শামসুর রাহমান-এর ‘সবার চোখে স্বপ্ন’ বই নিয়ে এই আলোচনা-

শেষের প্রশ্নটি ছাড়া আর কোন জিজ্ঞাসা নেই

বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৯:০০ পূর্বাহ্ণ | 99 বার

শেষের প্রশ্নটি ছাড়া আর কোন জিজ্ঞাসা নেই

ভেজা ঘাসফুলের মতো সজীবতায় জেগে থাকে কিশোরদের মন। অবারিত স্বপ্নের মাঠে দু’চোখে থাকে বাঁধাহীন পথে চলার উদ্যমতা। অথচ আমরা বাঁধা দিই। চারিদিকে থাকে নিষেধ আর বারণ। সবকিছুতেই না না করে উঠি অভিভাবক’রা। অস্ফুট কষ্ট’রা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে কৈশোরিক মন। কিশোরের ভাবনারা তখন ছড়ার পঙক্তি হয়ে যায়। সে পঙক্তিতে কষ্ট’রা খেলা করে। খেলা করে না পাওয়ার যন্ত্রণারাও। অবশ্য এক সময় সেখানে আবার ভর করে পলাতক স্বপ্নরা। সবকিছুই লেখা হয়ে যায় ছড়ায়, লেখা হয়ে যায় কবিতায়। কবিতারা কথা বলে কিশোরবেলার। কিশোর মনের। সেখানে কী শুধু থাকে কষ্ট, যন্ত্রণা আর স্বপ্ন’রা? নাকি সেখানে থাকে ইতিহাসের ধূসর পাতার রঙ-রূপ-রস-গন্ধরাও? সে কথা জানার জন্য ফিরে যেতে হয় মলাটবন্দী কবিতার কাছে ছড়ার কাছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতের পর্দা ছিঁড়ে ভোর আসে। আসে মহান ২৬ মার্চ। স্বাধীনতার ঘোষণা দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান…

‘রাখাল রাজা ছাড়েন দেশে
বাঘের মতো হাঁক
রমনা-মাঠে দিলেন তিনি
স্বাধীনতার ডাক।

এবার মুক্তির নেশায় জেগে ওঠে ৫৬ হাজার বর্গমাইল। কিশোরের রক্তেও জাগে দ্রোহ। দ্রোহের সম্মিলিত ৯ মাসের প্রয়াসে স্ব-মহিমায় অঙ্কিত হয় প্রিয় মানচিত্র প্রিয় পতাকা। স্বাধীন দেশে ভোর আসে। রাতের আঁধার কেটে হয় স্বাধীন সূর্যোদয়।

পাক পশুরা গুলি করে
মানুষ মারে রোজ
কে যে কোথায় হারিয়ে গেল
কেউ পেল না খোঁজ।

বাপ-হারানো মা-হারানো
ছেলে ভীষণ রেগে
যুদ্ধ-মাঠে চলে গেল
ঘুমের থেকে জেগে।

সেই লড়াইয়ে বাঙালিদের
হল বিরাট জয়
সবাই দেখে বাংলাদেশের
স্বাধীন সূর্যোদয়
(স্বাধীন সূর্যোদয়।। সবার চোখে স্বপ্ন)

স্বাধীন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে জেগে ওঠে পাড়া। নড়ে-চড়ে বসে পুরো পৃথিবী। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া দেশ ও দেশের কথা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। কবি কলম ধরেন। কবি লেখেন কালের ইতিহাস। কবির কলমে উঠে আসে মিছিল আর লড়াইয়ের কথা। কোটি মানুষের বুকে কবি লিখে দেন স্বাধীনতার হরফ।

মিছিল, লড়াই কবি লেখে
লেখে অনেক কথা;
কোটি লোকের বুকে লেখে
রাঙা স্বাধীনতা
(কবি লেখে।। সবার চোখে স্বপ্ন)

কোটি মানুষের বুকে কেন রাঙা স্বাধীনতা লেখেন কবি? এমন প্রশ্নের জবাব উঠে আসে পরের লাইনগুলোতে। কবি জানেন স্বাধীনতা প্রাণের চেয়ে প্রিয়। তাই হৃদয়ের অতল গহীনে শুধু স্বাধীনতার জন্য জায়গা চান কবি।

কবি জানে স্বাধীনতা
প্রাণের চেয়ে প্রিয়
দুই নয়নে বুকের ভেতর
একেই ঠাঁই দিও।
(কবি লেখে।। সবার চোখে স্বপ্ন)

দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি, মাঠের ফসল, শস্য দানা স্বাধীন। স্বাধীনতার বাঁধ ভাঙা জোয়ারে কিশোরের মনও তাই সাঁতার কাটে কলমীলতার পুকুরে। মন হয়ে যায় উদাস হাওয়া। তবে কোথায় যেন একটা শূন্যতা খেলা করে। বড়রা তাকে দলে নিতে চায়না। আর ছোটদের দলে সে যেন বেমানান। হাস্যকর। তাই নিঃসঙ্গ সময় কাটে কিশোরের। কিশোরবেলার। সে কখনও চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে একটানা। কখনও তাকায় আকাশের মেঘমালার দিকে। তার মনে জন্ম হয় নানা প্রশ্ন। অন্যরা যখন আকাশে সাদা মেঘ দ্যাখে কিশোর তখন মেঘের ভেতর দ্যাখে পঙ্খিরাজ, ঘোড়া। সে দ্যাখে দুধমাখা মেঘের ছানা। আকাশের তারা’রা তার কাছে ধরা দেয় মটর দানা হয়ে। যে চোখে সে কালো রেখা দেখে তাকেই আবার ভাবে এটা রেখা না; এটা একটা নদী হবে হয়তো-

আচ্ছা ঐ যে অনেক দূরে
কী-যে একটা যাচ্ছে দেখা,
তাকে তুমি বলবে নদী
নাকি শুধুই কালো রেখা?

