একটা আদ্যোপান্ত রঙহীন দিনও ভাল হয়ে যায় সবুজের ছোঁয়ায়…

শনিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২১ | ৭:৫৬ অপরাহ্ণ | 70 বার

একটা আদ্যোপান্ত রঙহীন দিনও ভাল হয়ে যায় সবুজের ছোঁয়ায়…

একটা আদ্যোপান্ত রঙহীন দিনও ভাল হয়ে যায় সবুজের ছোঁয়ায়। আর সেখানে যদি বাড়িতেই থাকে অর্কিড, তা হলে মন ভাল হতে বাধ্য। অর্কিডের প্রেমে পড়েননি, এমন মানুষ কমই আছেন। কিন্তু কী ভাবে বাছবেন অর্কিড? কেমনই বা হবে তার যত্নআত্তি?

বহু বহু বছর ধরে অর্কিড পৃথিবীতে বিরাজমান। বিভিন্ন রং, আকার, রকমফেরের অর্কিড বরাবরই আকর্ষক। একটি ঘরে আর কিছু না থাক, অর্কিডের ছোঁয়াতেই তা হয়ে ওঠে অসাধারণ। একটা সময় পর্যন্ত অর্কিডকে ফসিলে রূপান্তরিত করারও চল ছিল। অর্কিডের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এন্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব প্রান্তেই অর্কিড বেড়ে ওঠে। প্রায় ২৫ হাজার প্রজাতির এবং দু’লক্ষের উপরে হাইব্রিড অর্কিড পাওয়া যায়।

webnewsdesign.com

প্রজাতিঃ অর্কিডের সংখ্যাটা যে নেহাত কম নয়, তা আগেই বলা হয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় পাঁচ ধরনের অর্কিডের কথা এখানে বলা হল।

সিমবিডিয়ামঃ হালকা সবুজ পাপড়ি, তাতে গাঢ় গোলাপি ছোঁয়া। সিমবিডিয়াম অর্কিডের এই প্রজাতির সৌন্দর্য তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো।

সার্কোকিলাসঃ এই ধরনের অর্কিডের পাপড়ি সাদা। মাঝে থাকে হলুদ ও লাল রঙের ছোঁয়া।

ফ্যালেনপসিসঃ গোলাপি এবং সাদার চোখজুড়ানো মিলমিশে ফ্যালেনপসিস অর্কিড নজর কাড়ে সকলের।

ডেনড্রোবিয়ামঃ সবচেয়ে জনপ্রিয় গোলাপি, সাদা, হলুদরঙা এই অর্কিড পেয়ে যাবেন সর্বত্র।

ক্যাটেলেয়াঃ এই অর্কিডের হলুদ রং বড় স্নিগ্ধ। তার সঙ্গে রয়েছে গাঢ় গোলাপি। দেখতে বেশ উজ্জ্বল।

বাড়িতেই যত্নঃ বেশির ভাগ মানুষেরই ধারণা, অর্কিড উচ্চমুল্যের, যথেষ্ট বিরল এবং বাড়িতে অর্কিড বড় করে তোলা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। এ বিষয়ে সত্যিই সন্দেহ নেই যে, অর্কিড উচ্চমুল্যের। কিন্তু চাইলেই বাড়িতেও অর্কিডের গাছ লাগাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে…

আলোঃ অর্কিড বাড়িতে এনে প্রথমেই এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে ভাল আলো আসে। অর্কিডের জন্য সব সময়ে যে সূর্যের আলোই প্রয়োজন, এমন নয়। অর্কিড কৃত্রিম আলোতেও ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

তাপমাত্রাঃ ঠান্ডা নয়, অর্কিড সাধারণত উষ্ণ তাপমাত্রাই ভালবাসে। ৬০ থেকে ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে রাখতে হবে তাপমাত্রা। বেডরুমে অর্কিড রাখতে চাইলে জানালার ধারে কিংবা বিছানার পাশের কাউন্টারে রাখুন।

সার ও বরফঃ শুনতে অবাক লাগলেও অর্কিডের মাটিতে সপ্তাহে ক’টি বরফের টুকরো দিন। দরকার পড়লে ফার্টিলাইজ়ারও ব্যবহার করতে পারেন।

