চলমান কৃষি

১৮ কোম্পানির ভেজাল বালাইনাশক: কৃষকের বিপদ আরও বাড়ছে

দেশের কৃষকরা নানা সমস্যার সম্মুখীন, তার ওপর কিছু প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ভেজাল বালাইনাশক সরবরাহ করছে, যা কৃষকদের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। সরকারের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) এবং চীনের রাষ্ট্রীয় ল্যাবের পরীক্ষায় এসব কোম্পানির পণ্য ভেজাল প্রমাণিত হয়েছে। এরপরও মন্ত্রণালয়ের শিথিল নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নিয়ে এসব কোম্পানি প্রতারণার জাল বিস্তার করেছে।

ভেজাল বালাইনাশক সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো

বিভিন্ন কোম্পানি অনিয়ম ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের মধ্যে অন্যতম:

  • টেনস এগ্রো
  • অ্যামিনেন্স কেমিক্যাল
  • ইঞ্জিনিয়ার্স ক্রপ সায়েন্স
  • এগ্রো ইনপুট বাংলাদেশ
  • ক্লিন এগ্রো
  • নিড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ

এদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

গবেষণা ও পরীক্ষার ফলাফল

যবিপ্রবির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জাভেদ হোসাইন খানের নেতৃত্বে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এসব বালাইনাশকে যে পরিমাণ রাসায়নিক থাকার কথা, তা প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত কম পাওয়া গেছে, যা ফসলে কার্যকর নয়।

সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলা থেকে সংগৃহীত ১৬টি রাসায়নিক সারের নমুনা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রতিটি নমুনাতেই ভেজাল পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক ল্যাব পরীক্ষার ফল

সাংহাই নেইপু টেস্টিং টেকনোলজি গ্রুপের ল্যাবে টেস্ট করা বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর বালাইনাশকেও ভেজাল প্রমাণিত হয়েছে। এখানে টেনস এগ্রো, নিড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, সিমবায়োসিস টেকনোলজি, অ্যামিনেন্স কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং জেনারেল এগ্রো কেমিক্যাল লিমিটেড-এর পণ্য পরীক্ষিত হয়।

কৃষকের ক্ষতি

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় ২০ জন কৃষক মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের ‘য়োকরাল’ ছত্রাকনাশক স্প্রে করার ফলে তাদের ৩০ বিঘা জমির পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ও অভিযোগ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েকটি কোম্পানি সার ও বালাইনাশকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, অথচ প্রমাণিত ভেজাল পণ্য সরবরাহের পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম. সাইদুজ্জামানের নেতৃত্বে এসব ভেজাল কীটনাশকের ব্যবসা চলছে। মিমপেক্সটেনস এগ্রো-এর কীটনাশকেও ভেজাল প্রমাণিত হয়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) অভিযোগ করেছে, মিমপেক্স সিন্ডিকেট করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে এবং মানহীন পণ্য আমদানি করছে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশ

জনস্বার্থে ‘লিগ্যাল এরা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতে রিট করলে আদালত কৃষি, বাণিজ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিক্রিয়া

বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলম বলেন, ‘কীটনাশক পরীক্ষা ও বাজারজাতকরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। কোনো কোম্পানি যদি ভেজাল কীটনাশক বাজারজাত করে, প্রমাণ পেলে সেগুলো নিষিদ্ধ করা হয় অথবা বাজার থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।’ তবে বাস্তবে, এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

উপসংহার

কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। ভেজাল কীটনাশক ও সার নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী আইন প্রয়োগ, যথাযথ মনিটরিং এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কৃষি খাত নিরাপদ হবে না।

চাষাবাদ ডেস্ক

About Author

You may also like

চলমান কৃষি

ইরির তত্ত্বাবধানে খাগড়াছড়িতে উচ্চ ফলনশীল ধানের বাম্পার ফলন

খাগড়াছড়ি মহালছড়ি উপজেলার পাকিজাছড়ি গ্রামে এবং সদর উপজেলার ভূয়াছড়ির নতুন বাজার গ্রামে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (ইরি) তত্ত্বাবধানে কম সময়ে
চলমান কৃষি

সিলেটের বিশ্বনাথে ৩ দিন ব্যাপী কৃষি মেলার উদ্বোধন

সিলেটের বিশ্বনাথে উপজেলা কৃষি অফিসের আয়োজনে ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ‘কন্দাল ফসল উন্নয়ন প্রকল্প’র আওতায় ৩ দিনব্যাপী (৮-১০ মে) কৃষি