অন্যান্য পাতায় ছড়িয়ে পড়ে ।

আক্রমণের আগে করণীয়ঃ
১. আগাম বীজ বপন করা
২. সুষম সার ব্যবহার করা
৩. রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন: বারি লাউ চাষ করা
৪. বিকল্প পোষক যেমন: আগাছা পরিস্কার রাখা।
৫. আক্রান্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করা যাবে না।

আক্রমণ হলে করণীয়ঃ
১. আক্রান্ত গাছের অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করা ।
২. রিডোমিল গোল্ড ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করা ।

লাউয়ের পাতার দাগ রোগঃ

রোগ আক্রমণের লক্ষণ:
আক্রান্ত পাতায় গায়ে হলদে থেকে বাদামী রংগের ছোট ছোট দাগ দেখা যায়। ধীরে ধীরে একাধিক দাগ একত্রিত হয়ে বড় দাগ হয় এবং পাতায় ছড়িয়ে পড়ে।

আক্রমণের আগে করণীয়ঃ
১. বপনের পূর্বে বীজ শোধন করা (ভিটাভেক্স-২.৫ গ্রাম বা ব্যাভিষ্টিন- ২ গ্রাম প্রতি কেজি বীজ) বা ট্রাইকোডারমা ভিড়িডি ( ৩-৪ গ্রাম/ কেজি বীজ) দ্বারা শোধন করা ।
২. সুস্থ গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করা।
৩. ফসল সংগ্রহের পর পরিত্যাক্ত অংশ ধ্বংস করা।

আক্রমণ হলে করণীয়ঃ
# আক্রান্ত গাছ সংগ্রহ করে ধ্বংস করা ।
# আক্রান্ত পাতা ও ডগা অপসারণ করে মাটিতে পুতে ফেলা বা পুড়ে ফেলা।
# কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাক নাশক (যেমন: ব্যাভিস্টিন/ নোইন ইত্যাদি ) ১ গ্রাম / লি. হারে পানিতে মিশিয়ে শেষ বিকেলে স্প্রে করা।

লাউয়ের গামি স্টেম ব্লাইট রোগঃ

রোগ আক্রমণের লক্ষণ:
এ রোগ হলে পাতায় পানি ভেজা দাগ দেখা যায়। ব্যাপক আক্রমনে পাতা পচে যায়। কান্ড ফেটে লালচে আঠা বের হয়।

আক্রমণের আগে করণীয়ঃ
১. ক্ষেত থেকে আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা
২. রোগমুক্ত বীজ বা চারা ব্যবহার করা

আক্রমণ হলে করণীয়ঃ
১. ম্যানকোজেব অথবা ম্যানকোজেব + মেটালক্সিল যেমন: রিডোমিল গোল্ড ২ গ্রাম / লি. হারে পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করা।

লেখকঃ
রাসেল মাহবুব
উপসহকারী কৃষি অফিসার
উপজেলা কৃষি অফিস
খালিয়াজুরী,নেত্রকোণা।

[বিঃদ্রঃ-লেখাটি তৈরি করতে বিভিন্ন কৃষি বিষয়ক বই ও হ্যান্ডনোট এর সহায়তা নেয়া হয়েছে।]

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com