আলুর রোগ ও পোকা দমন ব্যবস্থাপনা

বুধবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১:৩৮ অপরাহ্ণ | 2315 বার

আলুর রোগ ও পোকা দমন ব্যবস্থাপনা

Warning: Use of undefined constant linklove - assumed 'linklove' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/chasrhxr/public_html/wp-content/plugins/facebook-comments-plugin/class-frontend.php on line 99

ডিঃ কৃষিবদ রাসেল মাহবুব

আলু বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী কন্দ জাতীয় ফসল।
পৃথিবীর প্রায় ৪০টি দেশে আলু প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পুষ্টির দিক থেকে আলু ভাত ও গমের চেয়ে
কোনো অংশেই কম নয়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর জমি থেকে ৮৬ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়। বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি আলুর গড় ফলন মাত্র ১৯.৩৭ টন, যা অন্যান্য আলু উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় কম। দেশে আলুর ফলন কম হওয়ার কারণের মধ্যে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ অন্যতম। শুধু রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণের জন্য আলুর ফলন শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ হ্রাস পায়।

webnewsdesign.com

আলুর প্রধান রোগবালাইঃ
আলুর প্রধান রোগবালাইয়ের মধ্যে নাবি ধ্বসা, আগাম ধ্বসা, আলুর দাদ রোগ, কান্ড ও আলু পচা রোগ, ঢলে পড়া রোগ, পাতা মোড়ানো রোগ, মোজাইক, আলুর শুকনো পচা রোগ ও আলুর নরম পচা রোগ উল্লেখযোগ্য।

আলুর মড়ক বা নাবি ধ্বসা রোগঃ
ছত্রাকজনিত এ রোগের আক্রমণে প্রথমে পাতা, ডগা ও কান্ডে ছোট ভেজা দাগ পড়ে। ক্রমে দাগ বড় হয় ও সমগ্র পাতা, ডগা এবং কান্ডের কিছু অংশ ঘিরে ফেলে।
বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি থাকলে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই জমির অধিকাংশ গাছ আক্রান্ত হয়ে
পড়ে। ভোরের দিকে আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো ছত্রাক চোখে পড়ে। আক্রান্ত ক্ষেতে পোড়া পোড়া গন্ধ পাওয়া যায় এবং মনে হয় যেন জমির
ফসল পুড়ে গেছে।

প্রতিকারঃ
সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করা। দেখামাত্র আক্রান্ত গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলা বা জমি হতে দূরে মাটি গভীর গর্তে চাপা দেয়া। আক্রান্ত জমিতে সেচ যথাসম্ভব বন্ধ রাখা। রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক ১০ থেকে ১২ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।
পরে কুয়াশা ও মেঘলা আবহাওয়া বিরাজ করলে রিডোমিল গোল্ড, করমিল, মেটারিল, নিউবেনের যে কোনো একটি ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে দুই
গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০ থেকে ১২ দিন পর পর দুই থেকে তিনবার স্প্রে করতে হবে। যদি এতেও কাজ না হয়, তবে প্রতি লিটার পানিতে সিকিউর এক গ্রাম এবং মেলোডি ডুও দুই গ্রাম মিশিয়ে ১০ থেকে ১২ দিন পর পর দুই থেকে তিনবার ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।

আলুর আগাম ধ্বসা রোগঃ
এটিও একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগের আক্রমণে নিচের পাতায় ছোট বাদামি রঙের অল্প বসে যাওয়া কৌণিক দাগ পড়ে। আক্রান্ত অংশে সামান্য বাদামি
কালারের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে কালচে রঙের চক্রাকার দাগ দেখা যায়। পাতার বোঁটা ও কান্ডের দাগ অপেক্ষাকৃত লম্বা ধরনের হয়। গাছ হলদে হওয়া, পাতা ঝরে পড়া এবং অকালে গাছ মরে যাওয়া- এ রোগের
লক্ষণীয় উপসর্গ। আক্রান্ত কন্দের গায়েও গাঢ় বাদামি থেকে কালচে বসে যাওয়া দাগ পড়ে।

প্রতিকারঃ
সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ এবং সময়মতো সেচ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রোগ দেখামাত্র প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম হারে রোভরাল মিশিয়ে ৭ থেকে ১০
দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার প্রয়োগ করতে হবে।

