মজুদ আছে এক বছরের, তবু বাড়ছে উদ্বেগ; বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কৃষি খাতে।
বিশেষ করে বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায় এবং আসন্ন আমন মৌসুমকে সামনে রেখে সার ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
আমদানিনির্ভরতা বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
বাংলাদেশে ব্যবহৃত সারের বড় একটি অংশ আমদানি করা হয়। বিশেষ করে ইউরিয়া সারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরতা রয়েছে এবং -এর মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর।
এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ সার কারখানাগুলোও উৎপাদনের জন্য আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সার উৎপাদন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সরকার বলছে: সংকটের আশঙ্কা নেই
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে। কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদ্যমান মজুদ দিয়ে প্রায় এক বছর পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমান মজুদ:
- ইউরিয়া: প্রায় ৪.৯৩ লাখ টন
- টিএসপি: প্রায় ৩.৮২ লাখ টন
- ডিএপি: প্রায় ৫.০৯ লাখ টন
- এমওপি: প্রায় ৩.৪২ লাখ টন
মন্ত্রী আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবেলায় বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে , এবং -এর সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।
মাঠ পর্যায়ে ভিন্ন চিত্র
যদিও সরকারিভাবে সার মজুদের বিষয়ে আশ্বস্ত করা হচ্ছে, তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সারের কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, কিছু ডিলার বাজারে সরবরাহ কম দেখিয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
উৎপাদনেও প্রভাব পড়ার শঙ্কা
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। গ্যাস সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের একাধিক সার কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
দেশের সার কারখানাগুলো মূলত এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
যদিও সরকার বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুতই কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
কৃষি অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বাস্তব সংকট তৈরি হওয়ার আগেই দেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার প্রবণতা একটি বড় সমস্যা।
তার মতে,
“আমরা অনেক সময় প্রকৃত সংকটের আগেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করি, যা কৃষকদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।”
তিনি আরও বলেন, বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত আমদানি নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে চাপ বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও সার সরবরাহের একটি বড় অংশ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথটি বর্তমানে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। টনপ্রতি দাম ৪৯০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম আরও বাড়তে পারে।
বৈশ্বিক প্রভাব: খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি
বিশ্ববাজারে সারের দাম বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইতোমধ্যেই এবং সহ বিভিন্ন দেশে কৃষি উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে।
গবেষণা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় এখনই কিছু কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি:
- বিকল্প দেশ থেকে দ্রুত সার আমদানি নিশ্চিত করা
- বন্ধ থাকা সার কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা
- বাজারে কৃত্রিম সংকট নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো
- জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ
- কৃষিতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ
বিশ্লেষণ: তাৎক্ষণিক স্বস্তি, দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা
বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকা। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানিনির্ভর এই খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
📌 সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, কৃষি মন্ত্রণালয়, বাজার বিশ্লেষণ প্রতিবেদন

