শিম চাষ ব্যবস্থাপনা

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২০ | ২:৪৯ অপরাহ্ণ | 158 বার

শিম চাষ ব্যবস্থাপনা

শিম একটি শীত প্রধান সবজি হলেও বর্তমানে কিছু কিছু জাত সারা বছরই চাষ করা যায়। এটি লতানো গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। শিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন আর মিনারেল। সবুজ ও কচি অবস্থায় শিম সবজি হিসেবে এবং পরিপক্ক অবস্থায় শিমের বিচিও পুষ্টিকর ডাল হিসেবে খাওয়া যায়। এটি জমি ছাড়াও রাস্তার ধারে, আইলে, বাড়ির আঙ্গিনায়, ঘরের চালে, ছাদ বাগানে, গাছেও ফলানো  যায়।

মাটিঃ
 দোঁআশ ও বেলে-দোঁআশ মাটিতে শিমের ভাল ফলন হয়।

জাতঃ স্থানীয় ও উচ্চ ফলনশীল উফশী দু’ধরনের জাত-ই রয়েছে।

স্থানীয় জাতঃ দেশে যুগ যুগ ধরে উৎপাদিত হয়ে আসা শিমের জাত গুলোকে স্থানীয় জাতের বলা হয়ে থাকে।দেশে এলাকা ভিত্তিক পঞ্চাশটিরও বেশি স্থানীয় শিমের জাত আছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- বাইনতারা, হাতিকান, চ্যাপ্টাশিম, ধলা শিম, পুটিশিম, ঘৃত কাঞ্চন, সীতাকুন্ডু,নলডক, আশ্বিনা ইত্যাদি।

উফশী উন্নত জাত সমূহঃ বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ও অন্যান্য গবেষনাগারে কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বেশ কিছু উচ্চ ফলনশীল ও নির্দিষ্ট রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন জাত উৎপন্ন করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাত সমূহ হল- বারি শিম ১, বারি শিম ২, বিইউ শিম ৩, ইপসা শিম ১, ইপসা শিম ২, একস্ট্রা আর্লি, আইরেট, সিকৃবি শিম-১, সিকৃবি শিম-২ ইত্যাদি আধুনিক উচ্চ ফলনশীল জাত। নিচে কয়েকটি আধুনিক জাতের শিমের পরিচয় দেয়া হল-
 

বারি শিম ১- মাঝারি আগাম জাত। আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসে বীজ বপন করতে হয়। প্রতিটি শিমের ওজন ১০-১১ গ্রাম, শিমে ৪-৫ টি বীজ হয়, গাছ প্রতি ৪৫০-৫০০ টি শিম ধরে। জীবনকাল ২০০-২২০ দিন। হেক্টর প্রতি ফলন ২০-২২ টন।
 
বারি শিম ২- আগাম জাত। আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসে বীজ বপন করতে হয়। প্রতিটি শিমের ওজন ১০-১৩ গ্রাম, শিমে ৪-৫ টি বীজ হয়, গাছ প্রতি ৩৮০-৪০০ টি শিম ধরে। জীবনকাল ১৯০-২১০ দিন। হেক্টর প্রতি ফলন ১০-১২ টন। 
 

বিইউ শিম ৩- সারা বছর চাষ করা যায়। গ্রীষ্ম মৌসুমেও চাষের উপযোগী। শিমের রঙ বেগুনি। প্রতিটি শিমে গড়ে ৫ টি বীজ হয়। হেক্টর প্রতি ফলন ৭-৮ টন।

ইপসা শিম ১- সারা বছর চাষ করা যায়। গ্রীষ্ম মৌসুমেও চাষের উপযোগী। শিমের রঙ বেগুনি। প্রতিটি শিমে গড়ে ৫ টি বীজ হয়। হেক্টর প্রতি ফলন ৫-১০ টন।
 

ইপসা শিম ২- সারা বছর চাষ করা যায়। গ্রীষ্ম মৌসুমেও চাষের উপযোগী। শিমের রঙ সাদাটে সবুজ। প্রতিটি শিমে গড়ে ৪ টি বীজ হয়। হেক্টর প্রতি ফলন ৭-৮ টন।
 

বীজ বপনের সময়ঃ
সাধারনত আষাঢ়  থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত বীজ বোনার  উপযুক্ত সময়। তবে বর্তমানে কিছু কিছু বিশেষ বৈশিষ্টের জাত সারা বছরই চাষ করা যায়।
 

বীজের পরিমাণ

বপন পদ্ধতি             মাদা প্রতি            হেক্টর প্রতি           

সারিতে বোনা হলে     ৪-৫ টি               ১৫ কেজি

মাদায় বোনা হলে  ৪-৫ টি ১০কেজি                                


জমি তৈরিঃ
বেশি জমিতে আবাদ করা হলে কয়েকটি চাষ ও মই দেয়া ভাল। মাদার দৈর্ঘ্য,  প্রস্ত, গভীরতার আকার ৪৫ সেন্টিমিটার রাখতে হবে। তবে মাদা জমির লম্বালম্বি বা জমি যে দিকে ঢাল সে দিকেও লম্বালম্বি সারি করার ন্যায় করা যেতে পারে।

মাদার দুরত্বঃ         
এক মাদা থেকে অন্য মাদার দুরত্ব ৩.০ মিটার।

প্রতি মাদার জন্য সারের পরিমাণঃ

গোবর ১০ কেজি,
খৈল/কম্পোস্ট ২০০ গ্রাম, 
ছাই ২ কেজি,
টিএসপি ১০০ গ্রাম, 
এমওপি ৫০ গ্রাম।

মাদা তৈরি করার সময় এসব সার প্রয়োগ করতে হবে। চারা গজালে ১৪ থেকে ২১ দিন পর পর দু’কিসি-তে ৫০ গ্রাম করে ইউরিয়া ও ৫০ গ্রাম করে এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে এবং পরবর্তীতে গাছের লক্ষন দেখে প্রয়োজন মনে করলে সারের ডোজ বাড়ানো যেতে পারে।
 

বীজ বপনের নিয়মঃ
প্রতি মাদায় ৪-৫ টি বীজ বুনতে হয়। বীজ বপনের আগে ১০-১২ ঘন্টা বীজ ভিজিয়ে নিতে হবে। প্রতিটি মাদায় ২-৩ টি করে সুস্থ চারা রেখে বাকী চারা তুলে ফেলতে হয়।
 

পরিচর্যাঃ জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। সারের উপরি প্রয়োগের পরে হালকা নিড়ানী দিয়ে গোড়ার মাটি উল্ট-পাল্ট করে ঝুর-ঝুরে করে দিলে ভাল হয়।
কোন অবস্থাতেই গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেয়া যাবে না। শুষ্ক মৌসুমে জমিতে প্রয়োজন মত সেচ দিতে হবে।এছাড়া গাছ যখন ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হবে তখন মাদার গাছের গোড়ার পাশে বাঁশের কঞ্চি বা ছিপ অথবা অন্য কিছু দিয়ে বাউনির ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু লতানো জাতিয় উদ্ভিদ তাই মাচার ব্যবস্থা করে দিয়ে হবে।

রোগ ও দমনঃ
মোজাইক ও অ্যানথ্রাকনোজ শিমের দু’টি মারাত্মক রোগ।

 শিমের মোজাইক একটি ভাইরাস জনিত রোগ। জাব পোকা এ রোগের বাহক।

ক্ষতির ধরণ : গাছে কাণ্ড , পাতায় হলুদ ও গাঢ় সবুজ ছোপ ছোপ মোজাইক করা পাতা দেখা দেয়।এটাবাড়ন্ত পর্যায় , চারা উভয় অবস্থায় দেখা দিতে পারে।

ব্যবস্থাপনাঃ
জমি থেকে আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলতে হবে অথবা ডালা কেটে দিতে হবে। জাব পোকা এ রোগের বাহক হওয়া এ পোকা দমনে ইমিডাক্লোরোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (যেমনঃ এডমায়ার অথবা টিডো ৭-১০ মি.লি./ ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করা যেতে পারে। স্প্রে করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সেই সবজি খাওয়া বা বাজার জাত করা যাবে না।

অ্যানথ্রাকনোজঃ এটি একটি ছত্রাক জনিত রোগ। চারা থেকে বাড়ন্ত,বয়স্ক সব অবস্তায় গোড়ায়,কান্ডে,পাতায়, ডগায় আক্রান্ত হতে পারে। চারা অবস্তায় গোড়ায় প্রথমে হালকা খয়েরি দাগ হতে কালো হয়ে ক্ষত হয়ে গোড়া পচে মরে যায়। ববাড়ন্ত অবস্তায় পাতা ও কান্ডেও খয়েরি মরিচা পড়া দাগ হয়ে পুড়ে যাওয়ার মত হয়ে যায় বা মরে যায়।

দমনঃ মেনকোজেব (৬৪%) + মেটালেক্সিল (৮%) গ্রুপের মেক্সজিল ৭২ ডব্লিউপিইয়ন ২ গ্রাম/প্রতি লিটারে বা প্রোপিকোনাজল গ্রুপের সিপিজল ২৫ ইসি ০.৫ মিলি/প্রতি লিটারে বিকোপিজল ২৫০ইসি ২মিলি/প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে।

পোকামাকড় ব্যবস্থাপনাঃ
শিমের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা হল ফল ছিদ্রকারী পোকা ও জাব পোকা। চারা অবস্থায় পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা মহা ক্ষতিকর। লাল ক্ষুদ্র মাকড়ও অনেক সময় বেশ ক্ষতি করে থাকে ফুল ফুটলে থ্রিপস ক্ষতি করতে পারে। ফল পেকে এলে বিন পড বাগ বা শিমের গান্ধি পোকা ক্ষতি করে। আইপিএম পদ্ধতি অনুসরণ করে এসব পোকামাকড় দমনের ব্যবস্থা নেয়া যায়।

দমনঃ শিমের জাব পোকার জন্যে এসিফেট গ্রুপের এসাটাফ ৭৫ এসপি / জাং ৭৫ এসপি/হেসিফেট ৭৫ এসপি/ মেপডন ৭৫ এসপি ১ গ্রাম/প্রতি লিটার পানিতে
অথবা
এসিফেট (৪৫%) + ইমিডাক্লোরপিড (২৫%) গ্রুপের কারেন্ট ৭০ ডব্লিউপি ১ গ্রাম/প্রতি লিটার পানিতে
অথবা
এসিটামিপ্রিড গ্রুপের তুন্দ্রা ২০ এসপি / রেসিম ২০ এসপি/মানিক ২০ এসপি/সাফারি ২০ এসপি ১গ্রাম/প্রতি লিটার পানিতে
অথবা
এসিটামিপ্রিড বুপ্রোফেজিন গ্রুপের সানপ্রোজিম-৪০ ০.৫ গ্রাম/প্রতি লিটার পানিতে
অথবা
বুপ্রোফেজিন (৫%) + আইসোপ্রোকার্ব (২০%) গ্রুপের প্রান্ত ২৫ ডব্লিউপি ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানিতে
অথবা
কার্বোসালফান গ্রুপের ক্রাউন ২০ এসসসি /ফায়ার ২০ ইসি / জেনারেল ২০ ইসি ১ মিলি/প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে। উপরোল্লিখিত কীটনাকের যে কোন একটি উল্লেখিত মাত্রায় ব্যবহার করা যাবে।
অথবা
সকল ধরনের পোকা দমনের জন্যে সাইপারমেথিন বা কোরফাইরিপস গ্রুপের কীটনাশক স্প্রে করা যেতে পারে।

[সকল ধরনের বালাইনাশক প্রয়োগের পূর্বে উপসহকারী কৃষি অফিসার অথবা কৃষি তথ্য ও পরামর্শ কেন্দ্র(ফিয়াক) অথবা উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ গ্রহণ করুন।]

ফসল সংগ্রহঃ সাধারণত আশ্বিন-কার্তিক মাসে ফুল হয়। ফুল ফোটার ২০-২৫ দিন পর ফসল সংগ্রহ করা যায়। ৪ মাসেরও বেশি সময় ধরে ফল দেয়। ফলন প্রতি শতকে ৩৫-৭৫ কেজি, হেক্টর প্রতি ১০-১৫ টন। গ্রীষ্মকালী জাত সমূহে অসময়েও কম-বেশি ফলন হয়ে থাকে।

লেখকঃ
মাহবুবুর রহমান (রাসেল মাহবুব)
(ডিঃ কৃষিবদ, বিএজিএড)
উপসহকারী কৃষি অফিসার
উপজেলা কৃষি অফিস
সদর, কিশোরগঞ্জ।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com