সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পাকার আগেই পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে বোরো ধান। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হাজারো কৃষক ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পরিবার-পরিজনের জীবিকা নির্ভর একমাত্র ফসল হারিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
সদর উপজেলার দেখার হাওরের ইছাগড়ি গ্রামের কৃষক মুজিবুর রহমান তিন একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। পরিবারের নয় সদস্যের ভরণপোষণ, সন্তানদের পড়াশোনাসহ সব খরচই এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ধান পাকার আগেই তা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গভীর হতাশায় পড়েছেন তিনি। কাঁচা ধান ডুবে যাওয়ার বেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, “ধানটা পাকলে কাটতে পারতাম, মনকে সান্ত্বনা দিতাম। কিন্তু চোখের সামনে সব ডুবে গেল, এখন বছরটা কীভাবে যাবে বুঝতে পারছি না।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতে হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে ব্যাপক ফসলহানি ঘটছে। কৃষকেরা একদিকে ফসল রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে পানিনিষ্কাশনের জন্য কোথাও বাঁধ কেটে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও পাম্প বসিয়ে পানি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে যে বাঁধ ফসল রক্ষার জন্য নির্মিত হয়েছিল, অনেক ক্ষেত্রে সেটিই এখন জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। সাধারণত মধ্য এপ্রিল থেকে হাওরে ধান কাটা শুরু হয়। তবে তার আগেই জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যদিও কৃষি বিভাগের হিসাবে জেলার ছয়টি উপজেলায় ১ হাজার ৮১৯ হেক্টর জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে, তবে স্থানীয়দের দাবি এই হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। হাওর সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু দেখার হাওরেই প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পুরো জেলায় ক্ষতির পরিমাণ ১৫ হাজার হেক্টরেরও বেশি হতে পারে।
-এর অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারুক আহাম্মেদ জানান, ক্ষতির সঠিক হিসাব পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। তিনি বলেন, ধানগাছ যদি পাঁচ থেকে ছয় দিন পানির নিচে থাকে, তাহলে ক্ষতি নিশ্চিত; তবে এর আগে পানি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ কম হতে পারে।
একই গ্রামের কৃষক আতাউর রহমান জানান, তাঁর সাত একর জমির মধ্যে পাঁচ একরই ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। পানি না কমলে বাকি জমিও নষ্ট হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। অন্যদিকে বৃদ্ধ কৃষক রবীন্দ্র দাস বলেন, ধারদেনা করে চাষ করেছেন, এখন সেই ঋণ কীভাবে শোধ করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তাঁর ভাষায়, “সব ধান শেষ হয়ে গেছে, এখন কীভাবে চলবো বুঝতে পারছি না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও পানি নিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক হাওরে জলাবদ্ধতা তীব্র হয়েছে। দেখার হাওরের বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকলেও তা অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর যেমন জোয়ালভাঙ্গা, পাখিমারা, খাই, কাউয়াজুড়ি, নলুয়ার, হালির, পাগনার, ভান্ডা, দিঘার, ছায়ার, চন্দ্রসোনারথাল, চাপতির, টাঙ্গুয়ার ও কাইলানি হাওরেও একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্থানে কৃষকেরা নিজেদের উদ্যোগে পাম্প বসিয়ে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন।
এদিকে হাওরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও জলাবদ্ধতায় ফসলহানির প্রতিবাদে বিভিন্ন উপজেলায় বিক্ষোভ ও গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা দাবি করেছেন, অন্তত ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
অন্যদিকে (পাউবো) জানিয়েছে, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ৭১০টি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের পরও অনেক কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, অতিবৃষ্টির কারণেই মূলত জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের বোরো উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি হাওর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