শিকড়ের দিকে খেয়ালঃ অর্কিডের শিকড় খুব সহজেই বুঝিয়ে দেয় তার স্বাস্থ্যের কথা। সবুজ রঙের শিকড় হলে বুঝবেন গাছের সার, জল, আলো সব পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। অন্য দিকে শিকড় সাদাটে কিংবা ধূসর হতে শুরু করলে জল দেওয়া প্রয়োজন। আর যদি শিকড় বাদামি বা খয়েরি হতে শুরু করে, বুঝবেন যে, অতিরিক্ত জল দেওয়া হচ্ছে অর্কিডে। সে ক্ষেত্রে জল দেওয়া বন্ধ করুন। যতক্ষণ না শিকড় সব জল শুষে নেয়।

পাতার যত্নঃ শিকড়ের মতোই পাতাও জানান দেয়, অর্কিড কেমন আছে। পাতার রং সাদা হতে শুরু করলে বুঝবেন অতিরিক্ত আলো পড়ছে। সে ক্ষেত্রে ক’দিন কম আলোয় রাখুন অর্কিড। গাঢ় সবুজ পাতার অর্থ অর্কিড পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো পাচ্ছে না। আবার পাতায় কালো রং ধরতে শুরু করলে বুঝবেন, ব্যাকটিরিয়া কিংবা ফাঙ্গাস ধরেছে অর্কিডে। সারে অতিরিক্ত মিনারেলের পরিমাণ থেকেও এ রকম হতে পারে।

অর্কিডের রোগ-পোকাঃ টব, কন্দ, শিকড় সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা চাই। ১০-১৫ দিন পর পর গাছে-সেভিন পাউডার বা ফিনিশ পাউডার ছড়িয়ে দেয়া উচিত। তাহলে পিঁপড়া, পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। আঁশ পোকা ও মাকড়সার উপদ্রব দেখলে সাবান পানি ছিটানো উচিত। থ্রিপস, মিলিবাগ ও এফিডের জন্য ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি ২ মিলি./বায়োট্রিন ১ মিলি হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-৮ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। ইঁদুরের উপদ্রব হলে ফসটক্সিন বড়ি /লানিরেট/বিষটোপ ব্যবহার করা যেতে পারে। পাতায় ও পেটালের ব্লাইট রোগ হলে আক্রান্ত পাতা ও পেটাল পচে যায়। রোগাক্রান্ত হলে প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ০.৫ মিলি. টিল্ট অথবা চা চামচের আধা চামচ ডাইথেন এম-৪৫ বা ম্যানকোজেব+কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ঔষধ যেমনঃ কমপ্যানিয়ন/ম্যানসার ভালোভাবে পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৭-১০ দিন পর পর গাছে স্প্রে করতে হবে। ০.৫ মিলি. টিল্ট মাপার জন্য অনেক সিরাপ জাতীয় ওষুধের সঙ্গে ড্রপার দেয়া থাকে, তার সাহায্যে মাপা যাবে। নেমাটোড আক্রান্ত গাছের চারপাশে ফুরাডান ছিটিয়ে দেয়া উচিত। চাষের যন্ত্রপাতি শোধন করে ব্যবহার করা ভালো।

 

অর্কিডের বিশ্রামঃ মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর মতো অর্কিডেরও বিশ্রাম প্রয়োজন হয়। অনেক সময়ে দেখা যায়, সমস্ত পাতা ঝরে গিয়েছে। পাশাপাশি কাণ্ডটিতে খয়েরি রং ধরতে শুরু করেছে। তার মানেই কিন্তু অর্কিড মৃত নয়। যেমন যত্নআত্তি প্রয়োজন, তেমনই করতে থাকুন। অনেক সময়ে হয়তো মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু অর্কিড রেস্টিং টাইম থেকে ফিরে এসে ফের ফুলের জন্ম দেবে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন শুধু ধৈর্যের।

 

ফুল সংগ্রহঃ সারা বছর জাতভেদে অর্কিডের ফুল ফোটে তবে দেশীয় অর্কিড মার্চ-মে মাসে সর্বাধিক পাওয়া যায়। কিছু কিছু ডেনড্রোবিয়াম অর্কিড বছরে ২-৩ বার ফোটে। প্রতি গাছে জাতভেদে ২-৪টি স্টিক পাওয়া যায়। খুব সকালে অথবা বিকেলে ফুলের নিচের কুঁড়ি ২/১ টা ফোটা মাত্রই কাটা উচিত। ফুলের স্থায়িত্বকাল বাড়ানোর জন্য ২-৩% সুক্রোজ কার্যকরী। বৃষ্টির সময় অথবা ভেজা অবস্থায় ফুল চয়ন করা উচিত নয়। ফুল সংগ্রহের পর পরই এর ডাটার গোড়া পানিতে ডুবিয়ে রাখলে ফুল বেশি দিন সতেজ থাকে।

🛑 বাড়ির সেন্টার টেবিলে হোক বা বেডরুমের একপাশে… অর্কিড স্বচ্ছন্দে জায়গা করে নেয় সর্বত্র। অর্কিডে ফুল ধরতে সময় লাগে। কিন্তু সুদীর্ঘ অপেক্ষার পর যখন অর্কিড রংবেরঙের ডানা মেলে ধরে, তখন কিন্তু তার থেকে চোখ ফেরানো দায়।

🛑 তবে বানিজ্যিক ভিত্তিতে ও আপনি অর্কিড চাষ করে বেশ মুনাফা অর্জন করতে পারেন৷ কারন, এক সময় হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে কোন অর্কিডই ছিল না, সে দেশের প্রাচীন মানুষ কখনো অর্কিড দেখেনি। প্রথমে শখের বাগান, তারপর শুরু হয় অর্কিডের বাণিজ্যিক চাষ। এরপর ধীরে ধীরে হাওয়াই হয়ে ওঠে অর্কিডের স্বপ্নরাজ্য। আর ওদের পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তেমনি এখন পেছনে তাকানোর সময় নেই অর্কিডের রানী থাইল্যান্ড ও তাইওয়ানের। বিশ্বে এখন অর্কিডের সবচেয়ে বড় বাজার বসে তাইওয়ানে। তাইওয়ান এখন বিশ্বে সবচেয়ে বড় অর্কিড রপ্তানিকারক দেশ। প্রতি বছর মার্চে তাইওয়ানে তাইওয়ানিজ ইন্টারন্যাশনাল অর্কিড শো অনুষ্ঠিত হয়। সেটি বিশ্বের প্রধান তিনটি অর্কিড শোর একটি। সিঙ্গাপুরেও সম্প্রতি গড়ে তোলা হয়েছে সিঙ্গাপুর বোটানিক গার্ডেনের মধ্যে একটি ন্যাশনাল অর্কিড গার্ডেন। মালয়েশিয়ার ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে আছে অনেক অর্কিড গার্ডেন। তারা শুধু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই অনসিডিয়াম, ডেনড্রোবিয়াম, ফেলেনপসিস ইত্যাদি উৎপাদন করছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ডেনড্রোবিয়াম অর্কিড উৎপাদনকারী দেশ থাইল্যান্ড আমেরিকার প্রয়োজনের বৃহদাংশ (৯৭%) সরবরাহ করে থাকে। কোটি কোটি ডলার তারা শুধু অর্কিড বাণিজ্য করেই উপার্জন করছে। অর্কিড চাষ তাই থাইল্যান্ডে শিল্পের মর্যাদা লাভ করেছে। এসব দেখে ও জেনে মনে হয় আমাদের যে অর্কিড সম্পদ রয়েছে সেগুলো নিয়েও আমরা ওদের মতো অনেকটা পথ এগিয়ে যেতে পারি। বৃহত্তর সিলেট, বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, যশোর, রাজশাহী অর্কিডের জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

 

লেখকঃ

কৃষিবিদ শিবব্রত ভৌমিক
কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি ইউনিট
পিকেএসএফ এবং সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা
ইমেইলঃ siba_bau@yahoo.com

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com