আলুর কান্ড পচা রোগঃ
ছত্রাকজনিত এ রোগের আক্রমণে বাদামি দাগ কান্ডের গোড়া ছেয়ে ফেলে। গাছ ঢলে পড়ে এবং নিচের পাতা হলদে হয়ে যায়। আক্রান্ত অংশে বা আশপাশের মাটিতে ছত্রাকের সাদা সাদা জালিকা দেখা যায়। আলুর গা থেকে পানি বের হয় এবং পচন ধরে আলু নষ্ট হয়ে যায়।

প্রতিকারঃ
আক্রান্ত গাছ কিছুটা মাটিসহ সরিয়ে ফেলতে হবে।জমি তৈরির সময় গভীরভাবে চাষ দিয়ে কয়েক দিন রোদে ফেলে রাখতে হবে। জমিতে পচা জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম ম্যানকোজেব মিশিয়ে রোপণের আগে তা দিয়ে আলু শোধন করতে হবে।

আলুর দাদ রোগঃ
এটিও একটি ছত্রাকজনিত রোগ। হালকা দাদ হলে কন্দের ওপর উঁচু এবং ভাসা ভাসা বিভিন্ন আকারের বাদামি দাগ পড়ে। দাদ গভীর হলে কন্দে গোলাকার গর্ত বা ডাবা দাগ পড়ে। রোগের আক্রমণ সাধারণত ত্বকেই সীমাবদ্ধ থাকে।

প্রতিকারঃ
রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। জমিতে বেশি মাত্রায় ইউরিয়া সার ব্যবহার বর্জন করতে হবে। তিন শতাংশ বরিক এসিড দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
জমিতে হেক্টরপ্রতি ১২০ কেজি জিপসাম সার ব্যবহার করতে হবে।

আলুর ঢলে পড়া রোগঃ
এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে আলুর এ রোগ দেখা দেয়। রোগের আক্রমণে গাছের একটি শাখা বা অংশ ঢলে পড়ে। পাতা সাধারণত হলুদ হয় না এবং সবুজ অবস্থায় চুপসে পড়ে। গোড়ার দিকে গাছে কান্ড ফুঁড়ে দেখলে আক্রান্ত এলাকা বাদামি দেখা যায়। আক্রান্ত আলু কাটলে ভেতরে বাদামি দাগ দেখা যায়। আলুর। চোখে সাদা পুঁজের মতো দেখা যায় এবং আলু অল্প দিনের মধ্যেই পচে যায়।

প্রতিকারঃ
সুস্থ ও রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। আক্রান্ত গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আলু লাগানোর ২০ থেকে ২৫ দিন আগে জমিতে বিঘাপ্রতি ২.৬ কেজি হারে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করতে হবে। রোগ দেখা দিলে সেচ বন্ধ রাখতে হবে।

আলুর পাতা মোড়ানো রোগঃ
এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ।  এ রোগের আক্রমণে গাছের পাতা খসখসে, খাড়া ও উপরের দিকে  মুড়ে যায়। আগার পাতার রং হালকা সবুজ হয়ে যায় এবং গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়।  কখনো কখনো আক্রান্ত পাতার কিনার লালচে বেগুনি রংয়ের হয়।  গাছ খাটো হয় এবং সোজা হয়ে ওপরে দিকে দাঁড়িয়ে থাকে।  আলুর সংখ্যা কমে যায় এবং আলুর আকার ছোট হয়।

প্রতিকারঃ
রোগ মুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। আক্রান্ত গাছ কন্দসহ তুলে ফেলতে হবে। ভাইরাস রোগের বাহক জাব পোকা দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি স্টাটার ৪০ ইসি বা রক্সিয়ন ৪০ ইসি বা টিডো ২০এস এল ব্যবহার করতে হবে।

আলুর মোজাইক রোগঃ
এটিও একটি ভাইরাস জনিত রোগ। রোগের আক্রমণে  পাতায় বিভিন্ন্ ধরণের ছিটে দাগ পড়ে, পাতা বিকৃত ও ছোট হয়। লতা ঝুলে পড়ে এবং পরবর্তীতে গাছ মারা যায়।

প্রতিকারঃ
রোগ মুক্ত বীজ ব্যবহার করা। কন্দসহ আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা।ভাইরাস রোগের বাহক জাব পোকা দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি স্টাটার ৪০ ইসি বা রক্সিয়ন ৪০ ইসি বা টিডো ২০এস এল ব্যবহার করতে হবে।

আলুর শুকনো পচা রোগঃ
এক প্রকার ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগের সৃষ্টি হয়।  আলুর গায়ে কিছুটা গভীর কালো দাগ পড়ে। আলুর ভিতরে গর্ত হয়ে যায়। প্রথম পচন যদিও ভিজা থাকে পরে তা শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়।  আক্রান্ত অংশে গোলকার ভাঁজ এবং কখনো কখনো ঘোলাটে সাদা ছত্রাক দেখা যায়।

