বস্তায় বা টবে আদা চাষ

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ১১:৫৫ অপরাহ্ণ | 2660 বার

বস্তায় বা টবে আদা চাষ
বস্তায় আদা চাষ

আদা একটি অতি প্রয়োজনীয় ভেষজ মসলা ফসল। বর্তমান বাজারে আদার দুর্মূল্য চলছে। এতে করে আদা কিনতে অনেকেই হিমশিম খাচ্ছেন। তবে আশার কথা হচ্ছে এই আদা মসলা হিসেবে কিন্তু খুব একটা বেশি পরিমানে প্রয়োজন পড়ে না।আমরা চাইলে কিন্তু একটি পরিবারের সারা বছরের আদার চাহিদা আমরা পারিবারিক চাষের মাধ্যমে পূরন করতে পারি।
বস্তায় বা টবে আদা চাষের মাধ্যমে এটা আমরা করতে পারি।

আসুন এখন বস্তায় বা টবে আদা চাষ সম্পর্কে জানিঃ
বস্তায় বা টবে আদা চাষের জন্য আলাদা করে জমির দরকার নেই। বিশেষ করে শহরের বহুতল বাসাবাড়িতে, হাওড় অঞ্চল যেখানে বসতবাড়িতে পর্যাপ্ত জায়গা নেই বা পানিতে তলিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে এবং গ্রামঞ্চলের বসতবাড়ির পতিত জায়গার সদ্যব্যবহার প্রায় বিনা খরচে চাষ করা যায়।

webnewsdesign.com

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? না, এটা খুবই সম্ভব। এবং আপনার হাতের নাগালেই আছে সবকিছু। সিমেন্ট বা আলুর বস্তায় ফলানো যেতে পারে শাক–সবজি থেকে আদা–হলুদ! টব হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন ভাঙ্গা/ফাটা বা পুরনো অব্যবহৃত প্লাস্টিকের বালতি, ঝুড়ি বা ধাতব কোন পাত্র। তবে টব হিসেবে এসব ব্যবহারের আগে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হিসেবে এসব পাত্রের গায়ে চার পাশে কয়েকটি ছিদ্র করে নিতে হবে।

এই পদ্ধতিতে একদিকে যেমন মাটিবাহিত রোগের আক্রমণ অনেক কমে যায়, অন্যদিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে বা প্রয়োজন হলে বস্তা / টব অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। বাড়ির উঠোন, প্রাচীরের কোল ঘেঁষে বা বাড়ির আশেপাশের ফাঁকা জায়গা অথবা ছাদে যেখানে খুশি রাখা যায়। এর জন্যে আলাদা কোনও জমি বা পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না।

চাষ পদ্ধতিঃ
মাটি প্রস্তুত করনঃ
প্রথমে বেলে-দোঁআশ মাটি সংগ্রহ করে ঢেলা ভেঙে চেলে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। বস্তা বা টবের মাটি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে ৩ভাগের দু’ভাগ মাটির সাথে এক ভাগ আবর্জনা পঁচা বা পঁচা ঝুরঝুরে গোবর অথবা হাঁস-মুরগির পঁচা বিস্টা মিশাতে হবে।এক্ষেত্রে কম্পোস্ট বা ভার্মিকম্পোস্ট হলে আরো ভাল।
এসময় সম্ভব হলে বস্তা বা টবের প্রতি ১০কেজি মাটির জন্যে সুষমসার হিসেবে ইউরিয়া ২০গ্রাম, ডিএপি ৫০ গ্রাম, এমওপি ২০গ্রাম, জিমসাম ১০গ্রাম ও বোরন ২গ্রাম হারে মিশ্রিত করলে পরিপূর্ণ পুষ্টির সংযোজন হয়ে যাবে। তবে মাটির ৩ভাগের একভাগ কম্পোস্ট বা জৈব পদার্থ মিশ্রিত করলে রাসায়নিক সার ব্যবহার প্রাথমিক ভাবে না করলেও চলবে। সাথে উইপোকা বা এধরনের ক্ষতিকর পোকা হতে রক্ষা করতে ২গ্রাম কারবোফুরান গ্রুপের কীটনাশক মাটির সাথে মিশালে ভাল ফল পাওয়া যাবে।

বস্তা বা টবে মাটি ভরাট করনঃ
বস্তা হলে বস্তার খোলা মুখের দিক থেকে অর্ধেক থেকে নিচের দিকে উল্টীয়ে নামিয়ে দিন, প্রয়োজন হলে পানি নিষ্কাশনের জন্যে দু’পাশে ৪টি বা প্রয়োজনানুযায়ী ছিদ্র করে নিন। তৈরি কৃত মাটি কিছু পরিমান বস্তায় রাখুন, এরপর বস্তার দু’কোণ ভেতরের দিকে আংগুল দিয়ে চেপে ঢুকিয়ে দিন।এতে করে বস্তার সাইজ গোলাকার হবে ফলে বস্তা বসানো সহজ ও দেখতেও সুন্দর দেখাব। এরপর আরো মাটি দিয়ে বস্তা ভরে ফেলুন তবে উপরের দিকে হাফ ইঞ্চির মত খালি রাখুন।
টব এর ক্ষেত্রে যদি পুরাতন বালতি বা অন্যান্য পাত্র ব্যবহার করে তবে পানি নিষ্কাশনের জন্যে কয়েকটি ছিদ্র করে নিয়ে উপরের দিকে একটু খালি রেখে মাটি দ্বারা ভরাট করে নিন।

আদা চাষের সময়ঃ
সাধারনত মে মাস ই আদা রোপনের উত্তম সময়। এপ্রিলের মাঝা-মাঝি হতেও রোপন শুরু করা যায়।

আদার কন্দ রোপনঃ
প্রতি বস্তায় ৩টি আদার কন্দ রোপন করা যায়। আর টব বড় হলে ৩টি ছোট হলে ১টি বা ২টি কন্দ রোপন করা যাবে।

আদার কন্দ সংগ্রহঃ
পরিবারের জন্যে মসলা হিসেবে ব্যবহারের জন্যে কেনা আদা হতেই কন্দ রোপনের জন্যে ব্যবহার করা যাবে।

কন্দের আকারঃ
রোপনের জন্যে প্রতিটি কন্দ ১০-১৫গ্রাম আকারের হলেই হবে।

অঙ্কুরোদগম বা চারা গজানোঃ
কন্দ সরাসরি বস্তা বা টবে রোপন করা যায়। তবে আদার কন্দ পানিতে ২৪-৪৮ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে বা ভিজা বালিতে বা এমনিতেই আদ্র মাটিতে বা জায়গায় ১-২ রেখে দিলেই অঙ্কুরোদগম বা চারা গজিয়ে নিলে ১৫-২০দিন সময় বাঁচানো যায়। এই চারা পূর্বে প্রস্তুতকৃত বস্তায় বা টবে রোপন করতে হবে। আদার কন্দ রোপনের আগে থিয়োভিট/নোইন/রিডোমিল গোল্ড নামক ছত্রাকনাশক দ্বারা ভিজিয়ে শোধনের পর আধা ঘণ্টা ছায়ায় শুকিয়ে নিলে ভাল হয়। এতে আদার অনেক রোগবালাই দূর করা যায়।

আন্তঃপরিচর্যা ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনাঃ
বস্তা বা টবে চাষ করা আদায় তেমন কোন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। যদি আগাছা জন্মায় তবে হাত দ্বারা পরিস্কার করে দিতে হবে। আর উপরের মাটি ঝুরঝুরে করতে দিতে হবে। রোপনের দুই আড়াই মাস পর ১ চামচ ইউরিয়া সার, ১চামচ ডিএপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
আর রোগ বালাই বস্তায় বা টবে চাষ করলে হয় না বললেই চলে। তবে ছত্রাকের আক্রমন ও কান্ড ছিদ্রকারী পোকার আক্রমন হতে পারে। ছত্রাকের আক্রমনে ছাই ছিটিয়ে দিলে প্রকোপ কমে, ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিও স্প্রে করা যায়। এছাড়াও রাসায়নিক ব্যবস্থা হিসেবে রিডোমিল গোল্ড/ থিয়োভিট /ব্যবিস্টিন কারবেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক লিটারে ২মিঃলিঃ হারে স্প্রে করতে হবে। সকল ধরনের পোকার আক্রমনে সাইপারমেথিন গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার করলেই হবে।

আদা সংগ্রহঃ
মে মাসে রোপন করলে ৬মাসেই মসলা হিসেবে খাওয়ার উপযুক্তায় চলে আসে। তবে পরিপক্ক হিসেবে ফসল হিসেবে পেতে ৯-১০মাস সময় লাগে। এক একটি বস্তায় তিনটি গাছ থেকে এক-দেড় কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।

লিখাঃ মাহবুবুর রহমান(রাসেল মাহবুব)
উপসহকারী কৃষি অফিসার
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
উপজেলা কৃষি অফিস
খালিয়াজুরী, নেত্রকোণা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments

বিএজিএড ডিগ্রি সম্পর্কে নানাবিধ জিজ্ঞাসার জবাবে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com