কেউ দায়িত্বে অবহেলা করলে কী করবেন?

বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ ২০২২ | ১:০০ অপরাহ্ণ | 152 বার

কেউ দায়িত্বে অবহেলা করলে কী করবেন?

Warning: Use of undefined constant linklove - assumed 'linklove' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/chasrhxr/public_html/wp-content/plugins/facebook-comments-plugin/class-frontend.php on line 99

যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯২ সালে স্টিলা লাইবেক নামে ৭৯ বছর বয়সী এক নারী একদিন ম্যাকডোনাল্ড কফি হাউসে কফি পান করতে যান। হঠাৎ হাত ফসকে কাপ পড়ে তাঁর পা পুড়ে যায়। আট দিন হাসপাতালে থাকতে হয় তাঁকে। এ ঘটনায় তিনি টর্ট আইনে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেন। মামলার আরজি অনুযায়ী আদালত প্রমাণ পান, ম্যাকডোনাল্ডের কফি ছিল ১৮০ থেকে ১৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার। অন্যান্য দোকানে সাধারণত ১৩৫ থেকে ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার কফি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ম্যাকডোনাল্ডের অতিরিক্ত তাপমাত্রার কফির কারণে লাইবেক বেশি দগ্ধ হয়েছিলেন। এই অপরাধে আদালত ২৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেন ম্যাকডোনাল্ড কফি হাউসকে। টর্ট আইনে এটি ‘লাইবেক বনাম ম্যাকডোনাল্ড কফি হাউস মামলা’ নামে বিখ্যাত।

 

যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের উপকূলে ডিপওয়াটার হরাইজন নামে অফশোর অয়েলের পাইপে বিস্ফোরণ হয় ২০১০ সালে, মারা যায় ১১ জন। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতে মামলা হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ৪০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এ মামলাটিও করা হয়েছিল টর্ট আইনে। টর্ট অর্থ হচ্ছে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার। বিশ্বের অনেক দেশে এ আইনের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে টর্ট আইন থাকলেও এর বিধি না থাকায় আইনটির কোনো প্রয়োগ নেই। তাই এ দেশে কারও দায়িত্বে অবহেলা, গাফিলতি বা অন্য কোনো অসাবধানতার কারণে কারও মৃত্যু হলে বা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোনো নজির নেই বললেই চলে। অথচ দেশে এ ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা অহরহ ঘটছে। ইতোপূর্বে ঢাকার উত্তরার একটি বাড়ির গ্যাসের চুলা বিস্ফোরণে একই পরিবারের চারজন নিহত হয়। বনানীতে গ্যাসের পাইপলাইন বিস্ফোরণে আহত হয় ২০ জন। বিস্ফোরণে একটি বাড়ি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যায়। অথচ এ জন্য কারা দায়ী, কারা ক্ষতিপূরণ দেবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ ছাড়া ম্যানহোলে পড়ে মৃত্যু, লিফট দুর্ঘটনায় মৃত্যু, ওভারব্রিজ ভেঙে পড়ে মৃত্যু, রাস্তায় বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে মৃত্যু, গ্যাস সিলিন্ডার বা গ্যাসের পাইপলাইন বিস্ফোরণে মৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনা তো আমাদের দেশে লেগেই আছে। এ ক্ষেত্রে টর্ট আইনের প্রচলন হলে এসব মৃত্যুর দায়ভারও যেমন নির্ধারিত হতো এবং ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পেত, তেমনি এ ধরনের ঘটনাও কম ঘটতো।

webnewsdesign.com

 

এ দেশে কেউ কাউকে শারীরিক আঘাত করলে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ দেশে ফৌজদারি মামলা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে সাজা খাটতে হয়। কিন্তু যে আঘাত পেল তার কোনো সুবিধা নেই। এ ক্ষেত্রে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে টর্ট আইনে। অবশ্য আমাদের দেশে দায়িত্বে অবহেলা বা অন্য কারও অসাবধানতার কারণে কারও মৃত্যু হলে তার পরিবার দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারে। বিচারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ক্ষতিপূরণও পাওয়ার কথা। তবে ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা দায়ের ও প্রতিকার পাওয়ার যে অধিকার রয়েছে, সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে আইনি প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিতে হয়, তা অত্যন্ত জটিল। আইনজ্ঞদের মত, এই প্রক্রিয়াকে সহজ করতে প্রয়োজন আইনকে যুগোপযোগী করা, আইন সংশোধন করা। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান আইনি অবকাঠামোর দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রত্যেককে তার দায়িত্ব মানতে হয় আইন অনুসারে। তাদের কোনো দায়িত্বে অবহেলার কারণে যদি কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই ক্ষতিপূরণ তারা দিতে বাধ্য। এ ছাড়া যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারা অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার ক্ষতিপূরণ দেবে ক্ষতিকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এ বিধান প্রচলিত। আমাদের দেশে একটি সাধারণ প্রবণতা রয়েছে, কেউ কোনো ক্ষতির দায়ভার নিতে চায় না। সিটি করপোরেশন এলাকায় কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সিটি করপোরেশন তার দায় এড়িয়ে চলে। গ্যাস লাইনের কারণে কোনো ক্ষতি হলে তিতাস দায় নিতে চায় না। রাজউক, রিহ্যাব বা এ রকম আরও যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে কেউ কোনো ক্ষতির দায় নিতে চায় না। আদালতে মামলা করতে হবে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে। ক্ষতিপূরণ কে দেবে, সেটি নির্ধারণ করবেন আদালত। তবে আইনি জটিলতা দূর করে সহজ প্রক্রিয়ায় যাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ পেতে পারে সেই ব্যবস্থা রাষ্ট্রের করতে হবে। এতে দায়িত্বে অবহেলা বা কোনো কাজে কেউ গাফিলতি করবে না।

 

আমাদের দেশে যেকোনো ক্ষতির জন্য দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করা যায়। কিন্তু এর প্রচলন একেবারেই কম। মামলা করতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের, সরকারের নয়। মামলা না হওয়ার কারণে বারবার দোষী ব্যক্তিরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অবহেলাজনিত কারণে প্রাণ হারানোর পর একে দুর্ঘটনা বলে ভাবার কোনো কারণ নেই। এর জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা হওয়া উচিত। এদেশে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা দায়েরের অভ্যাসটা একেবারেই কম। আমরা কথায় কথায় ফৌজদারি মামলা দায়েরে অভ্যস্ত। কারও দায়িত্ব অবহেলার কারণে দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করার বিধান রয়েছে, তবে এটির প্রচলন নেই বললেই চলে। এ দেশে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বিদ্যমান। এ ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিলে আদালত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির সহায়তা নিতে পারেন। সেই কমিটি কোনো ক্ষতির বিষয়ে যে বা যারা দায়ী, তাদের সুনির্দিষ্ট করবে এবং তাকেই ক্ষতিপূরণ দিতে বলবেন। আমাদের দেশে অনেক আইন রয়েছে, কিন্তু প্রয়োগ সীমিত। দণ্ডবিধি ছাড়াও পৃথক আইনে বিভিন্নভাবে ক্ষতিপূরণেরও বিধান রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর প্রয়োগ নেই, প্রক্রিয়াও জটিল। কোনো কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অবহেলার কারণে কোনো ক্ষতি হলে, ক্ষতিপূরণ চেয়ে মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করতে পারবে ভুক্তভোগী। মানবাধিকার কমিশন তার এখতিয়ার অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করতে পারে। সরকার সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। হাইকোর্টেও রিট মামলা করা যায় ক্ষতিপূরণ আদায়ে। এ ছাড়া টর্ট আইন অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারে ভুক্তভোগী। কিন্তু দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হলে অত্যধিক কোর্ট ফি জমা দিতে হয়। ফলে দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এই আদালতে মামলা করা সম্ভব না। এ পর্যন্ত টর্ট আইনে সারা দেশে মাত্র গুটিকয়েক মামলা হয়েছে। এ আইনে মামলার রায়ের ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়।

 

ক্ষতিপূরণ মামলা যেভাবে করতে হয় : দায়িত্বে অবহেলা বা অসাবধানতায় কোনো দুর্ঘটনা বা কোনো কাজের দ্বারা আহত বা নিহত ব্যক্তি বা ব্যক্তির স্বজনরা বা ওয়ারিশরা দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারে। ক্ষতিপূরণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো হার নেই। তবে দেওয়ানি কার্যবিধি অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে মামলার কার্যক্রম চলবে।

দায়িত্বে অবহেলা, ভুল চিকিৎসা ও অসাবধানে কোনো কাজ করলে কারও মৃত্যু ঘটলে বা চিরতরে পঙ্গু হলে বা আহত হলে তা অর্থ দ্বারা পরিমাপ করা যায় না। ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা, তার চাকরি বা তার কর্মক্ষেত্রের কাজের পারিপার্শ্বিক অবস্থান, পরিবার কতটুকু ক্ষতির সম্মুখীন হয় তার যুক্তিসংগত কারণ লিপিবদ্ধ করেই ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করতে হয়। এ জন্য সরকারি কোষাগারে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট হারে কোর্ট ফি দাখিল করতে হয়।

 

ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের জন্য এই মামলা করতে হয়। এ জন্য সর্বোচ্চ ৫৭ হাজার ৭৫০ টাকার কোর্ট ফি মামলার সঙ্গে দাখিল করতে হয়। অনেক সময় অন্য কারও কাজের মাধ্যমে কেউ মৃত্যুবরণ করলে বা চিরতরে পঙ্গু হলে বা মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষে এত টাকার কোর্ট ফি দিয়ে মামলা করার সামর্থ্য থাকে না। এ কারণে ক্ষতিপূরণ মামলার প্রচলন এ দেশে নেই। এছাড়া আইনি প্রক্রিয়া এত জটিল যে, বছরের পর বছর এসব মামলা ঝুলতে থাকে। কেউ মামলা করলে এক সময় তিনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে মামলার ভবিষ্যৎ আর এগোয় না। আদালতে যত বেশি ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা হবে, তার জন্য তত বেশি কোর্ট ফি জমা দিতে হয়। সরকার কর্তৃক এ বিষয়টি সহজ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইন যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments