সম্ভাবনাময় কৃষি পর্যটন

শনিবার, ১৬ মে ২০২০ | ২:০৬ পূর্বাহ্ণ | 244 বার

সম্ভাবনাময় কৃষি পর্যটন

বিগত ছয় দশকে র্পযটন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়ছে। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, জিম্বাউয়ে, শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং কেনিয়ার মত অনেক উন্নয়নশীল দেশ তাদের র্পযটন খাতের যথাযথ ব্যাবহার এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাদের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করেছে। এই খাতে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বাংলাদেশের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। ২০১০ সালের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী আমাদের রাজস্ব আহরণ করে এমন কর্মকান্ডগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়ঃ শিল্পখাত, কৃষিখাত এবং সেবাখাত। র্পযটন সেবাখাতের অর্ন্তভুক্ত। ২০০৪-৫ অর্থ বছরে আমাদের জাতীয় আয় অথবা জিডিপিতে পর্যটনের অবদান মাত্র ৭ শতাংশ হলেও ২০০৯-১০ র্অথবছররে মধ্যে তা ৯.৪৪ শতাংশ র্পযন্ত বৃদ্ধি পায়। তবে ২০১৪ সালে মোট জিডিপিতে পর্যটনের অংশ ৪.১ শতাংশে কমে যায় যা ২০১৫ সালে ৪.৭ শতাংশ র্পযন্ত সামান্য বৃদ্ধি পায়। ২০১৯ সালে ৭৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অবদান রাখছে পর্যটন, কর্মসংস্থান দিয়েছে সাড়ে ১৮ লক্ষ মানুষের এবং পর্যটন রপ্তানি করেছে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি।


যেখানে পর্যটন জাতীয় রাজস্বের অন্যতম এবং স্থিতিশীল আয়ের খাত হতে পারতো সেখানে এধরণের অস্থিতিশীলতা সত্যিই হতাশাজনক যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা ও প্রতিজ্ঞার অভাব। অন্যথায় পর্যটন খাতটি পরিচালিত হতো যথাযথ পরিকল্পনা, প্রচার এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে। রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা থাকলে এবং যথাযথ কর্মকৌশল বাস্তবায়িত হলে পর্যটন ব্যাপকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে।


সঠিক পর্যটনের খোঁজবর্তমান বিশ্ব কর্মকাণ্ডের ধরন, অবস্থানের মেয়াদ ইত্যাদি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে পর্যটনকে সহস্রাধিক ভাগে ভাগ করেছ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু ধরণ হলো ঐতিহ্য পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, ঐতিহাসিক পর্যটন, ভৌগলিক অবস্থান ভিত্তিক পর্যটন, এডভেঞ্চার পর্যটন, পরিবেশ পর্যটন, কৃষি পর্যটন। পর্যটকদের আকর্ষন করতে এবং মুনাফার জন্য বাংলাদেশকে তার সুবিধা অনুযায়ী সঠিক ধরনের পর্যটনকে বেছে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা পর্যটন খাতে বিনিয়োগ করতে পারবো এবং সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পর্যটনকে যথাযথভাবে প্রচার করতে পারবো।


কৃষি পর্যটন কৃষি পর্যটনে সারা বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে আছে আমেরিকা ও ফিলিপিন। কৃষি পর্যটন হলো অবকাশযাপনের এমন এক ধরণ যেখানে খামারগুলোতে আতিথেয়তার আয়োজন করা হয়। অবকাশকালীন কর্মকান্ডের মধ্যে থাকে কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান আহরণ, ফল ও সবজি চাষ, ঘোড়ায় চড়া, মধুর আহরণ এবং স্থানীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন পন্য অথবা হস্তশিল্প সামগ্রীর তৈরী শৈলী দেখা ক্রয়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়া। অনেক বাবা-মা এ ধরনের অবকাশকে তাদের সন্তানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় বলে মনে করেন।উদাহরন হিসেবে বলা যায় পশ্চিমা অনেক দেশেই মানুষজন বিনোদনের জন্য নিয়মিত খামার, আঙ্গুরক্ষেতে, আপেল বাগানে, মাছ ধরতে যান। এ সময় প্রতিটি খামারেই চেষ্টা করা হয় অতিথিরা স্বপরিবারে যেনো মনে রাখার মত কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।


কৃষি পর্যটনের ইতিবাচক প্রভাবসমূহযেহেতু বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূমি ক্ষয়ের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ তাই ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এখন থেকে টেকসই উপায়ে জমি চাষ করা প্রয়োজন । বিদেশী এবং দেশী কৃষি পর্যটন স্থল, জল, বনভূমি, স্বাস্থ্য এবং মৎস্য সম্পদের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কিভাবে কমানো যায় সে বিষয়ে স্থানীয় কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে। পর্যটকেরা এবং আদিবাসীরা কৃষি সম্পর্কে তাদের ধারনা বিনিময় করতে পারে। পর্যটন থেকে আগত রাজস্ব টেকসই এবং পরিবেশ বান্ধব কৃষির উপর গবেষণায় ব্যয় করা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই কিছু উদ্যোক্তা দারিদ্র বিমোচনে মুরগী, ছাগল, মহিষ এবং গরুর টেকসই খামার প্রতিষ্ঠা করেছেন। পরিবেশ বান্ধব কৃষির মাধ্যমে কিভাবে বেকারত্ব ঘুচতে পারে এবং জীবনমান উন্নত হয় তা অন্যদের জন্য শিক্ষণীয়।


আঞ্চলিক দর্শনীয় স্থানগুলোর উপর নির্ভর করতে হবেদেশের ভিন্ন ভিন্ন অংশ বিভিন্ন ধরনের ফসল এবং কৃষির জন্য উপযোগী। যেমনঃ কুষ্টিয়ার মাটি তামাকের জন্য উপযোগী, ময়মনসিংহ ধানের জন্য উপযোগী, চাঁদপুর এবং বরিশাল মাছের জন্য প্রসিদ্ধ, সাতক্ষীরা ও যশোরের সুখ্যাতি রয়েছে যথাক্রমে চিংড়ি ও ফুল জন্য। অপরিকল্পিত ভাবে বাংলাদেশে কিছু কৃষি পর্যটন গড়ে উঠেছে। যেমনঃ রাজশাহী ও চাপাই নবাবগঞ্জের আম বাগান, দিনাজপুরের লিচু বাগান, স্বরূপকাঠির পেয়ারা বাগান, নরসিংদীর লটকন বাগান দেশীয় পর্যটকদের কাছে বিশেষ পর্যটন আকর্ষন হয়ে উঠেছে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কৃষকেরা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে কৃষি ভিত্তিক পর্যটনের প্রসার ঘটাতে পারেন।


জিআইএস কৃষি পর্যটন গঠনে ভৌগলিক তথ্য ব্যবস্থা (জিআইএস) অপরিহার্য। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের পর্যটন কর্তৃপক্ষ খুব সহজেই কৃষিপন্য এবং আদিবাসীদের কৃষিকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম বিক্রি করতে পারবে, পর্যটকদের জানাতে পারবে এলাকা, বন্যপ্রাণী, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত, ভূ-জনসংখ্যা ভিত্তিক বিস্তারিত তথ্যাদি এবং সহজ ভাষায় আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং প্রসিদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে। এছাড়া, উন্নত দেশে জিআইএস বহুলভাবে ব্যবহার করা হয় মানুষের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে, বিভিন্ন সেবার প্রসারে এবং জনপ্রশাসনের উন্নয়নে।


সমন্বিত কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে কৃষি পর্যটনের সাফল্য নির্ভর করছে যথাযথ পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং সুগঠিত ও নিয়মতান্ত্রিক কার্যকারিতার উপর। এ জন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে একসাথে কাজ করতে হবে এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক যোগানদাতাদের গুরুত্ব ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষি জমি রক্ষার জন্য সরকার একটি প্রকল্প গ্রহন করতে পারে এবং বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী কৃষি পর্যটনের প্রচারে সাহায্য করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা পাঠ্য বইয়ের বহির্ভূত কাজ এবং সমাজ সেবার অংশ হিসেবে জৈব চাষ আরম্ভ করতে পারে এবং তাদের সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে জৈব চাষ চালু করার উপায় খুঁজে বের করতে পারে। আগ্রহী ছাত্র ছাত্রীদের উৎসাহ যোগাতে বিদ্যালয়গুলো তাদের জন্য অতিরিক্ত নম্বরের অথবা বৃত্তির ব্যবস্থা করতে পারে। প্রচারের কৌশল হিসেবে আমাদের ট্রাভেল গাইড, ম্যগাজিনে আকর্ষণীয় এবং সৃষ্টিশীল বিজ্ঞাপন ছাপাতে হবে এবং বিভিন্ন ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্ট এবং ট্রাভেল রাইটারদের মাধ্যমে সবাইকে জানাতে হবে।


উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি কৃষি পর্যটন প্রসার করতে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এটির অবদান বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অনেক উপায় রয়েছে। সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের সাথে প্রতিযোগিতার সামর্থ্য আমাদের রয়েছে। কৃষি পর্যটন থেকে উপার্জিত অর্থ থেকে বাংলাদেশ খুব সহজে এই খাতের প্রসারে তার বাজেট ৪ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে।


পরিশেষে বলা যায়, কৃষি পর্যটন হতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি চমৎকার আয়ের উৎস কারন আমাদের আছে উর্বর ভূমি এবং কৃষি অর্থনীতির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল জনগণ। কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে টেকসই উৎপাদন, পরিবেশের নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বিনির্মাণ হতে পারে বাংলাদেশের উন্নত ভবিষ্যৎ।
(লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট ,বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোরার’স এ্যাসোসিয়েশন)

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com