ইফতারি প্রথাকে না বলুন…

সোমবার, ২৭ মে ২০১৯ | ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ | 1355 বার

ইফতারি প্রথাকে না বলুন…

মেয়ের বাড়িতে কিংবা বোন, ভাতিঝির শশুর বাড়িতে রমজান মাসে ইফতারি হিসেবে মিষ্টি সহ বিভিন্ন ধরনের আইটেম দেয়ার প্রথা ‘ইফতারি প্রথা’ হিসেবে পরিচিত।

বিয়ের প্রথম বছর বেশি করে দিতে হয়। এরপর পরিমাণে কম হলেও প্রতিবছর দিতে হয়। শশুর বাড়ির লোকজন সেই ইফতারি দিয়ে নিজেদের আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত দিয়ে ভূরিভোজ করান। যারা আসতে পারেন না, তাদে বাসা বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই ইফতারি দিতে গিয়ে মেয়ের বাপের বাড়ির লোকদের কোন রকম কষ্ট হচ্ছে কিনা কিংবা সামাজিক চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে দিচ্ছেন কিনা এটা বিবেচনায় নেয়ার টাইম নাই শশুর বাড়ীর লোকদের। তাদের ইফতারি খাওয়া চাই, খাওয়ানো চাই। ধনীরও চাই, গরীবেরও চাই। আলেমের ও চাই, মাস্টারের ও চাই। কৃষকেরও চাই, মজুরেরও চাই।

webnewsdesign.com

এটা সামাজিক প্রথা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে। ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত অনেক পরিবারও এ থেকে মুক্ত নয়।

আমার নিজের কথাই বলি। রমজানের অল্প কয়েক দিন আগে আমাদের বিয়ে হয়। বিভিন্ন ধরণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবার আগেই রমজান চলে আসে।
শশুরের বাসা থেকে ইফতারি দেয়ার জন্য তারিখ চান। আমি তো তারিখ দেই না। উপায় না দেখে আমাকে এভয়েড করে আম্মার সাথে কথা বলে তারা ইফতার সামগ্রী পাঠিয়ে দেন। সম্পর্কটা পুরাই কাঁচা থাকায় আমি এরচেয়ে বেশি চাপ দেইনি। পরে বন্ধু বান্ধব আর দায়ীত্বশীলদের নিয়ে খাবারগুলো হালাল করার চেষ্টা করি। জেলা উত্তর জামায়াতের আমীর মাওঃ আনওয়ার হোসেন খান, সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর ফখরুল ইসলাম ভাইসহ অনেকেই কষ্ট করে দাওয়াতে এসেছিলেন। এরপর স্পষ্ট ভাবে শশুর বাড়ির সবাইকে জানিয়ে দেই যে এইবারই শেষ। আর কখনো ইফতারি নামে কোন কিছু দেয়া যাবেনা। মা বোনদেরকেও জানিয়ে দেই এমন কিছু গ্রহণ বা আশা না করতে। আলহামদুলিল্লাহ, সবাই এর উপর আমল করছেন।

আমি আমার বোনদের বাড়িতেও ইফতারি দেই না। পারলে কিছু টাকা দিয়ে দেই ঈদের আগে। ভাগ্না ভাগ্নিদের জন্য ঈদের ড্রেস কিনতে। না পারলে দেই না। আলহামদুলিল্লাহ, তাদের শশুর বাড়ি থেকেও এব্যাপারে কোন চাপ নেই। তাদের কারো সংসারেই এটা নিয়ে কোন সমস্যা নেই।

ইফাতারির বাইরে আরো কিছু প্রচলনও আছে। ফলের মৌসুমে গাড়ি বুঝাই করে বিভিন্ন ধরণের ফল দেয়া, ধাণের সিজনে পিঠা পুলি দেয়া এমনকি মেয়ে সন্তান সম্ভবা হলে ঘরে বানানো বিশেষ ধরণের সন্দেশ পাঠানো ইত্যাদি ।
নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলে সামর্থ অনুযায়ী কিছু নিয়ে যাওয়া ভাল। এটা সব সময়ের জন্য। বিশেষ কোন মাস বা সময়ের জন্য নয়।
গ্রামে কোন বাড়িতে ইফতারি গেলে আশে পাশের বাড়ি কখনো বা পুরো গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে ঐ বাড়ির বা আশে পাশের বাড়ির অথবা গ্রামের অন্য বধুরা বাপের বাড়িতে খবর পাঠান – “অমুকের বাপের বাড়ি থেকে ইফতারি এসেছে। আপনারা কখন দেবেন?” শশুর বাড়ির লোকজন কখনো আকারে ইংগিতে কখনোবা প্রকাশ্যে তাদের ছেলের বউদের স্মরণ করিয়ে দেন বিষয়টা। আর মেয়ের কাছ থেকে এটা জানার পর গরীব মা বাবারা পড়ে যান মহা টেনশনে।তারা কোন ভাবে চান না, তাদের মেয়েটা শশুর বাড়িতে লজ্জা পাক কিংবা কারো কাছে লজ্জার পাত্রী হোক। ফলে বাধ্য হয়ে, ধার দেনা করে হলেও ইফতারি দেন মেয়ের বাড়িতে। আর যারা দিতে পারেন না, তারা রমজান মাসে মেয়েকে দেখতে যেতেও লজ্জা পান। আড়ালে চোখের পানি বিসর্জন দেন।

সমস্যাটা এখানেই। ইসলামে ভাল সামাজিক কালচার গুলো সব সময় গ্রহনযোগ্য। কিন্তু যা সমাজের মাঝে বৈষম্য তৈরি করে, কাউকে আনন্দ দেয়ার পাশাপাশি কাউকে কষ্টও দেয় তা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। চাপ দিয়ে কিংবা লজ্জা দিয়ে ইফতারি আদায় আর যৌতুক গ্রহণের মাঝে পার্থক্য কোথায়??

আপনার টাকা কড়ি আছে বলেই আপনি ট্রাক বুঝাই সামগ্রী ইফতারি বা নাইওরির নামে দিতে পারেন না। টাকা বেশি হয়ে গেলে সবাইরে দেন। না দিলে শুধু আপনার মেয়ের বাড়িতে কেন? এরপরেও দিতে চাইলে চুপি চুপি দেন। যাতে অন্যের কষ্ট না বাড়ে। ইসলাম প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। অথচ প্রতিবেশীর কষ্ট বাড়িয়ে দেয়ার এই কালচার যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। আলেম ওলামারাও এ ব্যাপারে চুপ। বরং তাদের কেউ কেউ কষ্ট করে নিজের মেয়ের বাড়িতেও ইফতারি পাঠান। কেউ কেউ শশুর বাড়ির ইফতারি আরাম করে খান।

গ্রামেই এই প্রথার আমল সবচেয়ে বেশি। আবার গ্রামের মানুষজন আলেম ওলামাদের কথা শুনেন এবং মানেন বেশি। কাজেই আলেম সমাজের উচিত, এটাকে জায়েজ করার দলিল না খোঁজে সমাজ থেকে এমন আচার দূর করতে দায়িত্ব কাধে তুলে নেয়া। রমজানের শুরুতে মসজিদের খুতবায় এ ব্যাপারে বক্তব্য রাখা উচিত। তরুণদের দায়িত্ব রয়েছে অনেক। যারা বিয়ে করেছেন অথবা করবেন তাদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে। সবার আগে নিজের পরিবারকে এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। সমাজে অবশ্যই এর প্রভাব পড়তে বাধ্য।

সময় এসেছে এমন বৈষম্যমুলক কালচারকে না বলার।

আল্লাহ আমাদেরকে বৈষম্যহীন এক সোনালী সমাজ গড়তে ভুমিকা রাখার তাওফীক দিন। আমিন।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com