একটা টেন মিনিট স্কুল আমাদের নেই- মোটাদাগে এটা আমাদের ব্যর্থতা

বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২০ | ১১:৪৪ অপরাহ্ণ | 499 বার

একটা টেন মিনিট স্কুল আমাদের নেই- মোটাদাগে এটা আমাদের ব্যর্থতা

টেন মিনিট স্কুলে সকল বয়সীদের জন্য ইসলাম শেখার আলাদা একটা কর্ণার রাখার দাবি আয়মান সাদিক ভাইয়ের কাছে দিয়েছেন প্রিয় শাইখ আহমাদুল্লাহ। আল্লাহ উনাকে রহমতের চাদরে আবৃত করে রাখুন। তার ছায়া আমাদের মাথার ওপর প্রলম্বিত করুন।

শাইখ খুবই ইতিবাচক চিন্তার

webnewsdesign.com

একজন মানুষ এবং তিনি উদ্ভুত সমস্যার সুন্দর সমাধান-কল্পেই এমন একটা প্রস্তাবনা রেখেছেন, তবে আমার মনে হয়, এখানে বেশ অনেকগুলো ব্যাপার আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে। টেন মিনিট স্কুলে যদি আমরা আলাদাভাবে ইসলামিক কর্ণার চাই যেখান থেকে মানুষেরা ইসলাম শিখবে এবং ইসলাম জানবে, তাহলে অন্যদিক থেকেও দাবি আসতে পারে যে, ‘হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে জানার জন্যে আলাদা কর্ণার হবে কি? বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান?’

এমন প্রশ্ন যদি আসে, তখন আমাদের পক্ষ থেকে উত্তরটা কি হবে? আমরা কি সাধুবাদ জানাবো? বলবো, ‘ফাইন! আলাদা আলাদা ধর্মের জন্য আলাদা আলাদা কর্ণার করাই যায়’। এমন যদি হয়, তাহলে ঝামেলা হলো, টেন মিনিট স্কুল একাধারে মাদ্রাসা, গীর্জা, মন্দির এবং প্যাগোডা হয়ে উঠবে। সেই টেন মিনিট স্কুলকে কিরূপ দেখাবে তা আমরা নিজে নিজে ভেবে নিতে পারি। কিন্তু, আমরা যদি আপত্তি করি? যদি বলি, ‘এখানে কেবল ইসলাম ধর্ম শেখার কর্ণার-ই থাকবে, অন্যকোন ধর্মের কর্ণার এখানে হতে দেওয়া যাবে না’, তাহলে বেশ ভুল একটা ম্যাসেজ সবার মাঝে যাবে যা হলো- ইসলাম অন্য ধর্মের সহাবস্থানে বিশ্বাসী নয়। তখন মানুষ ভাববে, টেন মিনিট স্কুলকে আমরা জোর-দখল করেছি। সাধারণ মানুষ এখানে আমাদের বিজয় কিংবা গৌরব না দেখে কাপুরুষতা দেখবে বেশি। আখেরে যদিও-বা মনে হবে লাভটা আমাদেরই, কিন্তু লাভের লাভ আসলে হবে কি?

টেন মিনিট স্কুলে ইসলাম শেখার কর্ণার চালু হলে সেই লাভটা আমাদের ঝুলিতে কি আসবে যা একটা ভুল ম্যাসেজের মাধ্যমে আমাদের হারাতে হবে? ভাবতে হবে।দ্বিতীয় যে সংশয়টা আছে তা হলো, বাঙাল মুলুকের ইসলাম তো বটেই, উপমহাদেশীয় ইসলামটাই নানান দল আর উপদলে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে আছে। সত্য বলতে দ্বিধা নেই, বর্তমান যামানায় আমাদের মধ্যেই সহনশীলতার সংকট সবচাইতে বেশি। নিজেদের দলের প্রতি আমরা এতোই আনুগত্যশীল যে, অন্য-ভাবনার, অন্য-চিন্তার কারো কোন কথাকে আগ্রহভরে শোনা তো দূরে থাক, বলতে দিতেও ইচ্ছুক নই। যে আমার মাজহাব আর মানহাযের হবে না, তাকে আমি শত্রু শিবিরের লোক বলেই গন্য করি। সুতরাং, বিভক্তি এবং দলাদলির চরম এই সংকটাপন্ন সময়ে, টেন মিনিট স্কুলে ইসলাম শেখার কর্ণারে যারা কাজ করবেন, তাদের নাড়ি-নক্ষত্র নিয়ে যে চুলছেঁড়া বিচার-বিশ্লেষণ অনলাইন দুনিয়ায় হবে, এবং ট্যাগ, উপ-ট্যাগে তাদের যেভাবে ক্ষত-বিক্ষত করা হবে, সেই ধাক্কা টেন মিনিট স্কুলের ভাবি ইসলাম শিক্ষার ওস্তাদেরা সামলাতে পারবেন কি না, বা টেন মিনিট তা সামলাতে প্রস্তুত কি না তা-ও ভাবার অবকাশ থেকে যাচ্ছে।

এদেশে ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে বছরে যতোগুলো নির্ধারিত বিতর্ক-সভা অনলাইন দুনিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়, তা থেকে টেন মিনিট কিংবা তার ভাবি ওস্তাদেরা কতোটুকু নিজেদের বাঁচাতে পারবেন, তা আমাদের ভাবতে হবে।ধরে ধরে বলতে গেলে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতাকেই তুলে আনা যাবে। তবে আমার মনে হয়, টেন মিনিট স্কুলকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিলেই উত্তম। সেখানকার যে বিষয় আশয় নিয়ে আমাদের আপত্তি ছিলো, তা নিয়ে আমরা যথেষ্ট কথা বলেছি, আলাপ-আলোচনা করেছি, এবং তাদের কাছেও আমরা একটা শক্ত বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছি।

তারাও আমাদের বার্তা বুঝতে পেরেছেন এবং সেই মোতাবেক ভিডিও অপসারণ, কন্টেন্ট মুছে দেওয়ার মতোন কিছু দৃশ্যমান কাজও তারা করেছেন। এজন্যে তাদের সাধুবাদ। ভবিষ্যতে তারা আরো বেশি সতর্ক হবে এই কাম্য। আশা করি পুনরায় তারা এমন কোনোকিছুতে জড়াবে না, যা তাদের চলার পথকে দূর্গম করে তুলতে পারে। একটা টেন মিনিট স্কুল আমাদের নেই- মোটাদাগে এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমাদের উঠতি প্রজন্মকে কেউ এসে মজায় মজায় পদার্থবিজ্ঞান শেখাবে, হাসতে-খেলতে বুঝিয়ে দেবে রসায়নের কঠিন পাঠ, গণিতের প্যাচ খুলে দিয়ে চমকে দেবে, স্মার্টভাবে ইংরেজি বলতে, পড়তে আর লিখতে শেখানোর মতোন কোন প্রতিষ্ঠান আমরা গড়তে পারিনি। তরুণদের উদ্দীপ্ত করার মতো, ক্যারিয়ার গাইডলাইন দেওয়ার মতোন কোন প্ল্যাটফর্ম আমরা তৈরি করতে পারিনি এখন পর্যন্ত।

আমাদের মুরব্বীগন কখনোই তরুণদের এসব মনসতাত্ত্বিক দিক নিয়ে ভেবেছেন কি না বলতে পারি না। তরুণরা কি চায়, কিভাবে চায় সেটা কখনো আমাদের কর্তৃপক্ষ গোত্রের মানুষেরা ভাবার ফুরসত হয়তো পান নি। ঠিক এজন্যেই, আমাদের আজকে কোন টেন মিনিট স্কুল নেই। আমরা পড়ে আছি আমাদের সেই চিরাচরিত তর্ক-বিতর্কে যাকে কাজী নজরুল বলেছিলেন, ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে, বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফিকাহ ও হাদিস চষে’। আজ আমাদের কোন টেন মিনিট স্কুল নেই বলেই অন্যের টেন মিনিট স্কুলে একটা আলাদা ইসলামি কর্ণার তৈরির আবদার করতে হয়। অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকার যে বৃত্তে আমরা আবহমানকাল ধরে ঘুরপাক খাচ্ছি, তা হতে বের হওয়া আমাদের হলো-ই বা কই?

টেন মিনিট স্কুলের অধীন না থেকে, আমাদের ভাবতে হবে নতুন কিছুর। এমনকিছু, যা আমাদের অঙ্গনে টেন মিনিট স্কুলের ঘাটতি পূরণ করবে। তরুণদের স্বপ্ন দেখাবে, উদ্দীপ্ত করবে, প্রোডাক্টিভ উম্মাহ তৈরি করবে। তবে, তার আগে আমাদের কিছু দায়মোছন করে আসতে হবে। দ্বীনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়াদি নিয়ে আমরা যেভাবে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত, ভিন্ন মতের মানুষকে আমরা যেভাবে ধোলাই করার ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত থাকি, তা থেকে বের হতে না পারলে এই উম্মাহ টেন মিনিট স্কুলের প্রতিযোগি দাঁড় করাতে পারবে না, তার গলগ্রহ হয়েই তাকে থাকতে হবে।আলোচনা হোক আমরা বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর স্বার্থ ত্যাগ করে ‘উম্মাহ কনসেপ্ট’ নিয়ে কাজ করতে পারবো কি না, তা নিয়ে। যদি পারি, তাহলে যোগ্য মানুষগুলোকে খুঁজে দেওয়ার কাজ আমরা করতে প্রস্তুত। টেন মিনিট স্কুলের অধীন হবো কি না- সেই আলোচনাকে খুব কার্যকরী, ফলপ্রসূ বলে মনে করি না।

বিশিষ্ট ইসলামিক কথা সাহিত্যিক আরিফ আজাদের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com