লক্ষ্মীপুর জেলায় সুপারি চাষ যেন এক প্রাণবন্ত উৎসব। জেলার প্রতিটি বাড়িতে অন্তত একটি করে সুপারি গাছ থাকা একটি সামাজিক মর্যাদার বিষয়। রায়পুর ও রামগঞ্জ উপজেলাকে আকাশ থেকে দেখলে মনে হয় পুরো এলাকা যেন বিশাল সুপারি বাগান। হাটের দিনগুলোতে জেলার বাজারগুলোতে দেখা মেলে সুপারি বিক্রি-বাটার ব্যস্ততা। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই এ উৎসবে সমান অংশীদার।
লক্ষ্মীপুর: দেশের শীর্ষ সুপারি উৎপাদক জেলা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৩’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে লক্ষ্মীপুরে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৩১ টন সুপারি উৎপাদিত হয়েছে। এ থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।
অন্যান্য জেলাগুলোর তুলনায় লক্ষ্মীপুরের সুপারি উৎপাদন অনেক বেশি। কক্সবাজার (৫৯,২৯৩ টন), চাঁদপুর (২৩,৭৪৩ টন), এবং ভোলা (১৪,৩৩৪ টন) যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয়, এবং চতুর্থ স্থানে রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সুপারি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান
ট্রিজ নামক একটি অর্থনৈতিক জরিপ প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, সুপারি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ৩৩৩.৭ মিলিয়ন কেজি সুপারি উৎপাদিত হয়। শীর্ষে রয়েছে ভারত, যেখানে বছরে ১.৭ বিলিয়ন কেজি সুপারি উৎপাদিত হয়।
সুপারি মৌসুম: অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্ত
প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত সুপারি মৌসুম চলে। চলতি মৌসুমে উৎপাদন কিছুটা কম হলেও বাজারদর বেশ ভালো। দালাল বাজারে প্রতি পন (৮০টি সুপারি) পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ২০০-২৫০ টাকায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকরা জানান, কাঁচা, পাকা, ও পানিতে ভেজানো—এই তিন ধরনের সুপারি সারাবছরই চাহিদাসম্পন্ন। এ মৌসুমে লক্ষ্মীপুরের ২০টি বড় বাজারে সুপারি কেন্দ্রিক শ্রমিক, গাড়ি চালক ও ব্যবসায়ীদের জন্য প্রায় ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
সুপারি চাষে দীর্ঘমেয়াদী লাভ
একটি সুপারি গাছ রোপণের ৩-৪ বছরের মধ্যে ফলন দিতে শুরু করে এবং ৪০-৫০ বছর ধরে ফলন দিয়ে যায়। অতিবৃষ্টির কারণে চলতি বছরে উৎপাদন কম হলেও, দাম বৃদ্ধি হওয়ায় চাষিরা লাভবান হচ্ছেন। পাঁচ গন্ডার বাগানে ৪৫৮টি সুপারি গাছ থেকে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় করেছেন চররুহিতার বাগান মালিক শিহাব।
সুপারি চাষে সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
লক্ষ্মীপুরে সুপারি চাষ দিন দিন বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৬,৮৭৬ হেক্টর জমিতে সুপারি চাষ হচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধি লক্ষ্মীপুরের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
বাংলাদেশ কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ড. জাকির হোসেন বলেন, “সুপারি অর্থনীতি লক্ষ্মীপুরকে সমৃদ্ধশালী করছে।”
সুপারির বহুমুখী ব্যবহার
সুপারি শুধু পান খাওয়ার উপকরণ নয়, এটি বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর কিছু দেশে সুপারিকে মাদক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। লক্ষ্মীপুরবাসীর কাছে এটি শুধু অর্থনৈতিক পণ্য নয়, বরং সংস্কৃতির অংশ।

