সিলেটের হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। পানির নিচে ডুবে যাওয়ায় পাকার আগেই কাঁচা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। শত শত সেচযন্ত্র বসিয়েও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাওরে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ধানগাছ ডুবে থাকায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে কোমরপানিতে নেমে কাঁচা ধান কেটে নৌকায় করে বাড়ি নিচ্ছেন। এসব অপরিপক্ব ধান গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কেউ কেউ সিদ্ধ করে চাল বের করার চেষ্টা করছেন।
সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের ইসলামপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, পানির নিচ থেকে কাঁচা ধান কেটে নৌকায় তোলা হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, হাওরে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাদের ভাষায়, “যদি ফসলই রক্ষা না হয়, তাহলে চাষাবাদ করে লাভ কী?”
স্থানীয় কৃষক মকবুল মিয়া জানান, বাঁধে স্লুইসগেট না থাকায় বৃষ্টির পানি জমে থেকে আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ এখন কৃষকের জন্য ‘গলার ফাঁস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেক কৃষক রশিদ মিয়া বলেন, জমিতে গলাসমান পানি, ফলে ধান কাটার কোনো উপায় নেই। যে ধান এখন কাটা হচ্ছে, তা কিছুদিন পরেই পরিপক্ব হতো।
এদিকে সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুল ইসলাম কামরুল জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করে জানান, তার এলাকায় অন্তত ৫০০ সেচযন্ত্র দিয়ে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু তাতেও কার্যকর সমাধান মিলছে না। তিনি দ্রুত সমস্যার সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, জলাবদ্ধতায় অনেক কৃষকের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী মৌসুমে সার ও বীজ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি হাওরে পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, স্লুইসগেট স্থাপন এবং পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান তিনি।
সিলেট বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোশারফ হোসেন জানান, ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে, যার একটি অংশ হয়তো উদ্ধার করা সম্ভব। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহ থেকে ধান কাটা শুরু হবে। এরই মধ্যে ৩০৭ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। তবে জলাবদ্ধতার কারণে অনেক স্থানে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে অর্ধশতাধিক স্লুইসগেট থাকলেও আরও ১০ থেকে ১৫টি নতুন স্লুইসগেট নির্মাণ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলায় চলতি মৌসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। তবে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে হাওরে ধান পাকা শুরু হয়, কিন্তু তার আগেই এ ধরনের দুর্যোগ কৃষকদের জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে।
এদিকে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টি না হলেও আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