ঐ যে দূরে আকাশ জুড়ে
জ্বলছে যেন মটর দানা,
সত্যি করে বলো তো আজ
ওদের নাম কি তোমার জানা?

ঐ যে মেঘে যাচ্ছে মিশে
পঙ্খিরাজের সাদা ডানা,
সত্যি ওটা ঘোড়া নাকি
দুধেল মেঘের ছোট্ট ছানা?
(প্রশ্ন)

তার এ প্রশ্ন প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে তারই কানে। তবু তার জিজ্ঞাসা, তার প্রশ্নের যেন শেষ নেই। তার প্রশ্নের জবাব কেউ দ্যায়না। যেন কোনই কর্নপাত নেই কারোরই। অভিমানী কিশোর তাই আর কারো জবাবের আশায় বসে থাকে না। তার নিঃসঙ্গতা আরো গাঢ় হয়। অভিমানে ভরা মন তাই এবার নিজেই প্রশ্ন করে, আর নিজেই দেয় তার জবাব। এ যেন এক অন্য অনুভূতি

আচ্ছা তোমরা বলতে পারো
দিনের বেলা তারাগুলো কোথায় থাকে?
দিনদুপুরে ওগুলোকে
সূয্যিমামা আলোর জামায় ঢেঁকে রাখে
(বলতে পারো।। সবার চোখে স্বপ্ন)

বর্ষার আকাশের মতই কিশোরের মনের পরিবর্তন হয় দ্রুত লয়ে। কখনও উদ্যমতা কখনও স্থবিরতা আবার কখনওবা প্রাণচাঞ্চল্যতায় মেতে ওঠে সে। কিশোর মনে থাকে হারানোর বেদনা। সেখানে থাকে আরেক রকমের ব্যথা। কিশোরকে বার বার টেনে ধরে তার অতীত। স্মৃতি রোমন্থন যেন তার নিঃসঙ্গতা ভাঙতে সাহায্য করে। সে স্মৃতি কখনও বেদনার কখনও মধুর। কিন্তু কোন কিশোরের স্মৃতি পটে যদি ভেসে ওঠে মা হারানোর দৃশ্য? তখন কী তাকে সান্তনা দেবার কোন ভাষা থাকে? থাকেনা।

পড়ার ঘরের চেয়ার থেকে
তাকাই যখন শূন্য খাটে
হয় যে মনে শুয়ে আছো
সূয্যিমামা যাচ্ছে পাটে।

তোমার কোরান, চশমা তোমার
শাড়িগুলো তেমনি আছে,
আলমারিটা কেমন নিঝুম,
কেবল তুমি নেই যে কাছে।

মাগো যদি একটি বার আজ
দেখি তোমার মুখের জ্যোতি,
দিচ্ছি কথা, কাঁদব না আর,
করব না আর চোখেন ক্ষতি।
(মাগো তুমি।। সবার চোখে স্বপ্ন)

কিশোরের মুখ ম্লান থাকুক এ প্রত্যাশা আর যারই হোক না কেন কবির কাম্য নয় কোন দিনই। তাই শব্দের বারান্দায় বসে কবিতার মালা গাঁথেন কবি। কবি চান কিশোরের মনে স্বপ্ন এঁকে দিতে। চোখের ভেতর স্বপ্ন মাখাতে কবি মেঘের পরীকে দাওয়াত দেন পৃথিবীতে নেমে আসার। কবি আশ্বাস দেন স্বপ্ন মাখানো হলে সে আবার মেঘে ফিরে যেতে পারবে।

মেঘমুলুকের হাওয়ার পরী
নেমে এসো ধীরে
সবার চোখে স্বপ্ন মেখে
মেঘে যেও ফিরে
(সবার চোখে স্বপ্ন।। সবার চোখে স্বপ্ন)

‘যখন খুব ছোট ছিলাম, কারও মুখে ছড়া শুনেছিলাম ব’লে মনে পড়ে না। এটা কোন শিশু কিংবা বালকের জন্য সুখকর কথা নয়।—- আমার ছেলে বেলায় যারা ছোট ছিল তারা অনেকেই নিশ্চয়ই ছড়া শুনত আর নিজেরা দুলে দুলে আওড়াত। আমার বেলা সেটি ঘটেনি ব’লে আমার অনেক কষ্ট হয় আজও।’ ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ছড়াসমগ্র গ্রন্থের ভূমিকায় এ কথাগুলো লিখেছিলেন কবি শামসুর রাহমান।
তাঁর লেখা ‘সবার চোখে স্বপ্ন’ গ্রন্থ থেকে নেয়া ছড়া/কবিতা গুলো নিয়েই আমরা কথা বলছিলাম। শামসুর রাহমানের মতো আর কোন শিশু বা কিশোর-কে যেন ছড়া/কিশোর কবিতা না শুনে বড় হতে না হয় সেজন্য ‘সবার চোখে স্বপ্ন’ নিশ্চয়ই ভূমিকা রাখছে এবঙ রেখে চলবে। তাহলে তাঁর এই চমৎকার বইটি দুষ্প্রাপ্য কেন? এ দায় পাঠকের নাকি প্রকাশকের?

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com