মুক্তমত

এসো ছাদে স্বপ্ন ফলাই— একটি নগরকৃষি বিষয়ক কলাম

নগরজীবন দিন দিন কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে। চারদিকে দালান আর যানজটের ভিড়ে প্রকৃতি যেন হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই শহরেই রয়েছে এক বিশাল সম্ভাবনা—ছাদের ওপর গড়ে তোলা সবুজ এক স্বপ্নভূমি। আমরা যদি চাই, আমাদের প্রতিটি ছাদই হতে পারে একটি ছোট্ট কৃষিখামার, হতে পারে পরিবারের নিরাপদ খাদ্যের ভরসা, হতে পারে স্বস্তির নিশ্বাস নেওয়ার আশ্রয়। তাই বলি—এসো ছাদে স্বপ্ন ফলাই।

নগরবাসীর বাস্তব প্রয়োজন—একটু সবুজের স্পর্শঃ

যে শহরে খোলা জায়গা প্রতিদিন কমছে, সেখানে খাদ্য উৎপাদন প্রায় পুরোপুরি বাজারনির্ভর। কিন্তু বাজারের সবজিতে রাসায়নিক অবশিষ্টের উপস্থিতি এখন উদ্বেগের বড় কারণ। এই সংকট মোকাবিলার সহজতম ও বাস্তবসম্মত পথ হলো ছাদবাগান।

ছাদে গাছ মানে শুধু সৌন্দর্য নয়—অক্সিজেন বাড়ায়, ঘরের তাপমাত্রা কমায়, মনকে প্রশান্ত রাখে। ব্যস্ত নগরজীবনে কিছুটা সময় নিজের ছাদে কাটালে শরীর–মন দুটোই স্বস্তি পায়।

নিরাপদ ফসল—নিজের হাতে, নিজের ছাদে

অনেকেই মনে করেন নিরাপদ বা জৈব কৃষি করা কঠিন। আসলে ছাদে সবজি উৎপাদন সবচেয়ে সহজ , এবং ছোট জায়গাতেও সম্ভব। পরিবারের চাহিদা মেটাতে যে পরিমাণ সবজি দরকার—টমেটো, মরিচ, বেগুন, শাক, পেঁপে, লাউ—এসবই ছাদের কয়েক স্কয়ারফিট জায়গায় উৎপাদন করা যায়।

ছাদে তৈরি করা যায় নিজস্ব কম্পোস্ট, যা কিচেন ওয়েস্ট দিয়েই বানানো সম্ভব। এছাড়া নিমপাতা, লঙ্কা বা রসুন দিয়ে তৈরি ঘরোয়া জৈব বালাইনাশকও সহজেই ব্যবহার করা যায়। ফলে গাছে রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করার প্রয়োজনই পড়ে না।

ছাদ বাগান শিশুদের শেখার ও বেড়ে ওঠার জায়গা

গাছের বেড়ে ওঠা দেখা, মাটিতে হাত দেওয়া, পানি দেওয়া—এসব অভিজ্ঞতা শিশুদের মানসিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। মোবাইল–নির্ভর জীবনে প্রকৃতির সঙ্গে এই সংযোগ তাদের আনন্দ দেয়, কৌতূহলী করে এবং দায়িত্ববান করে তোলে।

পরিবারে বাড়ে একতার অনুভূতি

পানি দেওয়া, ফুল ফোটা দেখা, সবজি তোলা—একসঙ্গে এসব কাজ করতে করতে পরিবারের সবার মধ্যে তৈরি হয় অন্যরকম একটা বন্ধন। ব্যস্ত জীবনে এমন সৃজনশীল সময় সবাইকে কাছাকাছি আনে।

শুধু শহরের ছাদ নয়—গ্রামেও এই উদ্যোগ ছড়িয়ে দিতে হবে

আমরা সাধারণত ছাদবাগানকে শহরকেন্দ্রিক মনে করি, কিন্তু গ্রামেও এখন ইট–বালু বাড়ছে, খোলা জায়গা কমছে, আর অনেক বাড়িতেই পাকা ছাদ রয়েছে। এসব ছাদকেও কৃষির আওতায় আনা যায়। এতে বাড়ির দৈনন্দিন সবজি চাহিদা পূরণ হবে, কৃষি জমির ওপর চাপও কমবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস–আদালতের ছাদ—একটি বৃহৎ সম্ভাবনার ক্ষেত্র

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি–বেসরকারি অফিস—এসব প্রতিষ্ঠানের ছাদগুলো বেশিরভাগ সময়ই অকার্যকর পড়ে থাকে। সেখানে যদি পরিকল্পিত ছাদবাগান করা হয়, তবে একদিকে সৌন্দর্য বাড়বে, অন্যদিকে উৎপাদিত সবজি ব্যবহার করা যাবে প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘরে অথবা সামাজিক কাজে।

এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদবাগান শিশুদের জন্য হবে বাস্তব শিক্ষার জায়গা।তারা শিখবে— বীজ থেকে গাছ হওয়া,মাটির ধরন, সার প্রয়োগ,পরিচর্যা, প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমন ,এই সবই শিশুর কৌতূহল, সচেতনতা ও পরিবেশবান্ধব মানসিকতা গড়ে তুলবে।

জৈব কৃষিকে সহজ করতে কাজ করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো

জৈব কৃষিকে এগিয়ে নিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সহ এখন অনেক সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে। তারা জৈব সার, জৈব কীটনাশক, পোকা ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি সবই বাজারে এনেছে—যা ছাদবাগানের জন্য খুবই উপযোগী।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
• বায়ো ন্যাচার হাইটেক এগ্রো
• রাসেল আইপিএম
এদের পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকে সহজ করতে কাজ করছে, যাতে ছাদের কৃষিও হয় বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই।

ছাদে বাগান করা মানেই বড় কোনো বিনিয়োগ নয়। প্রয়োজন শুধু একটু আগ্রহ, কয়েকটি টব, কিছুটা সময় আর যত্ন। বিনিময়ে পাওয়া যায় নিরাপদ খাদ্য, পরিবারে স্বস্তি, পরিবেশে শীতলতা এবং নিজের হাতে কিছু ফলানোর আনন্দ।

শহর বদলে দিতে পারে এমন ছোট ছোট উদ্যোগই।তাই আজই শুরু করা যায়—
এসো ছাদে স্বপ্ন ফলাই।

লেখক : কৃষিবিদ এম এম শাহ পরান

চাষাবাদ ডেস্ক

About Author

You may also like

মুক্তমত

কৃষিতে নারীর অবদানের প্রকৃত স্বীকৃতি নেই

|| এ. কে. আজাদ ফাহিম || আবহমান কাল থেকে আমাদের এই দেশ কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। কৃষি একটি মহান
মুক্তমত

কৃষি ডিপ্লোমাধারীরা কেন উচ্চশিক্ষা বঞ্চিত হবেন?

বাংলাদেশে ১৮টি সরকারি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট রয়েছে। আর বেসরকারি পর্যায়ে রয়েছে ১৬২টি। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ছয় হাজারের বেশি পাস করে বের