ফুলকপি’র চাষাবাদ

শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪:৪৯ অপরাহ্ণ | 282 বার

ফুলকপি’র চাষাবাদ

 ফুলকপি’র চাষাবাদ

ফুলকপি একটি শীতকালীন পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও আমাদের দেশে জনপ্রিয় সবজি। আমাদের দেশে চাষকৃত ফুলকপি অধিকাংশই সংকর জাতের এবং বিদেশ থেকে আমদানিকৃত যা স্থানীয় আবহাওয়ায় বীজ উৎপাদন করে না। ঠাণ্ডা ও আর্দ্রতা জলবায়ুতে ফুলকপির ভাল ফলন পাওয়া যায়। সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধা আছে এমন ধরনের সব মাটিতে ফুলকপির চাষ ভাল হয়। আমাদের দেশে মাঘী, অগ্রহায়ণী, পৌষালী, বারি ফুলকপি-১, ২ ইত্যাদি বিভিন্ন জাতের ফুলকপি পাওয়া যায়। ফুলকপি বপনের উপযুক্ত সময় হল আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর। ফুল কপি চাষের জন্যে বীজতলায় চারা উৎপাদন করে নেয়াই উত্তম।

মাটিঃ
ফুলকপির জন্য উর্বর মাটি প্রয়োজন৷ মাটি সুনিষ্কাষিত এবং যথাযথ পানি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন হওয়া উচিত৷ আগাম ফসলের জন্য দো-আঁশ এবং নাবি ফসলের জন্য এঁটেল ধরনের মাটি উত্তম৷ এঁটেল দো-আঁশ মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ করে ভালো ফসল জন্মানো যায়৷ ফুলকপি ৫.৫-৬.৫ অম্লাক্ষারত্বে সবচেয়ে ভাল জন্মে৷

জলবায়ুঃ
গাছের গোড়ায় পানি না জমলে ফুলকপি বৃষ্টিতে তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং স্যাঁতসেতে আবহাওয়া গাছের জন্য ভাল৷ গাছ দৈহিক বৃদ্ধির পর্যায় থেকে প্রাগমঞ্জরী (ফুল কপি) উৎপাদন পর্যায়ে কখন পদার্পণ করবে তা নির্ভর করে তাপমাত্রার ও জাতের উপর৷ প্রাগমঞ্জরী উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা অনুযায়ী বিজ্ঞানী Shinohara (1984) ফুলকপির জাতসমূহকে নিম্নলিখিতভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন৷

জাতের শ্রেণী – প্রাগমঞ্জরী (ফুল কপি) উৎপাদনের জন্য তাপমাত্রারসর্বোচ্চ সীমা

অতি আগাম –     ২০-২৩ ডিগ্রি সেঃ

আগাম –             ১৭-২০ ডিগ্রি সেঃ

মাঝারী –             ১৭-১৫ ডিগ্রি সেঃ

নাবি –                 ১৫ ডিগ্রি সেঃ

প্রাগমঞ্জরী উৎপাদন ও এর বৃদ্ধির জন্য ১৫-২০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা সবচেয়ে উপযোগী৷ সাধারণভাবে এ তাপমাত্রা ফুল ধরার জন্যও সর্বাপেক্ষা উপযোগী৷ উচ্চ ও নিম্ন তাপমাত্রা ফুলকপির প্রাগমঞ্জরীর জন্য ক্ষতিকর৷ উচ্চ তাপমাত্রায় প্রাগমঞ্জরীর গুণখারাপ হয় এবং এটি দ্রুত ফুল ধরার পর্যায়ে ধাবিত হয়৷

উৎপাদন মৌসুমঃ
অক্টোবর মাসের শেষভাগ থেকে বাংলাদেশের বাজারে ফুলকপি উঠতে শুরু করে এবং ফেব্রুয়ারী মাসের শেষাবধি এ কপি পাওয়া যায়৷ আগাম ফসলের জন্য আগস্ট মাসে বীজ বপন করতে হয়৷ নভেম্বরের প্রথম পক্ষ পার হওয়ার পর আর বীজ বোনা উচিত নয়৷আগাম মৌসুমে ফসল উৎপাদন ঝুঁকিপূর্ণ৷ কোন কোন বছর বর্ষার শেষভাগে অতিবৃষ্টি এবং ঝড়ের কারণে ফসল নষ্ট হয়৷

জাতঃ
এ দেশে এখন ফুলকপির পঞ্চাশটিরও বেশি জাত পাওয়া যাচ্ছে। শীতকালেই আগাম, মধ্যম ও নাবি মওসুমে বিভিন্ন জাতের ফুলকপি আবাদ করা যায়।
#আগাম চাষ করা যায় ফুলকপির এমন জাতগুলো হলো অগ্রহায়ণী, আর্লি পাটনা, আর্লি স্নোবল, সুপার স্নোবল, ট্রপিক্যাল স্নো ৫৫, সামার ডায়মন্ড এফ১, ম্যাজিক স্নো ৫০ দিন এফ১, হোয়াইট বিউটি, কেএস ৬০, আর্লি বোনাস, হিট মাস্টার, ক্যামেলিয়া, আর্লি মার্কেট এফ১, স্পেশাল ৪৫ এফ১, স্নো কুইন এফ১ ইত্যাদি। এসব জাতের বীজ শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে বপন করা যায়।
#মাঝ মওসুমের উপযুক্ত অনেক জাত আছে। এগুলো হলো বারি ফুলকপি ১ (রূপা), চম্পাবতী ৬০ দিন, চন্দ্রমুখী, পৌষালী, রাুসী, স্নোবল এক্স, স্নোবল ওয়াই, হোয়াইট টপ, স্নো ওয়েভ, মোনালিসা এফ১, ম্যাজিক ৭০ এফ১, বিগটপ, চন্দ্রিমা ৬০ এফ১, হোয়াইট ফ্যাশ, বিগশট, হোয়াইট কনটেসা ইত্যাদি। এসব জাতের বীজ ভাদ্র-আশ্বিন মাসে বপন করতে হয়।
#নাবি করে ফুলকপি চাষ করতে চাইলে মাঘী বেনারসি, ইউনিক স্নোবল, হোয়াইট মাউন্টেন, এরফার্ট ইত্যাদি জাত লাগানো যেতে পারে। এসব জাতের বীজ আশ্বিন-কার্তিক মাসে বপন করতে হয়।

বীজতলাঃ
বীজতলার জন্য ৩ ×১ মিটার মাপের ১৫ সে.মি. উঁচু বেড তৈরি করাই উত্তম। বীজতলার উপরের স্তরে ১:১ অনুপাতে পচা গোবর/আবর্জনা সার এবং দো-আঁশ মাটির মিশ্রণ ছড়িয়ে দিতে হবে। এরপর তিন-চার সপ্তাহ পলিথিন দিয়ে মাটি ঢেকে রেখে শোধন করে নিলে বিভিন্ন রোগের মাটিস্থ জীবানু মুক্ত হয়। এরপর জো আসা মাটি হালকা ভাবে আঁচড়িয়ে পাঁচ সে. মি. দূরে দূরে লাইনে ছিটিয়ে ১০ গ্রাম বীজ এক বেডে বুনলে ভাল হয়। অতিবৃষ্টি ও রোদের ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য উপরে পলিথিন বা চাটাইয়ের আচ্ছাদন দিতে হয়। ১০ দিন পর দ্বিতীয় বীজতলায় পাঁচ সে.মি. পর পর সারি করে দুই সে.মি. দূরে দূরে শেষ বিকেলে স্থানানস্তর করে দিলে চারা জমিতে রোপনের ধকল সহ্য করার সক্ষমতা অর্জন করে। চারার বয়স ২৫-৩০দিন বা ৩-৪টি পাতা হলেই জমিতে রোপন উপযুক্তায় আসে।

বীজতলায় চারার পরিচর্যাঃ
কপির চারা অত্যান্ত নরম ও ভঙ্গুর হয়ে থাকে ফলে রোগ ও পোকার আক্রমনও বেশি হয়। বীজতলার আগাছা পরিষ্কার করে রাখতে হবে। অনেক সময় বীজতলায় চারাধ্বসা বা গোড়া পঁচা রোগে আক্রান্ত হয়। এক্ষেত্রে ম্যানকোজ্যাব গ্রুপের বালাই নাশক লিটারে ২গ্রাম হারে স্প্রে করা যেতে পারে। তা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের পোকা ও পাতা খেকো কীড়ার আক্রমন হয়ে থাকে এ জন্যে সাইপারমেথিন গ্রুপের কীটনাশক লিটার ১.৫ মিঃলিঃ হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে।