প্রতিকারঃ
আলু ভালভাবে বাছাই করে সংরণ করতে হবে। যথাযথ কিউরিং করে আলু গুদাম জাত করতে হবে। বস্তা, ঝুড়ি ও গুদাম ঘর ইত্যাদি ৫% ফরমালিন দিয়ে শোধন করতে হবে । ডাইথেন এম-৪৫ দ্রবণ ০.২% দ্বারা বীজ আলু শোধন করতে হবে।

আলুর নরম পচা রোগঃ
ছত্রাকের দ্বারা আলুর এই রোগ দেখা দেয়। রোগের আক্রমণে আলুর কোষ পচে যায়। পচা আলুতে এক ধরণের উগ্র গন্ধের সৃষ্টি হয়। চাপ দিলে আলু থেকে এক প্রকার দূষিত পানি বেরিয়ে আসে। আক্রান্ত অংশ নরম হয় যা সহজেই সুস্থ অংশ থেকে আলাদা করা যায়।

প্রতিকারঃ
সুস্থ ও রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত সেচ পরিহার করতে হবে। ভালভাবে বাছাই করে আলু সংরণ করতে হবে। ১% বিচিং পাউডার অথবা ৩% বরিক এসিডের দ্রবণে কন্দ শোধন করে বীজ আলু সংরক্ষণ করতে হবে।

আলুর পোকামাকড়ঃ
আলুর পোকা মাকড়ের মধ্যে কাটুই পোকা, জাব পোকা, সুতলি পোকাই প্রধান।

আলুর কাটই পোকাঃ
কাটুই পোকার কীড়া চারা গাছ কেটে দেয় এবং  কন্দ ছিদ্র করে আলু ফসলের ক্ষতি করে থাকে। পোকার কীড়া দিনের বেলা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে। আলুর কাটা গাছ অনেক  সময় কাটা গোড়ার পাশেই পড়ে থাকতে দেখা যায়।

প্রতিকারঃ
কাটুই পোকার উপদ্রব খুব বেশি না হলে কাটা আলু গাছ দেখে তার কাছাকাছি মাটি উল্টে পাল্টে কীড়া খুঁজে সংগ্রহ করে মেরে ফেলা উচিত। কাটুই পোকার উপদ্রব খুব বেশি হলে  প্রতি লিটার পানির সাথে ৫ মিলি হারে ডারসবান ২০ ইসি বা ফাইটার ২.৫ ইসি লিটারে ২মিলি বা ক্লাসিক ২০ইসি লিটারে ৩.৫ মিলি হারে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় ও মাটিতে বিশেষ করে বিকালের দিকে স্প্রে করে ভিজিয়ে দিতে হবে। আলু লাগানোর ৩০ থেকে ৪০ দিন পর স্প্রে করতে হবে।

আলুর জাব পোকাঃ
পূর্ণ বয়স্ক জাব পোকা ও বাচ্চা উভয় অবস্থায় ক্ষতি করে পোকা পাতা, কান্ড ও ডগা থেকে রস চুষে খায়। এই পোকা আলুর বিভিন্ন ভাইরাস রোগ ছড়ায়।

প্রতিকারঃ
আলু বীজ উৎপাদনের জন্য আলু ক্ষেতের জাব পোকা দমন করতে হবে। পোকা দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ৩ থেকে ৪ মিলি নিমবিসিডিন মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে বা টিডো ২০এস এলবালাইনাশক হিসেবে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে ম্যালাথিয়ন বা এসাটাফ মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

আলুর সুতলি পোকাঃ
পোকার কীড়া মাঠের ফসল ও গুদামজাত আলুর ক্ষতি করে থাকে। এরা আলু গাছের পাতা, বোঁটা ও কাণ্ডের আক্রমণ করে। গুদামে সংরক্ষিত আলুতে পোকার কীড়া সুড়ঙ্গ করে খায় এবং আলু পচে নষ্ট হয়ে যায়।

প্রতিকারঃ
ক্ষেত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।  আলু সংরক্ষণের আগে  আক্রান্ত আলু বেছে ফেলা। বাড়িতে সংরক্ষিত আলু শুকনা বালি, ছাই, তুষ অথবা কাঠের গুড়ার একটি পাতলা স্তর  দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

লেখকঃ মাহবুবুর রহমান
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস
খালিয়াজুরী, নেত্রকোণা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

Powered by Facebook Comments