শাকআলুর সাতকাহন

বৃহস্পতিবার, ২৯ মার্চ ২০১৮ | ৯:২১ পূর্বাহ্ণ | 1937 বার

শাকআলুর সাতকাহন
শাকআলু

মো. আবদুুর রহমান


শাকআলু এক প্রকার মূলজাতীয় সবজি। ইংরেজিতে এ সবজিকে Goitenyo, Goiteno, nupe, jacatupe বা Amazonian yam bean বলা হয়। শাকআলুর বৈজ্ঞানিক নাম pachyrhizus tuberosus যা ‘Fabaceae’ পরিবারভুক্ত। শাকআলুর পাঁচটি প্রজাতি আছে। এর মধ্যে Pachyrhizus tuberosus প্রজাতিটির শাকআলু বাংলাদেশে প্রচলিত। আলুর মতো গড়ন হলেও শাকআলু একদিকে ফলের মতো কাঁচা খাওয়া হয়, অন্যদিকে সবজির মতো রান্না করে খাওয়া হয়। তাই বিশেষজ্ঞরা একে সবজি ফসলের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

শাকআলুর উৎপত্তি মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা। সেখান থেকে ধীরে ধীরে চীন, ফিলিপিন, ভারতবর্ষ প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে শাকআলুর চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, যশোর প্রভৃতি জেলায় শাকআলুর চাষ করা হয়।

শাকআলু চিরহরিৎ লতাজাতীয় শিম গোত্রীয় ফসল। এর লতা পাঁচ থেকে ছয় মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এটি অন্য কোন গাছকে অবলম্বন করে বেড়ে ওঠে। শিম গাছের মতোই পাতা ও লতা হয়। শিমের চেয়ে পাতা বড় ও পুরু। পাতা লম্বার চেয়ে চওড়া বেশি হয়। শিমের মতোই লম্বা ছড়ায় ফুল ফোটে। ছড়া ৪৫ সেমি. পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ফুলের রঙ নীলচে বা হালকা নীল ও সাদাটে। ফলও শুঁটির মতো, চ্যাপ্টা ও পশমযুক্ত। প্রতিটি শুঁটি বা ফলে ৮ থেকে ১০টি বীজ থাকে।

পাকা বীজের রঙ হালকা বাদামি। বীজ থেকে গাছ হয়। পোকামাকড়ের মাধ্যমে এর পরাগায়ন ঘটে। এটি মাটিতে নাইট্রোজেন সংবন্ধন ঘটায়। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বীজ বপন করে নভেম্বের-মে মাসের মধ্যে আলু তোলা যায়। গাছের গোড়ায় মাটির নিচে নাশপতি বা শালগমের মতো আলু হয়। একটি গাছে দুই বা ততোধিক আলু হয়। সাধারণত প্রতিটি আলু ১৫ থেকে ২৫ সেমি. লম্বা হয়। এ আলুর খোসা কাগজের মতো ও হালকা বাদামি বা হলদে। ভেতরের শাঁস কচকচে ও সাদা। অত্যন্ত রসালো ও মিষ্টি। এর খোসা ছাড়ানো খুবই সহজ। খোসা হাত দিয়ে টান দিলে সহজে উঠে আসে। খোসা ছাড়িয়ে এটি কাঁচা খাওয়া হয়। এ আলুর গায়ে হাত দিলে ঠা-া অনুভূত হয় বলেই পাহাড়িরা একে ঠাণ্ডা আলু বলে থাকেন। এ আলু কাঁচা চিবিয়ে খাওয়ার সময় প্রচুর পানি বের হয়। এজন্য কেউ কেউ শাকআলুকে জলপান আলু বলে থাকেন।

শাকআলু পুষ্টিকর ও সুমিষ্ট সবজি। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্যোপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম শাকআলুতে ৮০.২৫ গ্রাম পানি, ০.৫ গ্রাম খনিজ লবণ, ১.৬ গ্রাম আমিষ, ০.১ গ্রাম চর্বি, ১৭ গ্রাম শর্করা, ০.৬ গ্রাম আঁশ, ১১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম এবং কিছু পরিমাণ ভিটামিন এ, বি ও সি রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা শাকআলুতে ২.১ থেকে ১০.৭ গ্রাম স্টার্চ থাকে। শাকআলু গাছে যে শিম হয় তা ৩২% আমিষ সমৃদ্ধ। শিমও খাওয়া যায়। এর পাতায় ২০-২৪% আমিষ থাকে এবং এ পাতা খাওয়া যায়। তাছাড়া এতে ৭৫ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। আমাদের দেহের পুষ্টি সাধনে এসব পুষ্টি উপাদানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

প্রধানত শাকআলু কাঁচা খাওয়া হয়। তবে কোনো কোনো দেশে এটি টুকরা টুকরা করে কেটে লবণ, লেবুর রস ও মরিচের গুঁড়া মাখিয়ে সুস্বাদু করে খাওয়া হয়। এটি রান্না করেও খাওয়া যায়। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে শাকআলু সবজি ও সালাদ হিসেবে খাওয়া হয়। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সালাদ তৈরিতে এ আলুর যথেষ্ট কদর রয়েছে। তবে শাকআলু কাঁচা অবস্থায় খাওয়াই উত্তম। এতে ভিটামিন বা খাদ্যমানের অপচয় হয় না।

বাংলাদেশে শাকআলু একটি অপ্রচলিত সবজি। অথচ এটি একটি লাভজনক ফসল। এর উৎপাদন খরচ খুব কম। বীজ বপনের ৭-৮ মাস পর থেকে শাকআলু সংগ্রহ করা যায়। প্রতি হেক্টর জমিতে ১৫-২০ টন শাকআলু উৎপন্ন হয়। সাতক্ষীরা, যশোর ও খুলনা জেলার হাটবাজার ছাড়া ফুটপাতেও শাকআলু বিক্রি করতে দেখা যায়। প্রতি কেজি শাকআলু স্থানভেদে ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হয়। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

সুতরাং দেহের পুষ্টিসাধন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ দারিদ্র্যবিমোচনে শাকআলুর আবাদ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন।

লেখক:
উপসহকারী কৃষি অফিসার, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com