সরিষার চাষাবাদ পদ্ধতি

শনিবার, ১০ নভেম্বর ২০১৮ | ৩:৪১ অপরাহ্ণ | 621 বার

সরিষার চাষাবাদ পদ্ধতি
সরিষা

চাষের মৌসুম :

বিভিন্ন অঞ্চলের তারতম্য এবং জমির জো অবস্থা অনুসারে টরি-৭, কল্যাণীয়া, সোনালী সরিষা, বারি সরিষা-৬, বারি সরিষা-৭ ও বারি সরিষা-৮ এর বীজ মধ্য আশ্বিন থেকে মধ্য-কার্তিক মাস (অক্টোবর) পর্যন্ত বোনা যায৷ রাই-৫ এবং দৌলত কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণ (মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেম্বর) মাস পর্যন্ত বপন করা যেতে পারে৷

দেশের উত্তরাঞ্চলও দক্ষিণাঞ্চলে যথাক্রমে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে সরিষার বীজ বুনতে হয়৷ দেশের মধ্যাঞ্চলে অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে বীজ বুনতে হয়৷ নেপাস জাতের সরিষা মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত বপন করা যায়৷

উপযুক্ত জলবায়ু :

তাপমাত্রাঃ মধ্যম থেকে কম ১৫-৩০ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ অধিক তাপ তেলের পরিমাণ কমিয়ে দেয়৷

বায়ুর আপেক্ষিক আর্দ্রতাঃ ৫০-৭০ডিগ্রি৷ বায়ুর আর্দ্রতা বাড়লে পোকা ও রোগ বিশেষত অল্টারনারিয়া পাতা ধসা ও জাত পোকার প্রকোপ বাড়ে৷

জীববৈচিত্র্যঃ সরিষার চাষ এলাকায় পর্যাপ্ত মৌমাছি থাকতে হবে৷ এতে সরিষার পরাগায়ন ভালো হয়৷ কীটনাশক প্রয়োগে মৌমাছি না আসলে ফসল কম হয়৷

বৃষ্টিপাতঃ কম বা বৃষ্টিহীন পরিবেশ সরিষা উৎপাদনের জন্যে ভালো৷
ঝড় বা শিলাবৃষ্টিঃ ঝড় বা শিলাবৃষ্টি সরিষার জন্য খুব ক্ষতিকর৷

অতিবৃষ্টিঃ মৌসুমের শুরুতে নভেম্বর মাসে ও শেষে ফেব্রুয়ারি মাসে অতিবৃষ্টি সরিষার জন্য খুব ক্ষতিকর হয়ে থাকে৷

মাটির ধরন :

উর্বর ও মধ্য উর্বর দোআঁশ ও পলি দোআঁশ মাটি সরিষা চাষের জন্যে উত্তম৷ মাটির বর্ণ গাঢ় ধূসর হওয়া ভালো৷ লালমাটি বা কাঁকড়যুক্ত মাটিতে সরিষার চাষ ভালো হয় না৷ মাটির অম্লমান ৬.০ থেকে ৭.০ এর মধ্যে থাকলে উত্তম৷ লোনা মাটিতে সরিষা ভালো হয় না৷ বর্ষায় পলি জমি এমন মাটি চাষের জন্যে ভালো৷ শুষ্ক অবস্থায় ফাটল ধরা মাটিতে সরিষা ভালো হয় না৷

উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি সরিষার জন্যে ভালো৷ আগাম পানি নিকাশ হলে মাঝারি নিচু জমিতে চাষ করা যায৷ উঁচু-নিচু জমিতে সরিষার চাষ করা যায় না৷ জমি উন্মুক্ত স্থানে হওয়া দরকার, যাতে সেখানে সারাদিন রোদ পড়ে৷ বর্ষাকালে প্রধানত বোনা আমন ও রোপা আমনের জমিতে শীতকালীন ফসল হিসেবে সরিষার চাষ করা হয়৷ এছাড়া আন্তঃফসল হিসেবে উর্বর জমিতে এবং ফল বাগানে সরিষার চাষ করা যায়৷

চাষের জন্য উপযুক্ত অঞ্চল:

বাংলাদেশে সরিষার প্রধান প্রধান উৎপাদন এলাকা হলো:

কুমিল্লা – চান্দিনা, দাউদকান্দি৷
চাঁদপুর মতলব, হাইমচর৷
ব্রাহ্মণবাড়িয়া – আখাউড়া, সরাইল৷
বৃহত্তর ঢাকা – ধামরাই, মুন্সিগঞ্জ৷
ফরিদপুর – সদর, শরীয়তপুর৷
পাবনা – বেরা, ফরিদপুর৷
চট্টগ্রাম – দক্ষিণ চট্টগ্রাম এলাকা৷
কক্সবাজার – সদর, রামু৷
যশোর – সদর ও সংলগ্ন এলাকা৷
কুষ্টিয়া – মিরপুর, দৌলতপুর৷
নেত্রকোনা – কোহনগঞ্জ, বারহাট্টা৷

জমি তৈরি পদ্ধতি:

জমিতে ৪-৬টি চাষ মই দিয়ে তৈরি করতে হবে৷ চাষ কম হলে সরিষা বীজের অঙ্কুরোদগমে বিঘ্ন ঘটে৷ মাটির জো অবস্থায় জমি চাষ দিতে হবে৷ এতে মাটিতে ঢেলা থাকবে না, মাটি সমতল হবে৷ জমি চাষ করর সময় আগাছা ভালোভাবে বাছাই করতে হবে, যাতে ফসলে আগাছার প্রকোপ কম হয়৷ সরিষা জমির চাষ ১০-১২ সেন্টিমিটার গভীরে হওয়া দরকার৷ সরিষা জমিতে চাষ করার ফাঁকে ফাঁকে রোদ লাগতে হবে৷ পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ দিলে ২-৩টি চাষই যথেষ্ট, তবে ভালোভাবে চাষ-মই দিয়ে জমি সমতল করতে হবে৷

বীজ বপন পূর্বে করণীয়

বীজ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০ অথবা ক্যান্টন দিয়ে (২-৩ গ্রাম ছত্রাক নাশক/ কেজি বীজ) বীজ শোধন করে বপন করতে হবে৷ বিনা সরিষার বীজ ব্যাভিষ্টিন (২.৫ গ্রাম/ কেজি) বা বেনলেট (১.৫ গ্রাম/ কেজি) দিয়ে শোধন করতে হবে৷

বীজ বপন

বীজ বপন পদ্ধতি: বাংলাদেশ প্রধানত সরিষার বীজ ছিটিয়ে বপন করা হয়৷ তবে সারিতে বীজ বপন করলে ফসলের পরিচর্যা করতে সুবিধা হয়৷ অবশ্য সারিতে বীজ বুনতে কিছু অতিরিক্ত ব্যয় হয়৷

বীজের হার: প্রতি হেক্টর ৭-৮ কেজি, গাছ সংখ্যা প্রতি বর্গমিটারে ৪৫ থেকে ৬৫টি (গাছের ধরন অনুসারে)৷

সারির দূরত্ব: সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার৷

সার ব্যবস্থাপনা

সরিষা চাষে সার প্রয়োগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ জাত, মাটি এবং মাটিতে রসের তারতম্য অনুসারে সার দিতে হয়৷ ইউরিয়া সার অর্ধেক বপনের আগে এবং বাকি অর্ধেক গাছে ফুল আসার সময় উপরিপ্রয়োগ করতে হয়৷ সার উপরি-প্রয়োগের সময় মাটিতে রস থাকা বাঞ্ছনীয়৷ সারের পরিমাণ নিম্নরূপ

সারের নাম সারের পরিমাণ (কেজি/হেক্টর)ইউরিয়া ২০০-২৫০ কেজি, (TSP) টি এস পি ১৫০ -১৮০ কেজি, মিউরেট অব পটাশ (MOP) ৫০-৬০ কেজি,বোরিক এসিড ১-১.৫ কেজি, সাধারণ গোবর ৮-১০ টন, সুষম কম্পোষ্ট ২-৩ টন জিপসাম ১৫০-১৭০ কেজি, সরিষার জমিতে সালফার (জিপসাম) প্রয়োগ উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে।
জমিতে নির্বাচিত হারে সুষম কম্পোস্ট দেওয়া হলে সেখানে সাধারণ গোবর বা খৈল দেওয়ার প্রয়োজন হয় না৷

সার প্রয়োগ পদ্ধতি :

ইউরিয়া বীজ বপনের ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ১-২ বার প্রয়োগ করতে হবে৷ ইউরিয়ার উপরিপ্রয়োগ প্রয়োগ করতে হবে৷
ইউরিয়ার উপরিপ্রয়োগের পূর্বে জমির আগাছা দমন করতে হবে৷
অর্ধেক ইউরিয়া ও অন্যসব সার জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে৷ ইউরিয়ার উপরিপ্রয়োগের পর জমিতে সেচ দিতে হবে৷

সেচ ব্যবস্থাপনা

সোনালী সরিষা, বারি সরিষা ৬ (ধলি), বারি সরিষা ৭ ও বারি সরিষা ৬ উফশী জাতসমূহ পানি সেচ দিলে ফলন বেশি হয়৷ বীজ বপনের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে (গাছে ফুল আসার আগে) প্রথম সেচ এবং ৫০-৫৫ দিনের মধ্যে (ফল ধরার সময়) দ্বিতীয় সেচ দিতে হবে৷ বপনের সময় মাটিতে রস কম থাকলে চারা গজানো ১০-১৫ দিনের মধ্যে একটা হালকা সেচ দিতে হবে৷ সেচের নিশ্চয়তা থাকলে সার বেশি দিতে হবে৷

আগাছা দমন

বীজ বপনের ১৫-২০ দিন পর একবার এবং ফুল আসার সময় একবার নিড়ানি দিতে হয়৷

পোকার আক্রমণ ও দমন

সরিষাতে বিভিন্ন জাতের পোকার আক্রমণ হতে পারে৷ এসব পোকার মধ্যে প্রধান প্রধান ক্ষতিকর পোকা এবং প্রতিকার বা দমনের পদ্ধতি আলোচনা করা হলো৷

সরিষার জাব পোকা

ক্ষতির লক্ষণ:

পূর্ণবয়স্ক ও বাচ্চা উভয়ই সরিষার পাতা, কাণ্ড, পুষ্পমঞ্জরী ও ফল হতে রস শুষে নেয়৷
আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে ফলের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়, পাতা কুঁকড়ে যায়৷
পোকা এক প্রকার রস বের করার ফলে মোল্ড ছত্রাক জন্মে আক্রান্ত স্থান কালো হয়৷
ফল ধারণ অবস্থায় বা তার পূর্বে আক্রমণ হলে প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার আশন্কা থাকে৷

প্রতিকার :

অক্টোবরে আগাম সরিষা বপন করলে জাব পোকার আক্রমণ কম হয়৷
প্রতি গাছে ৫০টির বেশি পোকা থাকলে ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি বা সুমিথিয়ন ৫৭ ইসি স্প্রে করতে হবে৷

সরিষার অন্যান্য পোকার বর্ণনা নিচে তালিকার মাধ্যমে দেয়া হলঃ

পোকার নাম ক্ষতির ধরন প্রতিকার

করাত মাছি শূককীট পাতা খায় ম্যালাথিয়ন ২ মিলি/ লিটার পানি সুমিথিয়ন ১ মিলি/লিটার পানি
পাতা বিছা শূককীট পাতা ও ফল খায়, ছিদ্র করে ম্যালাথিয়ন ২ মিলি/ লিটার পানি সুমিথিয়ন ১ মিলি/লিটার পানি
প্রজাপতি বিছা পাতা খায় ম্যালাথিয়ন ২ মিলি/ লিটার পানি সুমিথিয়ন ১ মিলি/লিটার পানি

রোগ দমন:

বাংলাদেশে সরিষার জমিতে প্রায় ১৫ ধরনের রোগ দেখা যায়৷ উচ্চ ফলন পেতে হলে এসব রোগের প্রতিকার করা দরকার৷ নিচে প্রধান তিনটি রোগের বিবরণ দেওয়া হলো-

সরিষার পাতা ঝলসানো রোগ

ক্ষতির লক্ষণ:

অলটারনারিয়া ব্রাসিসি নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগের সৃষ্টি হয়৷
প্রাথমিক অবস্থায় সরিষা গাছের নিচে বয়স্ক পাতায় এ রোগের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়৷
এ ছত্রাকের আক্রমণে গাছের পাতা, কাণ্ড ও ফলে চক্রাকার কালচে দাগের সৃষ্টি হয়৷
আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে পাতা ঝলসে যায়৷ ফলে সরিষার ফলন খুব কমে যায়৷

প্রতিকার:

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতের সরিষার চাষ করতে হয়৷ ধলি, দৌলত, বারি সরিষা-৭, বারি সরিষা-৮ ইত্যাদি জাত কিছুটা পাতা ঝলসানো রোগ সহনশীল৷
রোগমুক্ত বীজ বপন করতে হবে৷
বীজ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০ অথবা ক্যান্টন দিয়ে (২-৩ গ্রাম ছত্রাক নাশক/ কেজি বীজ) বীজ শোধন করে বপন করতে হবে৷

পরজীবী উদ্ভিদ

বর্ণনা:

সরিষা গাছের শিকড় থেকে ও পরজীবী উদ্ভিদ থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে৷ এর ফলে আক্রান্ত সরিষার গাছ দুর্বল হয়ে ফলন কমে যায়৷ মাটিতে ফসলের পরিত্যক্ত অংশ এবং সেচের পানিতে এদের উত্পত্তি ও বিস্তার ঘটে৷ বারবার একই জমিতে সরিষার চাষ করলে এই রোগ বৃদ্ধি পায়৷

প্রতিকার:

1. ফুল আসার পূর্বেই পরজীবী উদ্ভিদ জমি থেকে উঠিয়ে ধ্বংস করে ফেলতে হবে৷
2. পরজীবীর বিকল্প পোষক ফসল (তামাক, ইত্যাদি) কয়েক বছর চাষ করা যাবে না৷
3.অধিক পরিমাণ টিএসপি (প্রতি হেক্টরে ২০০ কেজি) ব্যবহার করতে হবে৷
3. আক্রান্ত জমি গভীরভাবে লাঙ্গল দিয়ে চাষ করতে হবে৷ ২, ৪-ডি আগাছানাশক প্রয়োগ করা যায়৷

ডাউনি মিলডিউ:

এই রোগে চারার বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায৷
পাতায় সাদা দাগ হয় এবং নিচের দিকে দাগগুলো বেশি দেখা যায়৷ ফলন কমে যায়৷

প্রতিকার :

রিডোমিল ৭২ দিয়ে বীজ শোধন
রিডোমিল ৭২ অথবা ডাইথেন এম ৪৫ (ম্যানেব) ০.২% স্প্রে করা ৫ থেকে ৭ দিন পরপর৷

পরিপক্বতার লক্ষণ:

মাঠের তিন চতুর্থাংশ পাতা বিবর্ণ বা হলদে হলেই বুঝতে হবে সরিষা পরিপক্ব হয়েছে৷ এই অবস্থায় ফসল সংগ্রহ করতে হবে৷ গাছ বেশি পরিপক্ব হলে ফল ফেটে বীজ মাটিতে পড়ে যায়৷ টরি জাতীয় সরিষা ৭০-ঌ০ দিন এবং রাই জাতীয় সরিষা ঌ০-১০০ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়৷

ফসল সংগ্রহ:

সকালে ফসল তুলতে হয়৷ ফসল সংগ্রহের জন্যে গাছ শিকড়সহ টেনে তোলা বা কাঁচি দিয়ে গাছ মাটির সমানে কেটেও নেওয়া যায়৷ ফসল তুলে তা কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে গরু বা লাঠি দিয়ে টিটিয়ে মাড়াই করতে হয়৷ গাছ পরিবহনের সুবিধার্থে ছোট ছোট আঁটি বেঁধে নেওয়া হয়৷ ফসল মাড়াই করার পর কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়৷ বীজের আদ্রতা ৬-৮% হলে তা সংরক্ষণের উপযুক্ত হয়৷

ফলন:

সরিষার ফলন জাত ও ব্যবস্থাপনাভেদে হেক্টরপ্রতি ৬০০-১৫০০ কেজি হতে পারে৷

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

কৃষি মন্ত্রনালয়ে ১১-২০তম গ্রেডে বিভিন্ন পদে নিয়োগ
শম্ভুগঞ্জ এর মোমেনশাহী এটিআই এ প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পূনর্মিলনী অনুষ্ঠিত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ১০৮১ জন নিয়োগ
উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদে বাছাই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