চারা রোপণঃ
বীজ গজানোর ১০ থেকে ১২ দিন পর গজানো চারা দ্বিতীয় বীজতলায় স্থানান্তর করতে হয়। চারায় পাঁচ থেকে ছয়টি পাতা হলেই তা রোপণের উপযুক্ত হয়। সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করা হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব দেয়া লাগে ৬০ সেন্টিমিটার বা দুই ফুট এবং প্রতি সারিতে চারা থেকে চারার দূরত্ব দিতে হবে ৪৫ সেন্টিমিটার বা দেড় ফুট। চারা রোপণের সময় সতর্ক থাকতে হবে যেন শিকড় মুচড়ে বা বেঁকে না যায়। এতে চারার মাটিতে লাগতে দেরি হয় ও বৃদ্ধি কমে যায়।আরো লক্ষ্য রাখতে হবে রোপনের সময় চারার গোড়ায় বা কান্ডে যেন আঘাত না লাগে।

সার ব্যবস্থাপনাঃ

সারের নাম – হেক্টর প্রতি সারের পরিমাণ – শতাংশ প্রতি সারের পরিমাণ

গোবর –                    ১৫-২০ টন     ৬-৮ কেজি

ইউরিয়া –                  ২৫০ কেজি      ১ কেজি

টিএসপি –                ১৫০ কেজি        ৬০০ গ্রাম

মিউরেট অব পটাশ-    ২০০ কেজি     ৮০০ গ্রাম

সার ব্যবহারঃ
পচা গোবর জমি তৈরির সময় ৫০ কেজি দিতে হবে। প্রতি শতকে ইউরিয়া শেষ চাষের সময় ২৫০ গ্রাম, তার ২০ দিন পর ৫০০ গ্রাম এবং ৩৫ দিন পর ২৫০ গ্রাম। টিএসপি শেষ চাষের সময় ৭০০ গ্রাম দিতে হবে। এমপি শেষ চাষের সময় ২০০ গ্রাম, ২০ দিনপর ৩০০ গ্রাম এবং ৩৫ দিন পর ২০০ গ্রাম। জিপসাম জমি তৈরির সময় ৪০০ গ্রাম দিতে হবে। জিংক সালফেট শেষ চাষের পর ৪০ গ্রাম এবং সোহাগা শেষ চাষের সময় ৪০ গ্রাম।

২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সের চারা সারি থেকে সারি ৫০ সে.মি. (২০ ইঞ্চি) এবং চারা থেকে চারা ৪০ সে.মি. (১৬ ইঞ্চি) দূরত্ব বজায় রেখে রোপণ করতে হবে।জাত বিষেশে কম বেশিও করা যেতে পারে। চারা বা গাছের লক্ষন দেখে প্রথম ও দ্বিতীয়বার সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে, প্রয়োজনে তৃতীয় বারও উপরি প্রয়োগ করা যেতে পারে। উপরি প্রয়োগ করার পর পরই সারির দু’পাশের মাটি আলগা করে গাছের গোড়ায় তুলে দিলে ভাল। এতে সেচ ও নিষ্কাশন উভয় কাজে সুবিধা হবে। জাত বেধে চারা রোপণের ৪০-৪৫ দিন পর থেকেই কপি সংগ্রহ শুরু করা যায়।

সার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিষেশ বিবেচ্য বিষয়ঃ
মাটিতে বোরন এবং মলিবডেনামের ঘাটতি থাকলে ফুলকপির গাছ সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷
*মলিবডেনামের অবাবে কপিতে হইপটেইল রোগ হয়৷ এতে কচি চারার পাতার কিনারা হলুদ বা সাদা হয়ে যায়৷ বয়স্ক গাছে নতুন পাতার ফলক ঠিকমতো গঠিত হয় না৷ ঘাটতি বেশি হলে গাচের বৃদ্ধি কেন্দ্র ভেঙ্গে পড়ে৷ মাটিতে ১ কেজি হারে সোডিয়াম মলিবডেট প্রয়োগ করে অথবা এ দ্রব্য ০.৩-০.৬ পিপিএম সমাহরণে পাতায় প্রয়োগ করে ঘাটতি দূর করা যায়৷

*বোরনের অভাবে বাদামী-পচন নামক রোগ হয়৷ এ রোগে প্রাগমঞ্জরীর উপরে প্রথমে ভোজ দাগ পড়ে৷ ক্রমেএসব দাগ বাদামী বর্ণ ধারণ করে৷ ঘাটতি অধিক হলে কাণ্ডের অভ্যান্তরে ফাঁকা এলাকা সৃষ্টিহয়। অম্ল ও বেলে ধরনের মাটতে এ রোগ বেশি দেখা যায়৷ জমিতে হেক্টর প্রতি ১০ কেজি সোডিয়াম বোরেট প্রয়োগ করে বোরনের ঘাটতি পূরণ করা যায়৷ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতেপারে, জমিতে বোরনের আধিক্যও ক্ষতিকর৷ সোডিয়াম বোরেট ২-৫ পিপি এম সমাহরণে পাতালেও প্রয়োগ করা চলে৷

সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনাঃ
সার দেয়ার পরপরই প্রয়োজন হলে সেচ দিতে হবে। এ ছাড়া জমি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। জমিতে পানি বেশি সময় ধরে যেন জমে না থাকে সেটাও খেয়াল করতে হবে। সার দেয়ার আগে মাটির আস্তর ভেঙে দিয়ে নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে।

বিশেষ পরিচর্যাঃ
ফুলকপি গাছের সারি মাঝে সার দেয়ার পর সারির মাঝখানের মাটি তুলে দু’পাশ থেকে গাছের গোড়ায় টেনে দেয়া যায়। এতে সেচ ও নিকাশের সুবিধা হয়। তবে ফুলকপির ফুল সাদা রাখার জন্য কচি অবস্থায় চার দিক থেকে পাতা টেনে বেঁধে ফুল ঢেকে দিতে হবে। সূর্যের আলো সরাসরি ফুলে পড়লে ফুলের রঙ তথা ফুলকপির রঙ হলুদাভ হয়ে যাবে।

বালাই ব্যবস্থাপনাঃ
এ দেশে ফুলকপির সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা হলো মাথাখেকো লেদা পোকা। নাবি করে লাগালে সরুই পোকা বা ডায়মন্ড ব্যাক মথ বেশি ক্ষতি করে। বীজ উৎপাদনের জন্য চাষ করলে পুষ্পমঞ্জরীকে জাব পোকার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। অন্যান্য পোকার মধ্যে কালো ও হলুদ বিছা পোকা ক্রসোডলমিয়া লেদা পোকা, ঘোড়া পোকা ইত্যাদি মাঝে মাঝে ক্ষতি করে থাকে। ফুলকপির পাতায় দাগ ও কালো পচা রোগ প্রধান সমস্যা। এ ছাড়া চারা ধসা বা ড্যাম্পিং অফ, কাব রুট বা গদাই মূল, মোজেইক, পাতার আগা পোড়া ইত্যাদি রোগও হয়ে থাকে। বোরন সারের অভাবে ফুলে বাদামি দাগ পড়ে ও ফাঁপা হয়ে যায়।

আবশ্যকীয় কার্যাবলীঃ
১. পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত উঁচু জমিতে চাষ করতে হবে।
২. আগাছা দমন করতে হবে।
৩. সেচ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৪. রোগ-বালাই দমনে উপযুক্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. অবশ্যই সোহাগা ব্যবহার করতে হবে। ৬. সঠিক বয়সের সুস্থ ও সবল চারা স্থানান-র, পরিমিত সার, সেচ ও অন্যান্য অন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা সঠিক সময় ও নিয়ম অবশ্যই সম্পাদন করতে হবে।

ফসল তোলা ও ফলনঃ
সাদা রঙ ও আঁটসাঁট থাকতে থাকতেই ফুলকপি তুলে ফেলা উচিত। মাথা ঢিলা ও রঙ হলদে ভাব ধরলে দাম কমে যায়। একরপ্রতি ফলন ১৫ থেকে ২৫ টন, হেক্টরে ৩৫ থেকে ৬০ টন।

লেখকঃ
রাসেল মাহবুব
উপসহকারী কৃষি অফিসার
খালিয়াজুরী, নেত্রকোণা।।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Development by: webnewsdesign.com