মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণে আমিষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভিজ্জ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস হলো ডাল ফসল। ডালে প্রকারভেদে ২২-২৮% আমিষ থাকে, যা দেহের পুষ্টি সাধনে প্রাণিজ আমিষের তুলনায় অধিক কার্যকর এবং নিরাপদ। যদিও দৈনিক জনপ্রতি ৪৫ গ্রাম ডালের চাহিদা রয়েছে, তবে আমরা পেয়ে থাকি মাত্র ১৭-১৮ গ্রাম।
ডালের উৎপাদন ও ঘাটতি
দেশে প্রতি বছর ডালের চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন, উৎপাদন মাত্র ১০ লাখ টন, এবং আমদানির পরিমাণ ১০-১১ লাখ টন। বাকি ৫-৬ লাখ টনের ঘাটতি রয়ে যায়। আমদানির জন্য প্রতিবছর খরচ হয় প্রায় ৮-৯ হাজার কোটি টাকা। তবে পরিকল্পিতভাবে ডাল চাষ করলে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
ডাল ফসলের আধুনিক জাত ও প্রযুক্তি
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ডাল ফসলের ৯১টি উন্নত জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করলে ডালের ফলন ১.৫-২.০ গুণ বৃদ্ধি সম্ভব।
বর্তমানে তিন মৌসুমে (রবি, খরিফ-১, খরিফ-২) ডাল ফসলের চাষ করা যায়। প্রধান ডাল ফসলের মধ্যে রয়েছে:
- মসুর: সর্বাধিক জনপ্রিয়। উচ্চফলনশীল জাত যেমন বারি মসুর-৮ দিয়ে স্থানীয় জাতের তুলনায় দ্বিগুণ ফলন পাওয়া সম্ভব।
- খেসারি: রবি মৌসুমে চাষের উপযোগী। উচ্চফলনশীল জাত যেমন বারি খেসারি-২, ৩, ৫ এবং ৬ দিয়ে উৎপাদন ১.৫-২.০ গুণ বাড়ানো সম্ভব।
- মটর: সবজি হিসেবে জনপ্রিয়। পতিত জমিতে বারি মটর-২ বা ৩ চাষ করে বোরো ধানের আগে শুঁটি সংগ্রহ করা যায়।
- ছোলা: রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকা এবং বরিশালে পতিত জমিতে ছোলা চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
- মুগ ও মাসকলাই: স্বল্পমেয়াদি জাত (৫৫-৬৫ দিন)। পতিত জমি কাজে লাগিয়ে খরিফ মৌসুমে মুগ চাষ করে উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব।
- অড়হর: বসতবাড়ির ধারে, নদী বা খালের পাড়ে এবং পতিত জমিতে সহজেই চাষ করা যায়।
ডালের উৎপাদন বৃদ্ধির করণীয়
- আধুনিক জাত ও প্রযুক্তির ব্যবহার: উচ্চফলনশীল জাত ও সঠিক পদ্ধতিতে চাষ।
- পতিত জমি কাজে লাগানো: ধানের শস্যচক্রে ফাঁকা সময় এবং চরাঞ্চল কাজে লাগিয়ে ডাল চাষ।
- আন্তঃফসল চাষ: আখ, সরিষা, গম ইত্যাদির মাঝে ডাল চাষ।
- জলসেচ ব্যবস্থা: খরিপ মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা।
- সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষকদের একযোগে কাজ করা।
পরিকল্পিত চাষাবাদ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দেশের ডালের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে। এর মাধ্যমে দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
প্রকাশক: চাষাবাদ ডটকম
(উল্লেখিত তথ্য লেখকের নিজস্ব মতামত এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক)