ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অতীত-বর্তমান : আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা

সোমবার, ১১ অক্টোবর ২০২১ | ৫:৪১ অপরাহ্ণ | 164 বার

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অতীত-বর্তমান : আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা

আমি ০১/১১/১৯৯৮ থেকে ২০/৮/২০০৪ পর্যন্ত একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। সেই বিদ্যালয়টি বর্তমানে সরকারি এবং উপজেলার মডেল উচ্চ বিদ্যালয়।

 

আমি যখন শিক্ষকতা শুরু করি তখন বয়স মাত্র ২২ বছর ১ মাস। তাছাড়া সেই স্কুল থেকেই মাত্র ৬ বছর আগে এসএসসি পাস করেছি। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রায় সকলে তখনো কর্মরত। তাই প্রথম প্রথম স্যারদের পাশাপাশি বসা এবং চলাফেরায় কিছুটা বিব্রতকর লাগতো। যাক ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি। সহকর্মী হওয়া সত্ত্বেও স্যারদের কাছ থেকে তুমি সম্বোধন আমার কাছে ভালো লাগতো।

webnewsdesign.com

 

বিদ্যালয়ের একেবারে নবীন শিক্ষক হলেও আমি আমার নিজস্বতা দিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম প্রিয় ছাত্রছাত্রীদেরকে কিছু দেওয়ার জন্য। আমার এই নিজস্বতার বেশিরভাগও কিন্তু আমার শিক্ষক, শুভানুধ্যায়ী ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে অর্জিত।

 

আমার ৫ বছর ৯ মাস ২০ দিন মেয়াদে হাই স্কুলে শিক্ষকতা জীবনে যাদেরকে পড়ানোর সুযোগ হয়েছে তাদের অনেকে আল্লাহর রহমতে এবং নিজেদের প্রচেষ্টায় বিসিএস অফিসারসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি চাকুরিতে কর্মরত। অনেকে শিক্ষক, আইনজীবী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

 

আবার অনেকে মাধ্যমিকের গন্ডি অতিক্রম করতে না পারলেও বিভিন্ন পেশায় কর্মরত থেকে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রবাসী তথা রেমিট্যান্স যোদ্ধা। আমি তাদের সবাইকে নিয়ে গর্ববোধ করি।

 

আমার তরুন শিক্ষকতা জীবনের ভালো মন্দ মূল্যায়নের অধিকার অবশ্যই আমার ছাত্রছাত্রীদের বেশি। তরুন বয়সে অনেক কিছু বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারি ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে আমি কিছুটা কঠোর ছিলাম। তবে সেটার কোনো আলাদা রং রূপ ছিলোনা। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ধনী, গরীব, প্রভাবশালী, নিরীহ এসব বিবেচনায় আমার কোনো ভিন্ন রূপ ছিলোনা। সেজন্য প্রিয় ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি ছিলোনা। বরং উৎসাহ পেতাম।

 

ফেসবুকের যুগে অনেক প্রাক্তন ছাত্রের সাথে যোগাযোগ হচ্ছে। কারো কারো সাথে সরাসরি দেখা সাক্ষাৎ হয়। তাদের অনেককে চিনতে কিছুটা দেরি হয়। কিন্তু অধিকাংশেরই একটি কমন কথা “স্যার আপনার কাছ থেকে পড়ালেখা শিখতে পারি বা না পারি তবে আপনার মূল্যবোধ, আদর্শ, নৈতিকতা এবং উপদেশগুলো এখনো আমাদেরকে প্রেরণা যোগায়।” অনেকে বলে “স্যার আপনাকে অনেক ভয় পেতাম।”

 

আমি জানি আমি নিতান্ত একজন ক্ষুদ্র মানুষ। কিন্তু আমাকে নিয়ে আমার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের মূল্যায়ন দেখে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি।

 

আমার দৃঢ় বিশ্বাস সকল শিক্ষক এরকমই। হয়তো আরো ভালো কিংবা ব্যক্তি বিশেষে ১-২% শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হতে পারে। একজন শিক্ষক কোনো ছাত্রকে দিনের বেলা বেশি শাসন করলে রাতের বেলা ঐ ছাত্রের জন্য হৃদয়টা হাহাকার করে। পরদিন ঐ ছাত্রের মাথায় হাত বুলায়, আদর করে। এটি এক প্রকার ক্ষমা চাওয়া। আমার ক্ষুদ্র জীবনে অনেকবার এরকম হয়েছে।

 

দুঃখের কথা হচ্ছে ইদানিং ছাত্র-শিক্ষকের এই চিরন্তন সম্পর্কের মাঝে দেয়াল তৈরির অশুভ পাঁয়তারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের সভ্যতা ও মূল্যবোধের কি কোনো শিকড় বা ভিত্তি নাই? নাকি স্রোতের শ্যাওলার মতো যেভাবে ইচ্ছা সময়ে সময়ে আমাদের সভ্যতা ভদ্রতা ও মূল্যবোধকে একবার এদিকে আবার ওদিকে নিয়ে যাওয়া হবে?

 

শিক্ষক তার ছাত্রকে কিভাবে শাসন করবেন বা পরিচালনা করবেন সেটা শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যাস্ত করা হোক। এখানে সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। তবে সীমা লঙ্ঘন করলে কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়।

 

এদেশের শিক্ষকদের বেতন/সম্মানী তুলনামূলকভাবে কম। তবে তারা এতদিন নিজেদেরকে সম্মানিত ভাবতো। এই সম্মানটুকুও যদি কেড়ে নেয়া হয় তাহলে ভবিষ্যতে ভদ্র, ভালো ও মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।এটা আমাদের জাতীয় জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অতএব এখনই ভাবতে হবে।

 

লেখকঃ

মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন,

উপসহকারী প্রশিক্ষক, এটিআই বেগমগঞ্জ নোয়াখালী।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

বিএজিএড ডিগ্রি সম্পর্কে নানাবিধ জিজ্ঞাসার জবাবে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com